ফরিদপুরের মধুখালীতে চুরির অপবাদ দিয়ে তাওহিদ শেখ নামের ১৪ বছরের এক শিশুকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি মুড়ি কারখানার মালিক ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে। শিশুটির ভাষ্যমতে, তাঁর হাত-পা ও চোখ-মুখ বেঁধে লোহার পাইপ দিয়ে বেধরকভাবে পেটানো হয়েছে। বর্তমানে আহত অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
আহত শিশুটি উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের নওপাড়া কুরানিয়ার চর এলাকার রুবেল শেখের বড় ছেলে। এছাড়া শিশুটি স্থানীয় বাজারের একটি ফার্নিচারের দোকানের কর্মচারী।
মঙ্গলবার (০১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশুটি ক্যাজুয়ালটি ও নিউরোসার্জারী বিভাগে চিকিৎসাধীন। শিশুটির পরনে লুঙ্গি সরিয়ে নির্যাতনের চিহ্ন দেখান স্বজনরা। শিশুটির পেছন অংশের কোমরের নিচে পুরো নিতম্ব কালচে হয়ে আছে; এমনকি রক্ত বের হয়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। বসতে না পারায় সারাক্ষণ কাঁত হয়ে থাকছে শিশুটি। বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছে।
জানা যায়, গত রোববার (৩০ আগস্ট) দিবাগত ৯ টার দিকে ফার্নিচারের দোকানের কাজ শেষ করে ওই মুড়ি কারখানার সামনে দিয়ে বাড়িতে ফিরছিল তাওহিদ শেখ। এসময় মায়ের দোয়া মুড়ি কারখানার মালিক ইশারত মোল্যার ছেলে মুন্না মোল্যা শিশুটিকে ডেকে দ্বিতীয় তলার ছাদে নিয়ে যায়। পরে সেখানে ইশারত মোল্যাও আসেন। এসময় শিশুটিকে বলা হয় তুই লোহার রড চুরি করেছিস, শিশুটি অস্বীকার করলে বাবা-ছেলে মিলে একপর্যায়ে রশি দিয়ে শিশুটির হাত-পা ও চোখ বেধে লোহার পাইপ দিয়ে বেধরকভাবে পেটানো হয়। এমনকি চিৎকার করতে গেলে কাপড় দিয়ে মুখও বেঁধে ফেলা হয়। এভাবে তিন ঘন্টাব্যাপী তাকে পেটানো হয়।
রাত ৯ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে সড়কের পাশে ফেলে রাখে। পরে রাত সাড়ে ১২ টার দিকে আহত অবস্থায় শিশুটিকে খুঁজে পায় পরিবারের সদস্যরা। পরদিন গতকাল সোমবার বিকালে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার দাবি শিশুটির স্বজনদের।
শিশুটি নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরে জানায়, মুড়ির মিল সংলগ্ন তাঁদের বাড়ি। রাত ৯ টার দিকে ফার্নিচারের দোকানের কাজ শেষ করে ওই মিলের সামনে দিয়ে বাড়িতে ফিরছিল। ওই সময় মুন্না মোল্যা তাকে ডেকে দ্বিতীয় তলার ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে ইশারত মোল্যাও আসে। একপর্যায়ে রশি দিয়ে তাঁর হাত-পা ও চোখ বেধে ফেলা হয়। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় লোহার রড চুরি করছিস কেন। তখন সে অস্বীকার করলে বাঁধা অবস্থায় লোহার পাইপ দিয়ে বেধরকভাবে পেটানো হয়। এমনকি চিৎকার করতে গেলে কাপড় দিয়ে মুখও বেঁধে ফেলা হয়। এভাবে তিনঘন্টাব্যাপী তাকে পেটানো হয়।
এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার দাবি করে শিশুটির দাদি রহিমা বেগম বলেন, ওরে আমিই কোলেপিঠে বড় করেছি, কোনদিন কারও কিছু চুরি করে নাই। ওইদিন অনেক রাত হলে বাড়িতে না আসায় আমরা খুঁজতে বের হই। রাত সাড়ে ১২ টার দিকে ওই মিলের নিচে গোঙানির শব্দ পেয়ে দৌড়ে যাই। তখন আমরা মনে করেছিলাম, ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছে। পরে জ্ঞান ফিরলে ও আমাদের বলে যে হাত-পা ও চোখ-মুখ বেঁধে ইশারত আর তাঁর ছেলে মাইর্যা ফেলায় রাখছে। আমরা গ্রামের মাতুব্বরদের বলেও বিচার পাইনি। তাই প্রশাসনের কাছে আমি বিচার চাই।
শিশুটির বাবা রুবেল শেখ অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার পর জানতে গেলে উল্টা হুমকি দিয়েছে। ইশারত মোল্যা বলেছে, ওরেতো মারছি, তোরেও মেরে ফেলব, আমার কিছুই করতে পারবি না। গ্রামের কেউ ওদের ভয়ে কথা বলে না, ওদের অনেক টাকা আছে। এতটুকু বাঁচ্চা মানুষকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এমনভাবে কি কেউ মারে? আমি সকলের কাছে এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
এদিকে মারধরের বিষয়টি স্বীকার করে ইশারত মোল্যা বলেন, ওই ছেলেটি এলাকায় বিভিন্ন মালামাল চুরি করে থাকে। আমার ঘরের কাজের রড চুরি করেছে কিন্তু ধরতে পারি নাই। ওইদিন ছাদে গিয়ে হাতে-নাতে ধরেছি। তখন আমার ছেলে ও দুই ভাতিজা চড় থাপ্পড় দিয়েছে। মানবতা দেখিয়ে পুলিশে দিইনি, এখন দেখতেছি পুলিশেও দেওয়াই ভাল ছিল।
মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুকদেব রায় জানান, শিশু নির্যাতনের কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে এবং পরিবার অভিযোগ দিলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


