দেশকে এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনার পাশে থাকুন

দেশকে এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনার পাশে থাকুন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপমহাদেশ বরেণ্য তিন নেতার সাথে রাজনীতি করেছেন। এঁরা হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও মওলনা হামিদ খান ভাসানী। তিনি তাঁদের থেকে শিখেছেন অনেক। বাঙালি জাতিও বঙ্গবন্ধু থেকে পেয়েছে অনেক। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল পরাধীনতা থেকে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্থান করে নেয়া। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছেন বাঙালিরা ক্ষুধা-দারিদ্রে ভুগবে না। উন্নত দেশের মানুষের মত মাথা উঁচু করে বাঁচবে বাংলার জনগণ। এ দেশ পরিচিত হবে সোনার বাংলা হিসেবে। বঙ্গবন্ধু কাজও শুরু করেছিলেন, কিন্তু জঘন্য নিচ-ঘাতকদের বুলেট সেই স্বপ্নকে স্তব্ধ করে দেয়। ঘাতকরা জানত না, নেতার মৃত্যু হয় সত্য কিন্তু নেতৃত্বের বা আদর্শের মৃত্যু হয় না। চে গুয়েভারা, মহাত্মা গান্ধী, জর্জ ওয়াশিংটন প্রমুখ নেতার মৃত্যু হলেও তাঁদের আদর্শ আজও অমর হয়ে আছে। তেমনি ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেও তাঁর আদর্শকে হত্যা করা যায়নি। বরং জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব ও তাঁর আদর্শ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। দিন যত যাবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনার আরো সম্প্রসারণ ঘটবে। 


বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর সোনার বাংলার স্বপ্ন শ্মশানে পরিণত হয়েছিল। গণতন্ত্র ছিল আইসিউতে বন্দী। সামরিক শাসনের যাঁতাকলে দেশের মানুষ ছিল অতিষ্ঠ। ১৯৮১ সালে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা স্বদেশে ফেরেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে শুরু করেন আন্দোলন। বছরের পর বছর রাজপথে ছিলেন তিনি। তারপর যখন ১৯৯৬ সালে  ক্ষমতায় এসে নতুন করে শুরু করলেন দেশ গঠনের কাজ। শেখ হাসিনা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসেন ২০০৮ সালে। তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন তখন দুর্নীতির চারণক্ষেত্র বাংলাদেশ। বিএনপির আমলে দেশ দুর্নীতিতে হ্যাট্রিক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই দুর্নীতি বন্ধে বিভিন্ন ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ২০০৮ থেকে টানা তৃতীয় মেয়াদে বঙ্গবন্ধুকন্যা এখন রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। তাঁর শাসনকালে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। কেবল ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি, এর বাস্তবায়নও করছেন তিনি। ফলে বাংলাদেশ এখন আর দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মত লজ্জাজনক অবস্থানে নেই। ২০১৮ সালে দুর্নীতির বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭তম। জননেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরো বড় যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি নিজের ঘর থেকে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করছেন। দুর্নীতির জালে ধরা পড়া রাঘব-বোয়ালদেরও তিনি ছাড়ছেন না। অনেকে ভেবেছিল ক্যাসিনো অভিযানে জিকে শামিম, সম্রাটের দলীয় পরিচয়ে বেঁচে যাবে, কিন্তু সেই ভাবনা যে ভুল তা কদিনেই প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি বিতর্কিত যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীও বাদ পড়েছেন। শুধু তাই না, রয়েছেন গ্রেফতার আতঙ্কেও। তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর আগে বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য ছাত্রলীগের শীর্ষ দু নেতাকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। এত দ্রুত ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায়ে এমন পরিবর্তন হবে তা কেউ ভাবতে পারেননি। 

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করেন শেখ হাসিনা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান আপসহীন। যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মধ্যে এত বড় রদবদল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জননেত্রীর আপসহীন মানসিকতার প্রমাণ দেয়। তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, দুর্নীতি যে করুক ছাড় নেই। দলীয় হোক বা যেই পরিচয়ই তার হোক, দুর্নীতিবাজদের রেহাই নেই। অর্থাৎ দুর্নীতিবাজের বড় পরিচয় হবে কেবল দুর্নীতিবাজ। দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের দেশ, দল, ধর্ম নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থান সচেতন মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কঠোরতার কারণে আগামীতে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি বহুলাংশে কমবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আরো পড়ুন: প্রবাসি বান্ধব শেখ হাসিনা সরকার

রাষ্ট্র পরিচালনা করেন জনপ্রতিনিধিরা। তাই বলে রাষ্ট্রের উন্নয়নের দায়দায়িত্ব কেবল জনপ্রতিনিধিদের একার নয়। রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের করণীয় অনেক কিছু আছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, কিন্তু একার পক্ষে এ যুদ্ধে তাঁর জয়ী হওয়া সম্ভব না। বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতির মূল উৎপাটন করতে হলে জনগণকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে হবে। কোনো কিছু খারাপ হলে আমরা যেমন প্রতিবাদ মিছিল মিটিং সমাবেশ করি, তেমনি ভালো কিছু হলেও সেটাকে স্বাগত জানানো প্রয়োজন। তাহলেই সে কাজটির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন, আমাদেরও তাঁর পাশে থাকতে হবে। তাহলেই দুর্নীতির প্রতিরোধে অবস্থান আরো জোরালো ও ফলপ্রসূ হবে।


