উচ্চতা মাত্র ৩০ ইঞ্চি, সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা হাঁটতে গেলে শরীর কেঁপে ওঠে। শারীরিক নানা সীমাবদ্ধতা আর চরম অভাব থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তিকে ধিক্কার জানিয়ে আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন মোনতাজ হোসেন (৩৫)। কিন্তু সমাজের কিছু মানুষের অমানবিক আচরণ ও বাকির বিষাক্ত ফাঁদে পড়ে আজ তাঁর সেই স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর গ্রামের অধিবাসী মোনতাজ। ২০১১ সালে সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে বাবার বাড়ির উঠানে ছোট একটি মুদির দোকান দেন তিনি। অচল শরীর আর দারিদ্র্যের কারণে বিয়ের স্বপ্ন বিসর্জন দিলেও পেটের দায়ে ও আত্মসম্মান রক্ষায় দোকানেই দিনরাত পরিশ্রম করতেন। একা হাটে গিয়ে মালামাল কিনে আনা অসম্ভব হলেও হার মানেননি। তবে তাঁর এই শারীরিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে স্থানীয় কিছু অসংবেদনশীল মানুষ। দোকান থেকে বাকিতে মালামাল কিনে নিয়ে গেলেও পরবর্তীতে আর সেই টাকা ফেরত দেয়নি। পাওনা টাকা চাইতে গেলে উল্টো তাঁকে নিয়ে করা হয়েছে হাসি-তামাশা ও বিদ্রূপ। মোনতাজ হোসেন বলেন, “বাকি দিতে দিতে আমি আজ নিঃস্ব হয়ে গেছি। মানুষ আমার দোকান থেকে মাল নিয়ে গেছে, কিন্তু অনেকেই সেই টাকা দেয়নি। আমি ঠিকমতো হাঁটতে পারি না। বাজারে গিয়ে শাকসবজি বা দোকানের মালামাল কিনে আনাও আমার জন্য খুব কষ্টের। তাই প্রতিবন্ধীদের জন্য যে ইলেকট্রিক স্কুটার পাওয়া যায়, এমন একটি স্কুটার পেলে আমি নিজেই বাজারে গিয়ে মালামাল কিনে আনতে পারতাম এবং দোকানটাও আবার চালু করতে পারতাম।” তিনি আরও বলেন, “আমার মতো যারা প্রতিবন্ধী মানুষ, তাঁদের দোকান থেকে কিছু কিনলে দয়া করে নগদ টাকা দিয়ে পণ্য কিনবেন। নগদ টাকা দিয়ে কিনে খেতে না পারলে বাকি খাওয়ার দরকার নেই, আমার দোকানেও আসার দরকার নেই। কারণ বাকি দিতে দিতে আমাদের মতো মানুষগুলোই শেষ হয়ে যায়।” বর্তমানে এলাকার মানুষের কাছে মোনতাজের পাওনা আটকে আছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। বাকির টাকা উদ্ধার না হওয়ায় দোকানে নতুন করে মালামাল তোলার মূলধন শেষ হয়ে গেছে। ফলে আয়ের একমাত্র মাধ্যমটি এখন পুরোপুরি খালি। এ বিষয়ে ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া জানান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে মোনতাজকে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি আবেদন করলে হুইলচেয়ার বা ক্ষুদ্রঋণ সুবিধাসহ অন্যান্য সহায়তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা হবে। ৩০ ইঞ্চির এই মানুষটি প্রমাণ করেছেন—শরীরের সীমাবদ্ধতা মনকে ছোট করতে পারে না। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি পাওনাদাররা তাঁদের বাকির টাকাটুকু ফেরত দিলে হয়তো আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন অদম্য মোনতাজ।


