খরস্রোতা পদ্মার বুকে একের পর এক ভেসে চলেছে বিশাল বিশাল বাঁশের ভেলা (ভূড়)। কোনো ভেলায় মাইকে ধ্বনিত হচ্ছে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ জিকির, কোথাও চলছে রান্নার আয়োজন। আবার কোথাও নামাজের প্রস্তুতি কিংবা গজলের সুরে সুরে দাঁড় টানা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় নদীর বুকে এক ব্যতিক্রমী ভাসমান জনপদ। আগামী ২০২৭ সালের আসন্ন মহা পবিত্র বিশ্ব উরস শরীফ উপলক্ষে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিল দরবার শরীফের উদ্দেশে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নদীপথে ছুটে আসছে এই শত শত বাঁশের ভূড়।
দরবার সূত্রে জানা যায়, ভক্তদের কাছ থেকে পাওয়া এসব বাঁশ দরবারের ‘নজরানা’ বা খেদমতের অংশ। একেকটি ভুঁড়ে ৮০০ থেকে ২৫০০টি পর্যন্ত বাঁশ থাকে। ভেলাগুলো দরবারে পৌঁছানোর পর তা ২০২৭ সালের উরস শরীফ উপলক্ষে বিশাল সামিয়ানা, প্যান্ডেল, অজুখানা, সুউচ্চ গেট, পয়োনিষ্কাশনের অস্থায়ী বাথরুম ও কোটি মানুষের রান্নার জ্বালানিসহ দরবারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়।
বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, পাবনাসহ ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও নরসিংদী থেকে আসা এই ভেলাগুলোর ওপরই গড়ে ওঠে ভক্তদের সাময়িক সংসার। রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া, গোসল, নামাজ, ইবাদত-বন্দেগি থেকে শুরু করে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য ভেলার ওপর তৈরি করা হয় বিশেষ টয়লেট। প্রতিটি ভূড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন জাকেরান রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে লগি-বৈঠা ও দাঁড় টেনে এগিয়ে যান।
ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে খাজা বাবা ফরিদপুরীর নির্দেশে কুড়িগ্রাম জেলা থেকে মাত্র দুটি বাঁশের ভূড় নিয়ে এই যাত্রার শুভসূচনা হয়েছিল। সেই দুটি ভূড় থেকে আজ ৫১ বছর পর শত শত বাঁশের ভেলা ভেসে চলেছে দরবারের দিকে। বাংলা আশ্বিন মাসের প্রথম বুধবারের জলসা শেষে বৃহস্পতিবার উষালগ্নে সুসজ্জিত ভেলাগুলো নিয়ে দরবারের উদ্দেশে রওনা হওয়ার যে আধ্যাত্মিক নিয়ম খাজা বাবা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, আজও তা হুবহু অনুসরণ করা হচ্ছে। যাত্রার আগে নদী ও খালের পানি নিয়ে তৈরি হওয়া বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার কথা জানান ভক্তরা। উরসের পূর্বে বেশ কিছু নদী ও খালে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় ভক্তরা দুশ্চিন্তায় পড়েন যে কীভাবে এত বড় ভেলা নিয়ে যাবেন। কিন্তু খাজা বাবার নির্দেশিত আশ্বিনের প্রথম বৃহস্পতিবার উষালগ্নে যাত্রা শুরু হতেই আল্লাহর অশেষ রহমতে শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলো অলৌকিকভাবেই পানিতে ভরপুর হয়ে ওঠে। প্রতিবছরই এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখা যায়।
এ বিষয়ে আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিল দরবার শরীফের মিডিয়া সেল প্রধান মোঃ শাহজালাল ভুইঁয়া রুমন বলেন, “১৯৭৫ সালে মাত্র দুটি ভূড় দিয়ে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা আজ সুবিশাল ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ জাকের সাধারণ ও দরিদ্র হওয়ায় খাজা বাবা ফরিদপুরী (র.) তাঁদের কষ্ট লাঘবে এই বাঁশ নজরানা দেওয়ার সহজ নির্দেশ দিয়েছিলেন। নদীর নাব্যতা সংকট বা প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে নদীগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাওয়া পরম করুণাময়ের এক বিশেষ মহিমা। দীর্ঘ ২৫০০ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে ভক্তদের এই আগমন ভক্তি ও ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।”
কুড়িগ্রামের চিলমারী ঘাটসহ দূর দূরান্ত থেকে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদ-নদী পাড়ি দিয়ে আটরশিতে পৌঁছাতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। দীর্ঘ ও কঠিন এই পথের ঝড়-বৃষ্টি, প্রবল স্রোত ও নানা বাধা অতিক্রম করে যখন ভেলার কাফেলা আটরশির মাটিতে নোঙর করে, তখন ভক্তদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে পরম মানসিক তৃপ্তি।


