দীর্ঘ নয় বছরের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও নানা জটিলতার অবসান ঘটিয়ে আবারও দর্শনার্থীদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠল ফরিদপুরের ভাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী কুমার নদ। বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে আয়োজিত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ দেখতে আজ (শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর) নদীর দুই পাড়ে নেমেছিল হাজারো মানুষের ঢল।
উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়া এ আয়োজনে স্থানীয় সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, “আজকের এই উৎসব বিএনপির নয়, এই উৎসব ভাঙ্গাবাসীর, এই উৎসব ফরিদপুরবাসীর। আমরা সকলে মিলে উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করব, আমরা সবাই মিলেমিশে চলতে পারি। বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষকে এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। তবে আগামীতে সাধারণ মানুষের কোনো উৎসব আর বন্ধ হতে দেওয়া হবে না।”
শুক্রবার দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই কুমার নদের দুই তীরে জমে ওঠে উৎসুক জনতার ভিড়। বিকেল ৩টার পর নদীর বুকে শুরু হয় কাঙ্ক্ষিত প্রতিযোগিতা। ফরিদপুরসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাহারি সাজে সুসজ্জিত ১৮টি নৌকা এতে অংশ নেয়। মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার টানে নদীর বুক চিরে নৌকার দ্রুতগতির ছুটে চলা আর তীরের মানুষের করতালি পুরো এলাকায় এক অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
নৌকা বাইচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “শতবর্ষী এই উৎসব কেন এতদিন বন্ধ ছিল, তা আপনারা ভালো করেই জানেন। সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল আপনাদের সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আবারও ফিরিয়ে দিয়েছেন।” গ্রামবাংলার এই সংস্কৃতির ধারা অব্যাহত রাখতে দলমত নির্বিশেষে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মীয়াজি এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক আবজাল হোসেন খান পলাশসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিশ্বকর্মা পূজাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে কুমার নদে এই বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। দীর্ঘদিন পর এই ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ায় আনন্দে উদ্বেলিত স্থানীয় আবালবৃদ্ধবনিতা। বাইচ দেখতে আসা এক দর্শনার্থী উছ্বসিত কণ্ঠে বলেন, “পরিবারের সবাইকে নিয়ে দীর্ঘদিন পর এমন উৎসব দেখলাম। আমাদের প্রত্যাশা, এই ঐতিহ্য যেন প্রতিবছর একইভাবে বজায় থাকে।”
বাইচকে কেন্দ্র করে ভাঙ্গা বাজার ও আশপাশের এলাকায় বসেছে ১৫ দিনব্যাপী জমজমাট গ্রামীণ মেলা। সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে ভাঙ্গা পৌরসভার সামনে স্থাপন করা দুটি বড় ডিজিটাল স্ক্রিনে সরাসরি নৌকা বাইচ সম্প্রচার করা হয়।বিপুল জনসমাগম ঘিরে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নেওয়া হয়েছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
পুলিশ, র্যাব ও আনসারের পাশাপাশি দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য প্রস্তুত ছিল ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল টিম ও ডুবুরি দল। প্রতিযোগিতা শেষে অংশ নেওয়া ১৮টি নৌকার দলের হাতেই আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে উপহার তুলে দেওয়া হয়।

