আলোচিত বাবরি মসজিদকে মন্দিরই বানাতে বললেন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট

আলোচিত বাবরি মসজিদকে মন্দিরই বানাতে বললেন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট
ভারতের অযোধ্যায় প্রায় সাত দশকের পুরোনো বাবরি মসজিদের জমিতে মন্দির গড়ার জন্যই সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে।  বাবরি মসজিদের জন্য আলাদা জমি দেয়ার নির্দেশও দেয়া হয়েছে রায়ে।

রায়ে মন্দির গড়ার জন্য সরকারকে একটি ট্রাস্ট গঠন করতেও বলা হয়েছে। তবে ভরতের এই অযোধ্যাতেই অন্যত্র একটি মসজিদ গড়ার জন্য সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে পাঁচ একর জমি বরাদ্দের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে কোর্ট।

অযোধ্যার যে ২.৭৭ একর জমিকে বিরোধের মূল কেন্দ্র বলে গণ্য করা হয়, তা বরাদ্দ করা হয়েছে ‘রামলালা বিরাজমান’ বা হিন্দুদের ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের বিগ্রহকে। যার অর্থ সেখানে রামমন্দিরই তৈরি হবে।

ভারতের শীর্ষ আদালতে পাঁচ সদস্যের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে এই রায় দিয়েছে। প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক আদালত এই রায় দিয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কোন সুযোগ নেই, কারণ এটিই ভারতের সর্বোচ্চ আদালত।

প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘এই রায় সম্পূর্ণ ঐক্যমত্যের একটি রায়। তবে মসজিদের নীচে ঠিক কোন নির্মাণ ছিল এখনো তা নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেনি অর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া। 

ভারতের সর্বোচ্চ আদালত জানিয়েছে, কোনো ফাঁকা জায়গায় মসজিদ তৈরি হয়নি। ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে এখানে শেষবার নমাজ হয়েছিল। সেক্ষেত্রে বিকল্প জমি পাবে মুসলিমরা। এমনকি শর্তসাপেক্ষে হিন্দুদেরও মূল বিতর্কিত অংশ থেকে জমি দেওয়া হবে।

স্থানীয় সময় শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দেশটির প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ ভারতের বর্তমান রাজনীতির অত্যন্ত স্পর্শকাতর এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

রায় ঘোষণার কার্যক্রম শুরু হলেও সম্পূর্ণ রায় আসতে প্রায় আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগবে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম ‘এনডিটিভি’।

সুপ্রিম কোর্টে একটানা ৪০ দিন শুনানি হওয়ার পরে রায় লেখার জন্য মাসখানেক সময় নেয়া হয়। প্রধান বিচারপতি ছাড়া বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন এস এ বোডবে, ওয়াই ভি চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ ও এস আবদুল নাজির।

অযোধ্যার বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানটি যে উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে, সেখানে ইতিমধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বারো হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অযোধ্যায় কারফিউ জারি রয়েছে গত প্রায় দুসপ্তাহ ধরে।

এদিন রায় ঘোষণার আগে গতকাল প্রধান বিচারপতি গগৈ শুক্রবারই রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উত্তরপ্রদেশের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন।

উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক ও রাজস্থান-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে আজ স্কুল-কলেজ সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখা হয়েছে। শনিবার হওয়ার কারণে বেশির ভাগ সরকারি অফিসেও ছুটি।

১৯৯২ সালে কট্টর হিন্দুরা বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার পর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় কমবেশি ২০০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিল।

কট্টরপন্থী হিন্দুরা দাবি করেন বাবরি মসজিদের জায়গাতেই ভগবান রামের জন্ম হয়েছিল এবং একটি রামমন্দির ভেঙ্গে মোগল আমলে সেখানে মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল।

বাবরি মসজিদ আর রাম জন্মভূমি নিয়ে বিতর্ক কয়েক শতাব্দী ধরে। এ নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বারে বারে দাঙ্গা হয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার ভেতরের অংশটা মুসলিমদের আর বাইরে চত্বরটা হিন্দুদের ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল।

কিন্তু ১৯৪৯ সালে মসজিদের ভেতরে কে বা কারা রামের মূর্তি রেখে দেয়। মুসলিমরা তখনই প্রতিবাদ করেন এবং সরকার জমিটিকে বিতর্কিত ঘোষণা করে তালা বন্ধ করে দেয়। জমির মালিকানা কার সেটা ঠিক করতে সেবছরই আদালতে প্রথম মামলা হয়।

এরপরে ফৈজাবাদের জেলা আদালত ১৯৮৬ সালে তালা খুলে হিন্দুদের পূজার অনুমতি দেন। আর তখন থেকেই রাম জন্মভূমি আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। অন্যদিকে মামলাও চলতে থাকে।

২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট নির্দেশ দেয় যে বিতর্কিত জমিটি তিনভাগ হবে-দুভাগ পাবেন হিন্দুরা আর এক ভাগ পাবে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড।

তার বিরুদ্ধে সবপক্ষই সুপ্রিম কোর্টে যায় ২০১১ সালে। সুপ্রিম কোর্ট আদালতের বাইরে সব পক্ষকে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা ব্যর্থ হওয়ায় মামলাটি বিশেষ বেঞ্চ শুনানি শুরু করে।

শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট আচমকা এই মামলার রায় শনিবার ঘোষণা করা হবে বলে জানান। অযোদ্ধা মামলার রায়কে কেন্দ্র করে রাজ্যের উত্তরপ্রদেশের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতেও অতিরিক্ত নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরপ্রদেশে ১৪৪ ধারা জারি করেছে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

কলকাতার বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার বলছে, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যসচিব রাজেন্দ্রকুমার তিওয়ারি ও পুলিশের ডিজি ওমপ্রকাশ সিংহকে শুক্রবার দুপুরে নিজের চেম্বারে ডেকে পাঠিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। অযোধ্যাসহ রাজ্যের নিরাপত্তার আগাম কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার কথা হয়। তখনও স্পষ্ট ছিল না, কবে অযোধ্যা মামলার রায়।

রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ বিতর্কিত জমি মামলার রায়ের জন্য অযোধ্যা ইতোমধ্যে দুর্গের চেহারা নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার আগেই চার হাজার আধাসেনা পাঠিয়েছে। ৭৮টি রেল স্টেশনের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের সব স্কুল-কলেজও বন্ধ রাখা হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বৃহস্পতিবার প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে প্রশাসন এবং পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক করেন। লখনউ এবং অযোধ্যায় দু’টি হেলিকপ্টার মোতায়েন রাখার সিদ্ধান্ত হয়। উত্তরপ্রদেশে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে শুক্রবার রাত থেকে।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুধবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে নির্দেশ দিয়েছেন, অযোধ্যায় রায় নিয়ে কোনো অগোছাল মন্তব্য করা চলবে না। নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে অন্য রাজ্যেও। কলকাতার পুলিশ কমিশনার সব থানার ওসিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক থাকার নির্দেশ পাঠিয়েছেন।

উত্তরাখণ্ড, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ ও জম্মুর স্কুল-কলেজও শনিবার বন্ধ রাখা হচ্ছে। প্রধান বিচারপতিসহ অযোধ্যা বেঞ্চের পাঁচ বিচারপতির জন্য বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে বহুল আলোচিত এই মামলার রায় যে শনিবারই ঘোষণা করা হবে, তা কেউ ভাবেননি। ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ অবসর নেবেন ১৭ নভেম্বর।

আগামী সপ্তাহে সোম ও মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে ছুটি। ফলে ধরে নেয়া হয়েছিল, বুধ থেকে শুক্রবারের মধ্যে কোনও দিন রায় ঘোষণা হবে। কারণ ওই তিনটিই কাজের দিন বাকি ছিল। শনিবার সুপ্রিম কোর্টে ছুটির দিনে এমন রায় ঘোষণা প্রায় নজিরবিহীন। আচমকা শনিবার রায় ঘোষণার সিদ্ধান্ত আসলে অশান্তি তৈরির পরিকল্পনা করার আগেই তা রোখার চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।

রামমন্দির নির্মাণ বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকলেও মোদি সরকারের অবস্থান ছিল, আদালতই শেষ কথা বলবে। কংগ্রেস ও অন্য বিরোধী দলগুলোও আদালতের রায়ে আস্থা রাখার কথা বলেছে। ৬ আগস্ট থেকে টানা ৪০ দিন ধরে অযোধ্যা মামলার শুনানির পর ১৬ অক্টোবর রায় স্থগিত রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট। ১৯৭৩ সালের কেশবানন্দ ভারতীর মামলার পর আর কোনও মামলায় এত দীর্ঘদিন সাংবিধানিক বেঞ্চে শুনানি হয়নি।

অযোধ্যার রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদের ২.৭৭ একর বিতর্কিত জমির আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত ১৯৫০ সালে। রামলালার ভক্ত গোপাল সিংহ বিশারদ বাবরি মসজিদকেই রামের জন্মভূমি দাবি করে সেখানে পুজার অধিকার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। তার আগেই বাবরি মসজিদে রামলালার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

পরমহংস রামচন্দ্র দাস সেখানেই পুজার দাবি করে মামলা করেন। ১৯৬১ সালে উত্তরপ্রদেশের সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড জমির অধিকার চেয়ে আদালতে যায়। ‘রামলালা বিরাজমান’ নিজেও মামলার পক্ষ হয়ে ওঠেন। দেবতার হয়ে তার ‘সখা’, এলাহাবাদ হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি দেবকীনন্দন আগারওয়ালের প্রধান দাবি, রামের জন্মভূমিই দেবতার চরিত্র পেয়েছে।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে সব মামলা এলাহাবাদ হাইকোর্টে চলে আসে। ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল, সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখাড়া, রামলালার মধ্যে জমি সমান ভাগে করে দেয়া হোক। এর ফলে হিন্দুরা পায় জমির তিন ভাগের দু’ভাগ। মুসলিমরা এক ভাগ। এর বিরুদ্ধে সব পক্ষই সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে। রামলালা বিরাজমানের আইনজীবীরা দাবি করেন, রামের জন্মভূমি দেবতা-স্বরূপ। তার ভাগ হয় না।

নাবা/ডেস্ক/কেএইচ/

রিলেটেড নিউজঃ