রাশিয়ার - সৌদি আরব সহ অবস্থানে?

রাশিয়ার - সৌদি আরব সহ অবস্থানে?

বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়া ও সৌদি আরব বিপরীত দিকে অবস্থান করছে।  সিরীয় যুদ্ধে রাশিয়ার সমর্থন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প্রতি।

সৌদি আরবের ইয়েমেন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। অন্যদিকে সৌদি আরবও সম্প্রতি রাশিয়ার দেওয়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

এছাড়া রিয়াদ সম্প্রতি তিন হাজার মার্কিন সেনাসহ ফাইটার ও বিমানসেনাকে সৌদি আরবে মোতায়েনের অনুমতি দিয়েছে। এমন অবস্থার মধ্যেই সৌদি আরব সফরে গেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। 

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটি (রাশিয়ান টেলিভিশন) পুতিনের এই সফরকে দেখছে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে। তারা বলছে, তেল-গ্যাস ও অস্ত্রখাতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক নিবিড় হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছে, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চাইছে, যেখানে সৌদি আরব রয়েছে সহযোগীর ভূমিকায়। পুতিনের সৌদি সফর দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারেরই আভাস দেয়।

একদিনের রাষ্ট্রীয় সফরের অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার সৌদি আরব পৌঁছান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বিগত ১২ বছরে এটি তার প্রথম সৌদি সফর।

সর্বশেষ ২০০৭ সালে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। রুশ প্রেসিডেন্টের বিরল এই সফর নিয়ে তাই শুরু হয়েছে আলোচনা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞরা একে বিশ্লেষণ করছে দুই পক্ষের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে।

গতকাল সোমবার সৌদি সফরে এসে পুতিন দেশটির বাদশা সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট আগে থেকেই এ দুজনের সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে বলেও দাবি করে আসছিলেন।

গতকাল সোমবার টেলিভিশনে দেওয়া মন্তব্যে পুতিন ও সৌদি বাদশা সালমান দুজনই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বৈঠক শেষে পুতিন বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গঠনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি।

আর সৌদি বাদশা সালমান বিন আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমরা সন্ত্রাসবাদের লড়াইয়ে এবং নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অর্জনে রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করার কথা ভাবছি।

এদিন সৌদি তেল-বিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আজিজ বিন সালমান দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি, পেট্রোকেমিক্যাল, পরিবহন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত চুক্তিসহ ২০টি সমঝোতা চুক্তির নেতৃত্ব দেন।

 রাশিয়া ও সৌদি আরবের মধ্যকার সোমবারের বৈঠক দুই দেশের জোরালো সম্পর্কেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবেই সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় প্রভাব বিদ্যমান। বিশেষ করে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার প্রশ্নে।

তবে রুশ বার্তা সংস্থা আরটির মতে, রাশিয়া তা আমলে নেয়নি। বরং সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সুসম্পর্কের কথা বলছে ওই সংবাদমাধ্যম।

আরটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে খুবই আন্তরিকভাবে কথা বলতে দেখা গেছে পুতিনকে।

তাছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈঠকে যুবরাজ ও সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজের ব্যাপারে তার ব্যক্তিগত সমর্থনের কথা জানিয়েছেন পুতিন।

 রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় যৌথ বিনিয়োগের পাশাপাশি সিরিয়া ও ইয়েমেনে সংঘাতের বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে জানিয়ে যুবরাজ মোহাম্মদ বলেছেন, জ্বালানি খাতে সৌদি আরব ও রাশিয়ার সহযোগিতা স্থিতিশীলতা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, তেলের বাজারের একসময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়ার সঙ্গে ওপেকের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব অপরিশোধিত জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখতে যখন থেকে ওপেক প্লাস জোটের সূচনা করেছিল, তখন থেকেই এ খাতে দুই দেশের সম্পর্ক ভালো হতে শুরু করে।

আরটি জানিয়েছে, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ২০১৮ সাল থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে ৩৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যৌথভাবে ১০০ কোটি ডলারের তেল স্থাপনা করার কথা রয়েছে তাদের। এছাড়াও চলতি সপ্তাহে আসতে পারে আরও বেশ কিছু চুক্তির ঘোষণা।

 যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রকাশ্য শত্রু’র সবচেয়ে বড় মিত্রই হচ্ছে রাশিয়া। সৌদি আরবের সঙ্গেও চিরবৈরিতা ইরানের। গত মাসে সৌদি আরবে দুটি তেল স্থাপনায় হামলার জন্য তেহরানকেই দায়ী করে রিয়াদ।

ইরানি আগ্রাসন মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েনেরও অনুমিত দিয়েছে তারা। ইয়েমেন ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সামরিক লড়াই চলছে সৌদি আরবের। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও সৌদি আরবের অবস্থান ইরান ও রাশিয়ার বিপরীত।


তা সত্ত্বেও ২০ বছরে আগের চেয়ে এখন সৌদি আরবের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ভালো। পুতিন যখন দায়িত্ব নেয় তখন রাশিয়া অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত।

বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেয়ে অভ্যন্তরীণ সংকট কাটাতেই তখন হিমশিম খাচ্ছিলো দেশটি। সেখান থেকে দেশকে টেনে তোলেন ভ্লাদিমির পুতিন। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা। সিরিয়ায় দুই দেশ ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত থাকলেও ২০১৭ সালে ঠিকই মস্কো সফর করেন সৌদি যুবরাজ বিন সালমান।

আরটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে এবং সৌদি আরবও এখন নতুন এই শক্তির সঙ্গে এক হতে চাইছে। সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন নোসোসের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক আম্মার ওয়াকাফ বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে রুশ প্রভাবে পরিবর্তন এসেছে।

আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব এখন তাদের। তাই অনেক প্রথাগত মার্কিন মিত্র দেশগুলো রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে এবং এই অঞ্চলে তাদের গ্রহণ করছে।

 বিশেষ করে সৌদি আরবের ব্যাপারটি উল্লেখযোগ্য। তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ওপেকে তাদের অংশীদারিত্ব বাড়ছে।

পুতিনও সেখানে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ওয়াকাফ বলেন, তেল ও গ্যাস সহযোগিতা ছাড়াও অনেক দেশ রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার মূল কারণ তাদের অস্ত্র।

তবে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সাংবাদিক ও লেখক আলি রিজক বলেন, রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ সৌদি আরব কিনবে কিনা তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্র ও কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে সৌদি আরবের। তাই রুশ অস্ত্র কিনে দূরত্ব আরও বাড়াবে বলে মনে করেন না তিনি।

 মস্কোর হাইয়ার স্কুল অব ইকোনমিকস-এর প্রভাষক গ্রেগরি লুকিয়ানো বলেন, রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে গেলে সৌদি আরবের পুরো প্রবাহই পাল্টাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বদলে রুশ যন্ত্রপাতি নিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এটা হয়তো খুব ব্যয়সাপেক্ষ নয়, তবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমার মনে হয় না সৌদি আরব এখন এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

 তবে সৌদি আরবের ভাষ্য অন্যরকম। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা আদেল আল জুবায়ের রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাদের মনে হয় না রাশিয়ার সঙ্গে ভালো সম্পর্কের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে কোনও প্রভাভ ফেলবে।

আমরা বিশ্বাস করি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তিশালী ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকার পরও আমরা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতেই পারি। সুত্র: আল জাজিরা , রয়টার্স।

নাবা/ ডেস্ক/ তানিয়া রাত্রি