Saturday, 17 October 2026
  • Home  
  • জহির রায়হান: অন্ধকারে হারানো এক আলোকিত মানুষ
- মুক্তকথা ও সাহিত্য

জহির রায়হান: অন্ধকারে হারানো এক আলোকিত মানুষ

মিরপুরের সেই রক্তাক্ত দুপুরে তিনি গিয়েছিলেন ভাইকে খুঁজতে। হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র, ছিল না কোনো নিরাপত্তা—ছিল শুধু প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুলতা। সেই যে গেলেন জহির রায়হান, আর ফিরলেন না। কিন্তু আশ্চর্য, মানুষটি হারিয়ে গেলেও তাঁর ক্যামেরা থামেনি, তাঁর কলম থামেনি; বরং সৃষ্টির ভেতর দিয়ে তিনি আজও ফিরে আসেন—বারবার। বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসে […]

মিরপুরের সেই রক্তাক্ত দুপুরে তিনি গিয়েছিলেন ভাইকে খুঁজতে। হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র, ছিল না কোনো নিরাপত্তা—ছিল শুধু প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুলতা। সেই যে গেলেন জহির রায়হান, আর ফিরলেন না। কিন্তু আশ্চর্য, মানুষটি হারিয়ে গেলেও তাঁর ক্যামেরা থামেনি, তাঁর কলম থামেনি; বরং সৃষ্টির ভেতর দিয়ে তিনি আজও ফিরে আসেন—বারবার।

বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী জহির রায়হানের ৯১তম জন্মবার্ষিকী আজ। কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে তিনি যে সৃষ্টিশীলতার সাক্ষর রেখে গেছেন, তা আজও বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে সমানভাবে স্মরণীয়। তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন স্রষ্টাকে স্মরণ করা নয়; বরং বাঙালির ভাষা, অধিকার, মুক্তি ও সংগ্রামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখা।

নাম থেকে জহির রায়হান

১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান। তাঁর প্রকৃত নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মণি সিংহের দেওয়া ‘রায়হান’ নামটি তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর থেকেই তিনি জহির রায়হান নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর। মাত্র ১৪ বছর বয়সে, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর প্রথম কবিতা ‘ওদের জানিয়ে দাও’ প্রকাশিত হয়। কৈশোরেই যে লেখক নিজের চারপাশের সমাজ ও সময়কে দেখার চোখ তৈরি করেছিলেন, পরবর্তীসময়ে তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই আরও গভীর হয়ে ওঠে।

ভাষার মিছিলে, প্রতিবাদের প্রথম সারিতে

জহির রায়হানের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক চেতনার সম্পর্ক ছিল গভীর। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে বের হওয়া মিছিলে সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। ভাষার অধিকার আদায়ের সেই আন্দোলন তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা তাঁর উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান করে নেয়। উপন্যাসটির বিখ্যাত উচ্চারণ—‘আসছে ফাল্গুনে আমরা দ্বিগুণ হব’—পরবর্তীসময়ে শুধু একটি সাহিত্যিক বাক্য হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে অধিকার, প্রতিবাদ ও বাঙালির অদম্য প্রত্যয়ের প্রতীকী উচ্চারণ।

জহির রায়হানের ক্ষেত্রেও তাই। তাঁর ক্যামেরা আজও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, তাঁর কলম আজও প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হয়—একটি জাতির মুক্তির জন্য যারা জীবন ও সৃষ্টি উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের স্মৃতি কি কেবল দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তাঁদের অসমাপ্ত স্বপ্ন ও মূল্যবোধ আমরা নিজেদের সময়ের মধ্যে নতুন করে ধারণ করব?

সাহিত্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আর কত দিন’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘বরফ গলা নদী’ ও ‘তৃষ্ণা’। এসব রচনায় উঠে এসেছে গ্রামীণ সমাজের জীবন, মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম, সামাজিক বৈষম্য, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা এবং শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের নানা টানাপোড়েন।

‘হাজার বছর ধরে’ বিশেষভাবে তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার উজ্জ্বল নিদর্শন। গ্রামীণ বাংলার মানুষের জীবন, বিশ্বাস, কুসংস্কার, দুঃখ ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম তিনি যে গভীরতায় তুলে ধরেছেন, তা বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁকে স্বতন্ত্র জায়গা দিয়েছে।

ক্যামেরাই হয়ে উঠল প্রতিবাদের ভাষা

শুধু কলম নয়, ক্যামেরাকেও তিনি পরিণত করেছিলেন সমাজ ও রাষ্ট্রের বাস্তবতা তুলে ধরার শক্তিশালী মাধ্যমে। চলচ্চিত্রে তাঁর আগমন ঘটে পঞ্চাশের দশকে। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর নির্মাণ করেন ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘সঙ্গম’, ‘বাহানা’সহ একাধিক চলচ্চিত্র।

