আখেরি নবী হজরত মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি ভালোবাসা ইমানের পরিপূর্ণতার জন্য বুনিয়াদি শর্ত। নবী পাক (সা.) ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কাছে আমি তার পিতামাতা, সন্তানাদি এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে প্রিয় না হবো। (সহিহ বুখারি: ১৫)
পবিত্র কোরআনেও একই ইশারা আছে—‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের প্রাণের চেয়ে বেশি প্রিয়।’ (সুরা আহজাব: ৬)
এই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় ফায়দা হলো এর মাধ্যমে নবীজির (সা.) আনুগত্য সহজ হয়ে যায়। মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার সন্তুষ্টিকে নিজের ইচ্ছার ওপর প্রাধান্য দেয়। তাই নবীজির (সা.) প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা থাকলে তার সুন্নত অনুসরণ করা, তার নির্দেশ মানা এবং নিজের প্রবৃত্তিকে তার আদর্শের অধীন করা কঠিন হওয়ার কথা নয়।
একবার হজরত ওমর ফারুক (রা.) নবীজিকে (সা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমার কাছে সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়, কেবল আমার জীবন ছাড়া।
নবীজি (সা.) বলেন, আল্লাহর কসম যার হাতে আমার প্রাণ, ইমান পূর্ণ হবে না যতক্ষণ না কারও কাছে আমি তার জীবনের চেয়ে বেশি প্রিয় হবো।
নবীজির (সা.) এই কথা ওমরের (রা.) মনে বিদ্যুতের মতো স্পর্শ করল, এবং তার মন ওই সময়ই বদলে গেল। তিনি বললেন, খোদার কসম, আপনি আপনি আমার জীবনের চেয়ে বেশি প্রিয়।
নবীজি (সা.) বললেন, ওমর, এইমাত্র তোমার ইমান পরিপূর্ণ হলো। (সহিহ বুখারি: ৬৬৩২)
আরেকটি হাদিসে আছে, একবার নবীজি (সা.) হজরত আনাসকে (রা.) উদ্দেশ্য করে বলেন, বেটা, তুমি যদি পারো তাহলে অবশ্যই এমনভাবে সকাল-সন্ধ্যা পার করবে যে, তোমার মনের মধ্যে কারও প্রতি ঘৃণাবোধ থাকবে না। কেননা এটাই আমার পথে চলার নিয়ম। আর যে ব্যক্তি আমার পথে চলে, সেই প্রকৃতপক্ষে আমাকে ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসে, জান্নাতে সে আমার সাথে থাকবে। (সুনানে তিরমিজি: ২৮৯৪)
নবীজির (সা.) প্রতি মহব্বতের দ্বিতীয় বড় ফায়েদা হলো প্রত্যেক আশেকে রাসুলের জন্য রয়েছে সুসংবাদ, যেই সুসংবাদ স্বয়ং নবীজি (সা.) দিয়ে গেছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক সাহাবি নবীজির (সা.) দরবারে এসে জিজ্ঞেস করেন, কেয়ামত কবে?
নবীজি (সা.) জানতে চাইলেন, তুমি এর জন্য কী কী প্রস্তুতি নিয়েছ?
সাহাবি বললেন, আমি অধিক পরিমাণে নামাজ, রোজা ও জাকাত-সদকা আদায় করে কোনো প্রস্তুতি তো নিতে পারিনি, কিন্তু আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি আমার ভালোবাসা আছে।
নবীজি (সা.) তখন বললেন, তুমি তার সাথেই থাকবে যাকে তুমি ভালোবাসো। (সহিহ বুখারি: ৬১৭১) সাহাবি বলেন, এই সুসংবাদের পর আমি এত খুশি হয়েছি, ইসলাম গ্রহণের পর অন্যকিছুতে এত খুশি হইনি।
নবীজির (সা.) প্রতি মহব্বত প্রকাশের অনেক মাধ্যম আছে, যেমন তার জীবন ও আদর্শ নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা করা, ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করা এবং তার প্রতি দরুদ পাঠ করা। তার সাহাবায়ে কেরাম, আহলে বাইত (অর্থাৎ তার পরিবারের সদস্য) ও উম্মতের প্রতি মহব্বত রাখাও তার মহব্বতের অংশ।
তবে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, আর তা হলো সব ভালোবাসার ঊর্ধ্বে নবীজিকে (সা.) কীভাবে ভালোবাসা সম্ভব?
আসলে মানুষের ভালোবাসা দুই ধরনের:
- স্বভাবজাত ভালোবাসা
- মস্তিষ্কজাত ভালোবাসা
পিতামাতা, স্বামী বা স্ত্রী, সন্তানাদির প্রতি ভালোবাসা স্বভাবজাত। আপনি জন্মলাভ করে যাদেরকে দেখেছেন আপনাকে জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, বিপরীতে তার প্রতিও ভালোবাসা তৈরি হয়ে যাবে। তারপর, নারী ও পুরুষের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ স্বভাবজাত, আল্লাহ তাআলাই বংশবৃদ্ধি ও মানবজীবনকে অর্থবহ বানাতে এই নিয়ম তৈরি করেছেন। সন্তানাদির প্রতি ভালোবাসাও একই রকম, মানুষ তাদেরকে নিজেরই অংশ মনে করে, সন্তানের মুখে নিজেরই ছায়া দেখে, এই কারণে তাদের ভালোবাসে। এইসব ভালোবাসায় মস্তিষ্কের ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না।
কিন্তু মানুষ যদি মস্তিষ্ক ব্যবহার করে কাউকে ভালোবাসে, সেই ভালোবাসা স্বভাবজাত ভালোবাসা একদম আলাদা হয়। সেখানে থাকে আদর্শ ও বিশ্বাস। সেই ভালোবাসা মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই ভালোবাসার জন্য মানুষ পিতামাতা ও স্ত্রী-সন্তানদেরও বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কেননা সেখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বাস; আর বিশ্বাসই মানুষের চালিকাশক্তি, একে ছাড়া চলা সম্ভব নয়।
ইমানের পূর্বশর্ত হিসাবে যে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে, তা মস্তিষ্কজাত ভালোবাসা। সাহাবায়ে কেরাম নবীজির (সা.) প্রতি এই ভালোবাসাই নিবেদন করেছিলেন, এবং আমাদেরও একইভাবে তাকে ভালোবাসতে হবে।


