জীবনে কিছু সময় আসে, যখন গ্রহণ করা একটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের অনেকটা পথ নির্ধারণ করে দেয়। ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়স তেমনই একটি সময়। এই বয়সে একজন তরুণের হাতে থাকে শেখার পর্যাপ্ত সময়, নতুন কিছু করার উদ্যম এবং নিজের ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। তাই এই সময়টাকে শুধু পড়াশোনা, পরীক্ষা আর সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কাজে লাগানো জরুরি।
আজকের বিশ্বে শুধু একটি সনদ হাতে থাকলেই কর্মজীবনে এগিয়ে যাওয়া নিশ্চিত নয়। একজন মানুষ কী শিখেছেন, তার পাশাপাশি তিনি সেই জ্ঞান বাস্তবে কতটা কাজে লাগাতে পারেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রের চাহিদা দ্রুত বদলাচ্ছে, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে কাজের ধরনও বদলে যাচ্ছে। ফলে তরুণ বয়স থেকেই নিজের প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করে নেওয়া ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় প্রস্তুতি হতে পারে।
এই প্রস্তুতির শুরু হতে পারে যোগাযোগের দক্ষতা দিয়ে। শুধু নিজের কথা স্বতস্ফুর্ত উপস্থাপনই নয়, অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন। একাধিক ভাষার দক্ষতা অর্জন, সামাজিক ও পেশাগত যোগাযোগের দক্ষতা একজন তরুণকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলে। চাকরি, ব্যবসা কিংবা উদ্দ্যোক্তা, সব ক্ষেত্রেই এই দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করাও জরুরি। প্রযুক্তি নির্ভর সামাজিকতার ভিত্তিতে জ্ঞান অর্জন, অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সরঞ্জামের ব্যবহার, প্রচার ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনার মতো কাজ ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে অগ্রাধিকার ভূমিকা পালন করতে সহায়তা করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন সরঞ্জাম কীভাবে কাজকে সহজ ও দ্রুত করতে পারে, সে সম্পর্কেও ধারণা থাকা প্রয়োজন। তবে লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শেখা নয়; বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজের দক্ষতা ও কাজের মান বাড়ানো।
নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতা অনুযায়ী একটি মূল পেশাগত দক্ষতা বেছে নেওয়া দরকার। উদাহরণস্বরূপ কারও আগ্রহ থাকতে পারে ওয়েবসাইট তৈরিতে, কেউ নকশা বা ভিডিও সম্পাদনায় ভালো করতে পারেন। আবার কেউ ডিজিটাল বিপণন, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, মোবাইল অ্যাপ তৈরি, লেখালেখি কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারেন। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একসঙ্গে অনেক কিছু শেখার চেষ্টা না করে একটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া। একটি দক্ষতা পরিপূর্ণ করার ক্ষেত্রে নিয়মিত একশো ঘন্টা শেখা ও অনুশীলন করলে সেই বিষয়ে ভালো ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।
তবে কাজ শেখার পাশাপাশি অর্থ ব্যবস্থাপনার জ্ঞানও জরুরি। আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, বাজেট করা, সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করা এবং বিনিয়োগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা একজন তরুণকে ভবিষ্যতের জন্য আরও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে নিজের দক্ষতাকে কীভাবে কাজের সুযোগ বা আয়ের উৎসে পরিণত করা যায়, সেটিও জানা দরকার। কারণ কাজ জানা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই কাজের মূল্য বোঝা এবং তা দিয়ে নিজের জন্য সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এর সঙ্গে প্রয়োজন কিছু জীবনঘনিষ্ঠ দক্ষতা। সময়ের মূল্য বোঝা, নিয়মিত কাজ করার অভ্যাস, সমস্যা হলে সমাধানের পথ খোঁজা, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার সক্ষমতা একজন তরুণের ভবিষ্যৎকে আরও পরিণত করে। অনেক সময় একই ধরনের পেশাগত দক্ষতা থাকা দুইজন মানুষের মধ্যে এগিয়ে যান তিনিই, যিনি সময়নিষ্ঠ, দায়িত্বশীল, কর্মঠ এবং নেতৃত্ব প্রদানে পারদর্শী।
এই বয়সে অর্জিত একটি দক্ষতা আগামী দিনের পেশার ভিত্তি হতে পারে। আজকের ছোট একটি উদ্যোগ ভবিষ্যতে বড় সুযোগ তৈরি করতে সহায়ক হয়। আর আজকের এই দক্ষতা কয়েক বছর পর সাফল্যের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই ১৬ থেকে ২৫, এই সময়টাকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং যোগ্যতা তৈরিতে মনোনিবেশ করা বাঞ্ছনীয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।