বঙ্গবন্ধু শুরু থেকেই দুর্নীতিমুক্ত দেশের স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৫৬ সালে তিনি কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। ওইসময় পিরোজপুর শহরের গোপালকৃষ্ণ টাউন ক্লাব মাঠে জনসভায় তিনি বলেছিলেন, ‘...কোনো অফিস-আদালতে দুর্নীতি হলে এবং আপনাদের নিকট কেউ ঘুষ চাইলে সঙ্গে সঙ্গে তিন পয়সার একটি পোস্ট-কার্ডে লিখে আমাকে জানাবেন। আমি দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব, যাতে দুর্নীতি চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।’ ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘...যথেষ্ট কাজ পড়ে রয়েছে। আপনারা জানেন, আমি সমস্ত জনগণকে চাই, যেখানে রাস্তা ভেঙে গেছে, নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দেও। আমি চাই জমিতে যাও, ধান বোনাও, কর্মচারীদের বলে দেবার চাই, একজনও ঘুষ খাবেন না, ঘুষখোরদের আল্লাহ ক্ষমা করবে না, আমিও না।’ অধিকাংশ বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু দুর্নীতিকে দেশ থেকে উৎখাতের কথা বলেছেন। তিনি ১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি কুমিল্লা সেনানিবাসে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। এদিন বজ্রকণ্ঠে তিনি বলেন, ‘...বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে আমাকে আনতে হয়, আর এই চোরের দল আমার দুঃখী মানুষের সর্বনাশ করে এভাবে লুটতরাজ করে খায়। আমি শুধু এমার্জেন্সি দিই নাই, এবারে প্রতিজ্ঞা করেছি, যদি ২৫ বছর এই পাকিস্তানি জালেমদের বিরুদ্ধে, জিন্নাহ থেকে আরম্ভ করে গোলাম মোহম্মদ, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে বুকের পাটা টান করে সংগ্রাম করে থাকতে পারি, আর আমার ৩০ লক্ষ লোকের জীবন দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি, তাহলে পারব না? নিশ্চয়ই ইনশাআল্লাহ পারব। এই বাংলার মাটি থেকে এই দুর্নীতিবাজ, এই ঘুষখোর, এই মুনাফাখোরী এই চোরাচালানকারীদের নির্মূল করতে হবে। আমিও প্রতিজ্ঞা নিয়েছি, তোমরাও প্রতিজ্ঞা নাও, বাংলার জনগণও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করো। আর না, অধৈর্য, সীমা হারিয়ে ফেলেছি। এই জন্য জীবনের যৌবন নষ্ট করি নাই। এই জন্য শহীদরা রক্ত দিয়ে যায় নাই। কয়েকটি চোরাকারবারি, মুনাফাখোর, ঘুষখোর দেশের সম্পদ বাইরে বাইর করে দিয়ে আসে, ...মানুষকে না খাইয়া মারে। উৎখাত করতে হবে বাংলার বুকের থেকে এদের। দেখি কত দূর তারা টিকতে পারে।’ বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ জীবনের শেষ জনসভায় বক্তব্য রাখেন। এ ভাষণে তিনি দুর্নীতিকে নির্মূল করা জনগণের প্রথম কাজ হিসেবে ঘোষণা করেন। বাকশাল গঠনের উদ্দেশ্যও যে দুর্নীতিহীন বাংলাদেশ, দুর্নীতিবাজ নির্মূল করা ছিল-তা বঙ্গবন্ধু এ ভাষণে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে। আমি কেন ডাক দিয়েছি? এই ঘুণে ধরা ইংরেজ আমলের, পাকিস্তানি আমলের যে শাসনব্যবস্থা তা চলতে পারে না। একে নতুন করে ঢেলে সেজে গড়তে হবে।... সরকারি আইন করে কোনো দিন দুর্নীতিবাজদের দমন করা সম্ভব নয়, জনগণের সমর্থন ছাড়া। আজকে আমার একমাত্র অনুরোধ আপনাদের কাছে সেটা হলো এই, আমি বলেছিলাম প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব বাংলার জনগণকে, এক নম্বর কাজ হবে দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে।’ 


অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এরপর সেই ভয়াল কালরাত ১৫ আগস্টে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে সপরিবারে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু। তাঁর ক্ষুধা-দারিদ্র-দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছেন। সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। জননেত্রী ও দেশরত্ন শেখ হাসিনা জানেন, যদি দুর্নীতি না থামানো যায় তবে উন্নয়ন টেকসই হবে না। দুর্নীতিবাজরা সোনার বাংলাকে আবার শ্মশান করে ফেলবে। তাই বঙ্গবন্ধুর মতই তিনি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের শপথ নিয়েছেন। এখন জনগণের দায়িত্ব হল এ অভিযানকে গণআন্দোলনে রূপ দেয়া এবং প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার সাথে থাকা। তাহলেই দুর্নীতিবাজদের পতন হবে, বাংলাদেশ সোনার বাংলা হবে।

আরো পড়ুন: শেখ হাসিনার কুটনৈতিক সাফল্য

আরেকটি কথা বলে লেখাটি শেষ করছি। দুর্নীতি হচ্ছে বিষধর সাপ, একে নিধন করতে হলে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। অসতর্ক হওয়ার সুযোগ নেই। এ অভিযানের কারণে অনেক রাঘব-বোয়ালের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান হুমকির মুখে পড়েছে। আরো অনেকের পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিজেদের বাঁচাতে দুর্নীতিবাজরা ষড়যন্ত্র করবেই। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে তাই সকল ষড়যন্ত্র হতে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো অশুভ শক্তি যেন এ আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে না পারে-সেজন্য জনগণকেও তাঁর পাশে থাকতে হবে।

জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর বঙ্গবন্ধু ও এ দেশের আপামর জনগনের দোয়া আছে ও নেতাকর্মীদের ভালবাসা আছে, আছে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের আস্থা। তিনি সফল হবেন, হবেনই ইনশাল্লাহ।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

 ড. মোহাম্মদ হাসান খান
সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।