ফরিদপুরের মধুখালীতে নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্যকর ও গভীর রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর তিন যুবক কর্তৃক ওই ছাত্রীকে অপহরণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছে পরিবার। পরবর্তীতে বিষপান এবং দীর্ঘ দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার গত ২৬ অক্টোবর তার মৃত্যু হয়। তবে মর্মান্তিক এই ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখনো কোনো মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের।
অন্যদিকে, প্রাথমিক তদন্তে ধর্ষণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে পুলিশ। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকের মাতম চলছে পুরো পরিবারজুড়ে। একমাত্র মেয়ের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ ও দিশেহারা তার বাবা। সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে নিহতের মা বলেন, ‘যার সন্তান হারায়ে যায়, তারা কি বইস্যা থাকে? কিন্তু এই পুলিশ-দারোগা, যারা অপরাধী, তাঁদের শাস্তি দেয় না; খালি ওগো টাকার দরকার! দুই থানায়তে কেস নিল না ক্যান? কেস নেবে না কেন বলেন? আপনি যে অপরাধী, আপনার শাস্তি নাই? যার মৃত্যু হয়ে গেছে, কেস না নিয়ে তাঁদের বাড়ি পাঠায় দেয় ক্যান? তাইলে পুলিশ কত লাখ টাকা খাইছে বোঝেন!’
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাতটায় স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয় ওই শিক্ষার্থী। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে পৌঁছানোর পর মোটরসাইকেলে থাকা তিন যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার নাকোল গ্রামের মধুমতি নদীর একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে তাকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। পরিবারের ভাষ্যমতে, যুবকদের হাত থেকে একপর্যায়ে ছুটে গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয় মেয়েটি। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে পুলিশকে খবর দেন। নাকোল পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে ফাঁড়িতে নিয়ে যান। পরিবারের আরও দাবি, ওই দিনই দুপুরে ফাঁড়ির বাথরুমে দরজা বন্ধ করে হারপিক পান করে সে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে প্রথমে মাগুরা ও পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১ দিন চিকিৎসার পর স্বজনেরা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। শারীরিক নানা জটিলতার কারণে শরীর কঙ্কালসার হয়ে যাওয়ার পর গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত একটার দিকে বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে মধুখালী থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।
পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত চার যুবকের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—মাগুরার নাকোল ইউনিয়নের নাকোল গ্রামের রাফি শেখ (২১), রায়নগর গ্রামের রাহুল শেখ (২০), সায়মন বিশ্বাস (২০) এবং তাদের সহযোগিতাকারী মুরাদ শেখের ছেলে সোহাগ শেখ (২০)। নিহতের ভগ্নিপতির দাবি, প্রায় তিন মাস আগে ওই শিক্ষার্থীর অন্যত্র কাবিন সম্পন্ন হয়। এতে তার মামাতো ভাই সোহাগ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, কারণ সে নিজেই তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে সোহাগের পরিকল্পনা ও সহযোগিতাতেই এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে। মৃত্যুর ঠিক তিন দিন আগে পরিবারের ধারণ করা একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারেও ওই শিক্ষার্থী চার যুবকের নাম উল্লেখ করে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিল বলে দাবি স্বজনদের। এদিকে অভিযুক্ত সোহাগের বাবা মুরাদ শেখ জানান, ঘটনার দিন তাঁর ছেলে গাড়ি চালাচ্ছিল। তবে ওই তিনজন তাঁর বন্ধু ছিল এবং তারাই মেয়েটিকে তুলে এনেছিল বলে তিনি শুনেছেন। এমনকি ঘটনার পর মেয়েটির নদীতে ঝাঁপ দেওয়া ও হারপিক খাওয়ার বিষয়টিও তাঁর জানা আছে।
শ্রীপুর থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাফি শেখের সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং মেয়েটির অন্যত্র বিয়ে হওয়ার জেরে গত ১৪ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট এলাকায় রাফি ও ওই শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় কথা বলেন। পরে তাঁরা নদীতে ঝাঁপ দেন। ঘাটে থাকা মাঝি ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয় এবং সেখানেই সে হারপিক পান করে।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছি। তবে ওই ঘাট এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এমন কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। কারণ স্থানটি ফাঁকা এবং সেখানে সার্বক্ষণিক মানুষের যাতায়াত থাকে। তবে অন্য কোথাও এই ঘটনা ঘটেছে কি না, তা আমার জানা নেই। এছাড়া ঘটনার দেড় মাসের মধ্যে কেউ ধর্ষণের অভিযোগ জানায়নি, মৃত্যুর পর পরিবারের ভিডিও প্রকাশ করাটা রহস্যজনক।’
অন্যদিকে, মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় জানান, ঘটনাটি জানার পর শ্রীপুর থানায় যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং পরিবারকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়। তবে পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

