ভালো নেই সাতক্ষীরার বাঁশ-বেতের শিল্পীরা

ভালো নেই সাতক্ষীরার বাঁশ-বেতের শিল্পীরা

সাতক্ষীরা জেলায় বাঁশ ও বেতের তৈরি হস্তশিল্প এক সময় বেশ জনপ্রিয় থাকলেও প্লাস্টিক সামগ্রীর ভিড়ে এ শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। এতে শত শত দক্ষ গ্রামীণ কারুশিল্পীরা আজ পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ ভ্যান-রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ আবার মুদি দোকান দিচ্ছেন। অনেকেই সেলুনির দোকান দিচ্ছেন বলে জানান তারা।

এক সময় জেলা হস্তশিল্পে বেশ সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্য ছিল। এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারুশিল্পী ছিলেন, যারা বংশ পরম্পরায় এই পেশায় জড়িত ছিলেন। তাদের তৈরি পণ্যের গুণগতমান খুব ভালো ছিলো। কিন্তু বাজারে আকর্ষণীয় নকশার প্লাস্টিক সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় বাঁশের তৈরি হস্তশিল্পের চাহিদা কমে যায়।

ঐতিহ্যবাহী সেই হস্তশিল্পের জাগরণ ঘটাতে ও কদর বাড়াতে সাতক্ষীরার শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে গুড়পুকুরের মেলায় নানা ডিজাইনের বিভিন্ন প্রকারের গৃহস্থালীর জিনিসপত্রের পশরা সাজিয়ে বসেছেন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। প্লাস্টিক ও সিনথেটিক দ্রব্য ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব বুঝতে পেরে সাধারণ মানুষ এখন ওইসব দ্রব্যাদি ব্যবহারের পরিবর্তে বাঁশ ও বেতের তৈরি হস্তশিল্পের ব্যবহারে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন বলে জানান মেলার দর্শণার্থীরা।

মূলত গ্রামে বসবাসকারী কারুশিল্পীরা এখন বাঁশ ও বেত ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প তৈরি করছেন। এই পেশায় এসে তাদের অনেকেই বর্তমানে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেকার যুব মহিলা, দুস্থ নারী ও বিধবা মহিলারাও এখন এই পেশায় সংযুক্ত হয়েছেন। এই কাজে তারা প্রমাণ করেছেন দারিদ্র্যবিমোচন ও গ্রামাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য হস্তশিল্প একটি কার্যকর পেশা। প্রাইভেট সেক্টরের উদ্যোক্তারাও বেশি চাহিদা ও জনপ্রিয় হস্তশিল্প সামগ্রী তৈরি করছেন।

জেলার সদর উপজেলার ফিংড়ি, ধুলিহর, ব্রহ্মরাজপুর, আগরদাড়ি, শিবপুর, বৈকারী, কুশখালি, লাবসা, বল্লী, ঝাউডাঙ্গাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নারী উদ্যোক্তারা এখন ঝুঁকছেন গ্রামীন হস্তশিল্পের দিকে। তারা ফলের ট্রে, ফুলদানি, ঝুড়ি, মোড়া, এসট্রে, বাঁশিসহ বাঁশের তৈরি চমৎকার হস্তসামগ্রী তৈরি করে হারানো আভিজাত্য পুনরুদ্ধারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। এছাড়া বেতের তৈরি ধামা, পালি, এসট্রেসহ বিভিন্ন প্রকার প্রয়োজনীয় জিনিসও তৈরি করেন তারা।

বাসন্তী রানী দাস ও মিনতি দাস, পূর্ণিমা দাসসহ অনেকেই তাদের জীবনের গল্প উল্লেখ করে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তারা বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরি করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।

এসব উদ্যোক্তারা গত কয়েক বছর ধরে বাঁশ ও বেতের বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প তৈরি ও সরবরাহের জন্য অর্ডার পাচ্ছেন।

ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলায় খোঁজ করে পাওয়া যায় হস্তশিল্পের দোকান। বর্তমানে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিলুপ্ত হচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এসব পরিবেশ বান্ধব কুটির শিল্প। 

পুরাতন সাতক্ষীরার পার্শ্ববর্তী জেয়ালা গ্রামের ভোলানাথ দাসের ছেলে গুরু দাস বলেন, তিনি এই কাজ দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে করছেন। পরিবারে তার সদস্য সংখ্যা ৫ জন। ৩ কাঠা ভিটাবাড়ির উপর তার বসতি। তিনি এই কাজ অনেক সুনিপুনভাবে করেন। তার সঙ্গে বলে জানা যায়, আগের মতো তার এই হস্তশিল্পের আর কদর নেই, যেখানে ঠাঁই করে নিয়েছে প্লাস্টিক সামগ্রী। মেলায় এসে তেমন বিক্রিও হচ্ছে না তার। তবুও তিনি সুখে আছেন। তিনি অনেক মেলায় যান। মাইকেল মেলা, নলতা ওরস শরীফ, চৈত্র মাসে কলাপোতা মেলা, চৈত্রসংক্রান্তি মেলাসহ বিভিন্ন মেলায় পাওয়া যায় বাঁশ ও বেতের তৈরি বাহারী হস্তশিল্পের নানা উপকরণ। বাঁশ ও বেতের তৈরি এসব উপকরণের প্রত্যেকটি বুননের মাঝে লুকিয়ে আছে একেকটি পরিবারের সুখ-দু:খ, হাসি-কান্না, মান-অভিমান ও আনন্দ-বেদনার কাহিনী।

নাবা/ডেস্ক/ওমর


রিলেটেড নিউজঃ