তবে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সবচেয়ে আলোচিত সৃষ্টি ‘জীবন থেকে নেয়া’। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রে একটি পরিবারের গল্পের আড়ালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা, স্বৈরাচার ও নিপীড়নের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেন তিনি। পর্দার গল্প হয়ে ওঠে সময়ের রাজনৈতিক ভাষ্য। মানুষের অধিকার ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা চলচ্চিত্রের পর্দা পেরিয়ে দর্শকের মনে পৌঁছে যায়।

যুদ্ধের ময়দানে তাঁর অস্ত্র ছিল ক্যামেরা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জহির রায়হানের সৃষ্টিশীলতা নতুন মাত্রা পায়। সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধের বদলে তিনি ক্যামেরাকে ব্যবহার করেন যুদ্ধের বাস্তবতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরার অস্ত্র হিসেবে।

কলকাতায় গিয়ে নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন এবং শরণার্থীদের দুর্দশার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয় এতে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে প্রামাণ্যচিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

‘স্টপ জেনোসাইড’ তাই শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ক্যামেরার চোখ দিয়ে জহির রায়হান বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন একটি জাতির ওপর চালানো নির্মমতার চিত্র।

ভাইকে খুঁজতে গিয়ে যে মানুষটি আর ফিরলেন না

কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই তাঁর জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আল-বদর বাহিনীর হাতে অপহৃত হন তাঁর বড় ভাই, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার। স্বাধীনতার পর ভাইকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যান জহির রায়হান।

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুরে আটকে রাখার খবর পেয়ে তাঁকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে মিরপুরে যান জহির রায়হান। এরপর থেকেই নিখোঁজ হন তিনি। পরদিন, ৩১ জানুয়ারি, মিরপুর মুক্ত হলেও তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁর মরদেহও কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

তাঁর নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে পরবর্তীসময়ে নানা দাবি ও মতভেদ তৈরি হয়েছে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, মিরপুরে সশস্ত্র সংঘর্ষের মধ্যে তিনি নিহত হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু তাঁর মরদেহ উদ্ধার না হওয়ায় ঘটনাটি আজও পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে জহির রায়হানের অন্তর্ধান বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক ও রহস্যময় অধ্যায় হয়ে আছে।

জহির রায়হানের সৃষ্টি হারানোর নয়

জহির রায়হানের জীবন থেমে গেছে ৩৬-এ। কিন্তু তাঁর সময় থামেনি। বরং তাঁর সৃষ্টিগুলো সময়ের সঙ্গে নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে এসেছে।

তিনি আছেন ‘হাজার বছর ধরে’র মানুষের দীর্ঘশ্বাসে। আছেন ‘আরেক ফাল্গুন’-এর প্রতিবাদী উচ্চারণে। আছেন ‘জীবন থেকে নেয়া’র রাজনৈতিক প্রতীকে। আছেন ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর প্রতিটি দৃশ্যে, যেখানে একটি জাতির রক্তাক্ত ইতিহাস ক্যামেরার চোখে কথা বলে।

সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রে তাঁর বহুমাত্রিক অবদান তাঁকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে। অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর সাংস্কৃতিক ভূমিকা এবং সৃষ্টিশীলতার সাহস আজও নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

জহির রায়হানকে নিয়ে লিখতে গেলে তাই বারবার মনে হয়—কিছু শূন্যতার কোনো শেষ নেই। ১৯৭২ সালের সেই দিন মিরপুর থেকে যে মানুষটি আর ফিরে আসেননি, তিনি কি সত্যিই হারিয়ে গেছেন?

জহির রায়হান আসলে হারিয়ে যাননি। তিনি শুধু দৃশ্যমান পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়েছেন। রয়ে গেছেন আমাদের স্মৃতির পর্দায়, ইতিহাসের পাতায় এবং সেইসব প্রশ্নের ভেতর, যেগুলোর উত্তর আজও খুঁজে ফিরছে বাংলাদেশ।

মানুষের জীবন শেষ হয়, কিন্তু সত্যিকারের সৃষ্টিশীল মানুষের সময় শেষ হয় না। জহির রায়হানের ক্ষেত্রেও তাই। তাঁর ক্যামেরা আজও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, তাঁর কলম আজও প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হয়—একটি জাতির মুক্তির জন্য যারা জীবন ও সৃষ্টিকে উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের স্মৃতি কি কেবল দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তাঁদের অসমাপ্ত স্বপ্ন ও মূল্যবোধ আমরা নিজেদের সময়ের মধ্যে নতুন করে ধারণ করব?

জহির রায়হান হারিয়ে গেছেন অন্ধকারে; কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও আলো জ্বেলে আছে। সেই আলো নিভে যেতে না দেওয়াই তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থপূর্ণ উপায়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্পাদক ও প্রকাশক :

নির্বাহী সম্পাদক :

যোগাযোগ :

Email Us:nagorikbarta2026@gmail.com

হটলাইন :017xxxxxxxxxxx