Tuesday, 1 September 2026
  • Home  
  • নির্যাতন-প্রতারণায় ফিকে হচ্ছে প্রবাসী নারীর স্বপ্ন
- নারী ও শিশু

নির্যাতন-প্রতারণায় ফিকে হচ্ছে প্রবাসী নারীর স্বপ্ন

সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ও উন্নত জীবনের খোঁজে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক নারীকর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পা দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যে তাদের অনেকেই আশাহত হন। দালাল চক্র ও রিক্রুটিং এজেন্সির দেওয়া কথা-কাজের মিল না পেয়ে বিপাকে পড়তে হয় নারী কর্মীদের। প্রায়ই তাদের ওপর নেমে আসে শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের খড়্গ। কিন্তু অভিযোগ জানিয়েও […]

সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ও উন্নত জীবনের খোঁজে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক নারীকর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পা দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যে তাদের অনেকেই আশাহত হন। দালাল চক্র ও রিক্রুটিং এজেন্সির দেওয়া কথা-কাজের মিল না পেয়ে বিপাকে পড়তে হয় নারী কর্মীদের। প্রায়ই তাদের ওপর নেমে আসে শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের খড়্গ। কিন্তু অভিযোগ জানিয়েও কোনো সুরাহা পান না তারা।

মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারীরা গৃহকর্মী, কেয়ারগিভার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। এসব কাজ করতে গিয়ে অনেক নারী শ্রমিক নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছেন।

দেশে ফেরা নারী গৃহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশে নারীরা শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতনসহ ঠিকমতো খাবার না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত বেতন না পাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের অধিক কাজে নিয়োজিত থাকাসহ নানা সংকটে পড়েছেন।

গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে কেমন ছিলেন হাজেরা

২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন মানিকগঞ্জের বাসিন্দা হাজেরা বেগম। ছয় মাস সৌদিতে নানা নির্যাতনের পর তিনি দেশে ফেরত আসেন।

হাজেরা বেগম বলেন, ‘আমি পড়ালেখা জানি না। এলাকার এক দালাল আমার পাসপোর্ট নিয়ে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি যাওয়ার ব্যবস্থা করে। সৌদি যাওয়ার পর তিনটা বাসায় আমাকে কাজ দেয়, কোথাও স্থায়ী করেনি। দালালের কাছে অভিযোগ করলে, একেকবার একেক কথা বলে। সবশেষ এক ইয়েমেনী নাগরিকের বাসায় কাজ দিলে, সেখানে এক মাস কাজ করার পর ১ হাজার ২০০ রিয়াল স্যালারি দেয়। বাড়ির মালিক মদপান করে বাসায় এসে আমাকে মারধর করতো। পরে সেখান থেকে চলে যেতে চাইলেও আমাকে যেতে দেয়নি, টাকাও দেয়নি।’

হাজেরা জানান, নির্যাতন ও বেতন না দেওয়ার বিষয়টি তিনি সেই দেশের পুলিশকে জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরে দেশে ফেরত আসতে চাইলে দালালও টাকা চায়। বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতনের পর তিন লাখ টাকা আদায়ের পর তারা (দালাল চক্র) দেশে ফেরত পাঠায়।

দেশে ফেরত এসে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) অভিযোগ করেন এই নারী। তিনি বলেন, ‘আমাকে যে (দালাল) বিদেশে পাঠায় তাদের বিএমইটি ডেকে সালিশ করে মাত্র ৩০ হাজার টাকা আদায় করে দেয়। অথচ আমাকে নিয়ে ঠিকমতো কাজ দিতে পারেনি। আবার ৩ লাখ টাকাও নেয়। আমি ন্যায়বিচার পাইনি।’

বিএমইটিতে করা অভিযোগের অর্ধেকের বেশি অমীমাংসিত
বিএমইটির মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখার তথ্য মতে, ২০২৫ সালে বিভিন্ন এজেন্সির বিরুদ্ধে ৪ হাজার ৭০৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে নিষ্পন্ন অভিযোগের সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৫৪, যা মোট অভিযোগের ৪৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। প্রবাসীদের জমা দেওয়া মোট অভিযোগের অর্ধেকেরও বেশি (৫৬ দশমিক ৩২ শতাংশ) অভিযোগই বছর শেষে অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) কর্মকর্তা মৌমিতা বলেন, বিদেশ থেকে আসা নারীদের অভিযোগ অনেক। যেসব নারী প্রতারণার শিকার হয়ে আসেন, তাদের অধিকাংশই নানা ঝামেলার কারণে অভিযোগও করতে পারেন না। তারা বিদেশেও বঞ্চনার শিকার, দেশে এসেও ন্যায়বিচার পান না।

কমছে বিদেশগামী নারীর সংখ্যা
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীর প্রতি নিপীড়ন, যৌন নির্যাতন আর চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত বেতন না পাওয়া ও এজেন্সির দালালদের প্রতারণার কারণে বিদেশে নারী কর্মী যাওয়া কমছে।

অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) প্রকাশিত মাইগ্রেশন ট্রেন্ডস-২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশ থেকে মোট শ্রম প্রবাহের ১৬ শতাংশই ছিল নারী অভিবাসী কর্মী। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে কাজের জন্য দেশ ছেড়েছেন। যদিও করোনার প্রভাবে ২০২০ ও ২০২১ সালে এ সংখ্যা কিছুটা কমে গিয়েছিল। ২০২২ সালে এসে আবারও এক লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ নারী অভিবাসন করেছেন। তবে ২০২৩ সাল থেকে নারী অভিবাসীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এই সংখ্যা প্রায় ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। বিগত তিন বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে একটি উদ্বেগজনক নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিএমইটি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশে নারী কর্মী যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিএমইটি সূত্র বলছে, ২০২৫ সালে মোট ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারীকর্মী কাজের জন্য বিদেশে গেছেন, যা মোট অভিবাসীর প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে নারী অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৬১ হাজার ১৫৮ জন। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অভিবাসনে নারীর অংশগ্রহণ ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

অভিবাসন সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক নারী প্রবাসে কাজ করে পরিবারকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করেছেন। তাদের আয়ে গ্রামে ঘরবাড়ি নির্মাণ, সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের জীবনমান উন্নত হয়েছে।

তবে সাফল্যের পাশাপাশি প্রবাসে অনেক নারী শ্রমিক শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু দেশে কর্মরত নারী গৃহকর্মীরা প্রায়ই অতিরিক্ত কাজের চাপ, বেতন না পাওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন।

রামরু তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অভিবাসীর দেশে শোভন কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা, গৃহের অভ্যন্তরে নারীর প্রতি সহিংসতা নারী অভিবাসনকে ক্রমাগত নিরুৎসাহিত করছে। রামরুর গবেষণা অনুযায়ী, গত ১০ বছরে নারী অভিবাসন সম্পর্কে ব্যাপক নেতিবাচক রিপোর্ট উপস্থাপন এবং নারী অভিবাসনের ইতিবাচক গল্পের উপেক্ষাও এক্ষেত্রে গুরুত্ব বহন করে।

৭ বছরে দেশে ফিরেছেন ৭০ হাজার নারী

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে তাদের মধ্যে ঠিক কতজন দেশে ফিরেছেন তার সঠিক তথ্য নেই।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফেরত এসেছেন। এর মধ্যে করোনা মহামারি চলাকালে শুধু ২০২০ সালেই ফিরেছেন ৪৯ হাজার ২২ জন। শুধু বন্দি বা ডিপোর্টি হিসেবে ২০১৯ সালে তিন হাজার ১৪৪ জন, ২০২১ সালে ১ হাজার ৮১১ জন, ২০২২ সালে ৬ হাজার ২৯ জন, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৯১৬ জন, ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৩৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে অন্তত ১ হাজার ৮৯১ জন দেশে ফিরেছেন। এর আগে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৩৬৫ এবং ২০১৯ সালে অন্তত এক হাজার নারী ফেরত এসেছেন।

৮ বছরে দেশে এসেছে ৭৯৯ নারীর লাশ

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারীর মরদেহ বাক্সবন্দি হয়ে দেশে ফিরেছে। এদের অধিকাংশের মৃত্যু সনদে উল্লেখ আছে আত্মহত্যা। তবে প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে কোনো না কোনো কারণ আছে বলে মনে করছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

নারী অভিবাসনে বড় সমস্যা দালাল চক্র

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে এখনো বড় সমস্যা হলো দালাল চক্র ও অবৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তৎপরতা। অনেক সময় ভুল তথ্য দিয়ে বা ভালো বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের বিদেশে পাঠানো হয়। বিদেশে গিয়ে তারা প্রতিশ্রুত কাজ না পেয়ে ভিন্ন পরিস্থিতির মুখে পড়েন।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার পর বাংলাদেশের নারীদের সঙ্গে কথা বলে নিপীড়নকে মোটা দাগে তিনটা ধরনে ভাগ করা যায়। প্রথমটি কাজ ও বেতন সংক্রান্ত। নারীদের একটা বড় অংশ অভিযোগ করে, ভিন্ন দেশের খাবার, পরিবেশ, আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না তারা। ফলে সংকটের মধ্যে থাকেন। বেতন ঠিকমতো পান না। একাধিক বাসায় কাজ করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয়ত ওই নারী শ্রমিক যখন মানিয়ে চলতে পারেন না, ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না, তখন নিয়োগকর্তা তাকে শারীরিক নির্যাতন করেন। তৃতীয়ত, যে চিত্রটা আসে সেটা হলো যৌন নির্যাতনের ঘটনা। এই নিপীড়ন-নির্যাতন এতটাই বীভৎস, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যে নারীরা বিদেশে নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসেন তাদের পাশে অধিকাংশ সময় রাষ্ট্র থাকে না।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান মনে করেন, গৃহকর্মীর বদলে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্য কাজে পাঠাতে পারলে ভালো। এরপরও যদি নারীদের গৃহকর্মী হিসেবেই সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয় এক্ষেত্রে পাঠানোর আগে নারীদের বাছাই এবং প্রশিক্ষণটা যথাযথ করতে হবে। পরিবারের সঙ্গে প্রত্যেক নারীর যোগাযোগের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। যে কোনো ধরনের বিপদে পড়লে রাষ্ট্রকে তাদের পাশে থাকতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্পাদক ও প্রকাশক :

নির্বাহী সম্পাদক :

যোগাযোগ :

Email Us:nagorikbarta2026@gmail.com

হটলাইন :017xxxxxxxxxxx