আজ মশা দিবস। শুনতে খানিকটা অদ্ভুত লাগতে পারে। যে মশার জন্যও একটা দিন রাখা হয়েছে। তারা কি এদিনে তাদের অধিকারের দাবিতে সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন করে নাকি! এসব কথা অনেকেই মজা করে বলে থাকেন। তবে আসলে মশা দিবসের উদ্দেশ্য হচ্ছে মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, মশার বিস্তার রোধ করা, এবং ব্রিটিশ চিকিৎসক স্যার রোনাল্ড রসের ঐতিহাসিক ম্যালেরিয়া আবিষ্কারকে সম্মান জানানো।
মশা পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী প্রাণী। এর কামড়ে প্রতি বছর বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। সিংহ, বাঘ বা হাঙরের মতো বড় হিংস্র প্রাণীর চেয়েও মশার মাধ্যমে ছড়ানো রোগ মানুষের জন্য বহুগুণ বেশি বিপজ্জনক। জানেন কি, এই মশা কিন্তু মানুষের আগে থেকেই পৃথিবীতে আছে। আধুনিক মশা যে কিউ-লিসী-ডি পরিবারভুক্ত, তাদের জীবাশ্মের প্রমাণ অন্তত প্রায় ১০ কোটি বছরের পুরোনো। অর্থাৎ মানুষ আসার অনেক আগেই মশার পূর্বপুরুষ পৃথিবীতে বিচরণ করছিল। মজার বিষয় হচ্ছে ডাইনোসরের সময়েও মশা ছিল? এমনকি মশার প্রাচীন প্রজাতির জীবাশ্ম (ক্রিটেসিয়াস যুগের) অ্যাম্বারে মোড়ানো অবস্থায় মিয়ানমারের কাচিন অঞ্চলে পাওয়া গেছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি। আজকের দিনে যে মশাগুলো আমরা দেখি, তারা হুবহু সেই সময়ের মশা নয়। কোটি কোটি বছর ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে মশার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে প্রাচীন মশা ও আধুনিক মশার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তাদের মধ্যে বিবর্তনীয় সম্পর্ক রয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে ডাইনোসরের সময়েও কি মশা ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো অ্যাম্বারে সংরক্ষিত জীবাশ্ম। গাছের আঠালো রেজিনে আটকে যাওয়া ছোট ছোট প্রাণী ও পতঙ্গ কোটি কোটি বছর ধরে সেই রেজিনের মধ্যে সংরক্ষিত হয়ে পরে অ্যাম্বারে পরিণত হয়েছে। এসব অ্যাম্বারের ভেতর পাওয়া পতঙ্গের দেহ দেখে বিজ্ঞানীরা প্রাচীন পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন।
মশাসদৃশ প্রাচীন পতঙ্গের এমন জীবাশ্মও পাওয়া গেছে। ফলে বলা যায়, মশার বংশের ইতিহাস মানুষের ইতিহাসের তুলনায় অবিশ্বাস্য রকম পুরোনো। তবে একটি প্রচলিত ধারণা নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার ডাইনোসরদের রক্ত খেয়ে মশা বেঁচে থাকত, এমন সরাসরি প্রমাণ নেই। জনপ্রিয় সিনেমা বা গল্পে ডাইনোসরের রক্ত খাওয়া মশার কল্পকাহিনি দেখা গেলেও বাস্তব বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এতটা সরল নয়। প্রাচীন মশার খাবার ও আচরণ সম্পর্কে অনেক তথ্যই এখনো গবেষণার বিষয়।
মশার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তাদের অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা। পৃথিবীর জলবায়ু বহুবার বদলেছে। বরফযুগ এসেছে, উষ্ণ সময় এসেছে, সমুদ্রের স্তর পরিবর্তিত হয়েছে, অসংখ্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। ডাইনোসরও প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। কিন্তু মশার বংশ টিকে গেছে।
এর একটি কারণ তাদের জীবনচক্র। মশার প্রজননের জন্য বিশাল কোনো জলাশয়ের প্রয়োজন হয় না। অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিও অনেক প্রজাতির মশার জন্য ডিম পাড়ার উপযুক্ত জায়গা হয়ে উঠতে পারে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন কিংবা কোনো ছোট পানির আধারেও তাদের জীবনচক্র শুরু হতে পারে।
মশার জীবনচক্রও বেশ দ্রুত। ডিম থেকে লার্ভা, এরপর পিউপা এবং শেষে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয়। পরিবেশের উপযোগী পরিস্থিতি পেলে এই পুরো প্রক্রিয়া তুলনামূলক অল্প সময়েই সম্পন্ন হতে পারে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম দ্রুত তৈরি হওয়ার সুযোগ পায়।
মানুষের বিবর্তন ও বিস্তারের সময়কাল মশার ইতিহাসের তুলনায় অত্যন্ত সাম্প্রতিক। আধুনিক মানুষের আবির্ভাব প্রায় ৩ লাখ বছর আগে। তার কয়েক কোটি বছর আগে পৃথিবীর জীবজগতে নানা ধরনের পতঙ্গের বিকাশ ঘটেছিল। অর্থাৎ পৃথিবীর ইতিহাসকে যদি একটি বিশাল বই হিসেবে কল্পনা করা হয়, তাহলে মানুষের অধ্যায়টি এসেছে একেবারে শেষের দিকের পাতায়। মশার গল্প শুরু হয়েছে তার অনেক আগে।
এ কারণেই ‘মানুষের আগেই পৃথিবীতে মশার রাজত্ব ছিল’ কথাটি আক্ষরিক অর্থে নয়, বরং মশার দীর্ঘ অস্তিত্ব বোঝাতে ব্যবহার করা যায়। তারা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো জীবদের মধ্যে না হলেও, মানুষের তুলনায় তাদের ইতিহাস যে অবিশ্বাস্যভাবে দীর্ঘ এ নিয়ে সন্দেহ নেই।
আজকের পৃথিবীতে মশা শুধু বিরক্তির কারণ নয়। কিছু প্রজাতি ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা, ইয়েলো ফিভার ও অন্যান্য রোগের জীবাণু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে আকারে কয়েক মিলিমিটারের এই প্রাণীটি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
তবে প্রকৃতির দৃষ্টিতে মশার ভূমিকা শুধু রোগ ছড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মশার লার্ভা জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ এবং পূর্ণাঙ্গ মশাও বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য হতে পারে। কিছু মশা ফুলের মধু ও উদ্ভিদের রস খায় এবং পরাগায়নেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই মশাকে শুধু মানুষের শত্রু হিসেবে দেখলেই হবে না পরিবেশে তাদের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না।


