মধ্যযুগের মধ্যমনির ভাষা ভালোবাসা

মধ্যযুগের মধ্যমনির ভাষা ভালোবাসা

‘যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’-সতেরো শতকের বাংলা ভাষায় লেখা সবচেয়ে শক্ত বাক্য জোড়া। সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় ও। প্রবাহ মান সময়ের স্রোতে আরো উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে অবস্থান জানান দিয়ে যাচ্ছে শব্দ গুলো। সময়ের আলোচিত বর্ণ গুলো আকার পেয়েছে যে কলমের তাকে সবাই আব্দুল হাকিম নামে চিনলে ও মনে রাখাটা মিথ্যে প্রমানিত।

আনুমানিক ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে নোয়াখালী জেলার বাবুপুর মতান্তরের চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপের সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল হাকিম। স্বদেশের ও স্বভাষার প্রতি তাঁর ছিল অপুরন্ত ভালোবাসা । এ ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা হিসাবে তিনি তুলে নেন কলম। বর্ণের সাথে বর্ণ মিলিয়ে তিনি শিল্প আঁকেন কবিতায়। কবিতার ছন্দে ছন্দে জুড়ে দেন ভালোবাসা। ভালোবাসার শব্দমালা গড়েন তিনি ভাষার প্রেমের প্রতিরুপে। নিপুন কারিগরি তে ভাষা ও ভাষা প্রীতিকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। নিপুন এ কারিগর হয়ে উঠেন আব্দুল হাকিম থেকে কবি আব্দুল হাকিম।

তাঁর আটটি কাব্যের কথা জানা গেছে। নূরনামা তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো- নুরনাম, নসীহতনামা, ইউসুফ-জুলেখা, শিহাবুদ্দিননামা, কারবালা ও শহরনামা, চারি মোকাম ভেদ, লালমতি, সয়ফুলমুলুক । বাংলা ভাষা ছাড়াও তিনি আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। বাঙালি হিসেবে তাঁর গর্ববোধ ছিল অসীম। সেসময় একশ্রেণির লোকের বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞার জবাবে তিনি তাঁর নূরনামা কাব্যে গ্রন্থটি তে উল্লেখযোগ্য অনেক গুলো কবিতা রচনা করেন। তার কিছু কিছু পরবর্তীতে অসংখ্য মুখপ্রিয় জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন সময়ের কালে হারিয়ে যাওয়া এ কবি দুঃখ।

সতেরো শতকে যখন বাংলা ভাষা টা কে অবঙ্গার চোখে দেখা হতো, যখন বাংলা ভাষা টা কে চাষা-ভুষাদের ভাষা হিসাবে বলা হতো, যখন বাংলা ভাষা টা কে দেখে উঁচু শ্রেণি না ছিঁটকাতো, ঠিক তখন ই জবাব দিতে এগিয়ে আসে আব্দুল হাকিমের কলম। তখন ই তিনি উচ্চ কন্ঠে বলে উঠেন ‘যে সব বঙ্গেতে জম্মে হিংস্র বঙ্গ বাণী,  সে সব কাহার জম্ম নির্নয় ন জানি’। পরবর্তী শতক জুড়ে যা হয়ে উঠে ভাষা প্রেমিকদের মুখের বাণী। চাকচক্য হীন সময় প্রবাহে ভাষার এ গর্বিত প্রেমিক তার কলম শক্তির আলপনা এঁকেছেন বাংলায়, বাংলা কে ভালোবেসে, বাংলা ভাষাকে হৃদয় ধারন করে।


সোনার তরী কবিতায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সোনার ধানের মাধ্যমে মহাকাল এ নিজকে অমর করতে অব্যক্ত বেদনা প্রকাশ করেছেন বোধ হয় কবি আব্দুল হাকিম কে ভেবে। পাঠ্য বইয়ের বই গুলো তে মুখে আওড়ানো ‘যে সব বঙ্গেতে.......’ প্রজম্ম কতটা এর মহান কারিগর কে চিনে বা মনে রাখে তা ঐতিহাসিক এক ইতিহাস! আজ যখন বিশ্ব জুড়ে বাংলা ভাষার জয়জয়কার, তখন কালের অন্ধকার গহব্বরে মিটেমিটে টিমটিম এ ঐতিহাসিক ভাষা প্রেমিক। না নোয়াখালি না সন্দ্বীপ! কোন অংশই মনে রাখাটা স্মরণীয় লিস্টে রাখে নি প্রতিবাদী এ কবি কে। গত বছরের শেষ দিকে চট্টগ্রামে ‘কবি আব্দুল হাকিম ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠন যাত্রা আরম্ভ করে। ঐ ছাড়াও সন্দ্বীপ উপজেলায় পাবলিক এক অডিটোরিয়াম "কবি আব্দুল হাকিম অডিটোরিয়াম’ এবং মাধ্যমিকের ‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটা না থাকলে হয়তো মেঘনা পাড়ের বিলীন হওয়া অসংখ্য মাটির স্তুপের মত মেঘনার গহব্বরে মিলিয়ে ই যেতো কালের এ সাহসী কলম সৈনিক।

সমাজ ব্যবস্থা যখন বাংলা ভাষা কে স্থান দিতে সংকুচিত ছিলো তখন নিজের কলম আর ভালোবাসা কে ধারন করে যুদ্ধে নামেন আব্দুল হাকিম। বাক্যে বাক্যে ছড়িয়ে দেন ভালোবাসা। এখনো সে ভালোবাসা কুড়াচ্ছি আমরা। সিক্ত হচ্ছি তার আবেশ এ। গর্বে এখন ও উচ্চ কন্ঠে ধারন করি কবির সে আবেগ। কিন্তু ভুলে যায় কবি কে! না ভুল হলো, ভুলে গেছি ই বলা চলে অনেকটা। না জানা মানুষ কে বাদ ই দিলাম, জানা মানুষ কয়জন নিবিড় ভাবে জানে কবি কে? থাক!  প্রশ্ন টা প্রশ্ন ই থাক। উত্তরে যদি নস্তক অবনত হয় তবে সে উত্তরে না জানা ভান টা ই না হয় বেশি করে থাকুক, তবুও বেহায়া মস্তক উঁচুই থাকুক!

ভাষা কে গভীর মমতায় যে কবি বুকে ধারন করেছে, ভালোবেসেছেন, ভাষায় বলেছেন ভাষার কথা। সে কবি কে আমরাও তো ধারন করার কথা বুকে, নিবিড় ভালোবাসায় আর পরম যত্নে। বিবেকের কাঠগড়ায় না হয় অব্যক্ত ই থাকুক আমি বা আমাদের কিংবা সমাজের দায়বদ্ধতা গুলো!!


নাবা/ডেস্ক/কেএইচ/

রিলেটেড নিউজঃ

    মতামত দিন