মাহমুদার শরীরজুড়ে স্প্রিন্টার : রায় বাস্তবায়নই জীবনের শেষ ইচ্ছা

মাহমুদার শরীরজুড়ে স্প্রিন্টার : রায় বাস্তবায়নই জীবনের শেষ ইচ্ছা

আজ ভয়াল একুশে আগস্ট। গ্রেনেড হামলা ঘটনার ১৫ বছর পার হয়েছে। হামলা মামলার রায়ও হয়েছে। কিন্তু রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্বস্তি মিলছে না হামলার ক্ষত নিয়ে প্রাণে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর মনে। তাদের একটাই দাবি- মৃত্যুর আগে যেনো বিচার দেখে যেতে পারি। 

সেদিন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা একজন মাহমুদা আক্তার। ভয়াল একুশে আগস্ট রমনার সেই সমাবেশে সামনের সারিতেই ছিলেন তিনি। মৃত ভেবে লাশের গাড়িতে ওঠানো হয় তাকে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছেন। নাগরিক বার্তার সঙ্গে একান্ত আলাপকালে জানালেন সেই দিনের হৃদয় আতকে ওঠা স্মৃতির কথা।

মাহমুদা বলেন, ওই দিন আমাদের একটি প্রতিবাদ সভা ছিলো। আমি সব সময় দলের মিটিংয়ে যেতাম। আর মিটিং যখনই হতো আমরা কর্মীরা সবাই মিলে এক সঙ্গে খেতাম। সেদিনও আমার সঙ্গে থাকা কয়েকজন নারী সহযোদ্ধা বললো আপা চলেন কিছু খেয়ে আসি। কিন্তু আমি যাইনি। মঞ্চের সামনে বসে নেত্রীর ভাষণ শুনছিলাম। ভাষণ শেষ করে যখন নেমে যাবেন ঠিক তখনই কোনো একটি পত্রিকার ক্যামেরা পার্সন এসে বললো আপা একটু দাঁড়ান, একটা ছবি তুলি। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই বিকট এক আওয়াজ কানে বাজলো। শব্দ আর ধোয়া, সঙ্গে মানুষের চিৎকার, শুরু হলো হুড়োহুড়ি-ছুটোছুটি। তখন আমরা কয়েকজন মাটিতে পড়ে যাই। যখন শব্দটা হলো তখন আর চোখ খুলতে পারছিলাম না। একটু পরপর আমি জ্ঞান হারাচ্ছিলাম। শুধু লাশ আর লাশ। এতো এতো লাশ আর রক্ত জীবনে কখনো দেখিনি।


পরে পুলিশ এসে আমাকে একটা গাড়িতে উঠালো। সেই গাড়িতে অনেকগুলো লাশ ছিলো। যখন গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো তখন হঠাৎ করে আমি নাকি নড়ে উঠেছি। এই কথা আমি পরে শুনি। আমার পরিচিত কয়েকজন ছিলো তারা আমাকে বাঁচাতে চিৎকার করে বলেছিলো আমাদের লাশ কোথায় নেন, আমাদের দিয়ে যান। কিন্তু এতো সব ঘটনা আমি চোখ দিয়ে দেখতে না পারলেও আমার কানে শব্দ শুনতে পাচ্ছি। পরে আমি একটু নড়েচড়ে উঠেছি। তারপরে আমি ঝাপসা দেখছিলাম।

মাহমুদ বলেন, এই অবস্থার মধ্যেও আমি মনে মনে বলছিলাম- আল্লাহ আমার জীবন যায় যাক। কিন্তু আমার সঙ্গে আসা মহিলাদের যেনো কিছু না হয়। কারণ আমিতো বাসা থেকে তাদের নিয়ে এসেছি। তাদের যদি কিছু হয় তাহলে কৈফিয়ত তো আমাদের দিতে হয়। আমার নেত্রীর যেনো কিছু না হয়। এভাবেই আমি অনেকবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি। পরে আমাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আমাদের ফ্লোরে ফেলে রাখা হয়। প্রথম দিকে আমরা ভালো চিকিৎসা পাইনি। পরে নেত্রীর তৎপরতায় মোটামুটি চিকিৎসা পেয়েছি। আমি এমনভাবে আহত হয়েছি, আমার তো বাঁচার ই কথা ছিলো না। কিভাবে বেঁচে আছি আল্লাহই ভালো জানেন। 

অনেক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছি। কিন্তু এখনো রাতে ঘুমাতে পারি না। আমার শরীরে এখনো ৪শ' স্প্রিন্টার আছে। আমি বাম হাত দিয়ে কাজ করতে পারি না। স্বামী হারিয়েছি ২৮ বছর আগে। স্বামী হারিয়ে আমি চাকরি করার পাশাপাশি রাজনীতি চালিয়ে গেছি। তিনটা ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমার সংসার। আমি অনেক বাধা পেয়েছি। কিন্তু কোনো বাধাই আমাকে আটকে রাখতে পারেনি। দলের প্রতিটি কর্মসূচীতে আমি উপস্থিত থাকতে ছুটে যেতাম। অনেক সময় অফিস আমাকে ছুটি দিতো না। কিন্তু আমি ছুটে যেতাম। পার্টি ডাকলে আমাকে কখনোই আটকে রাখা যেতো না। এ জন্য আমি আমার অফিস থেকে অনেক শাস্তি পেয়েছি। কিন্তু আমি যাওয়া বন্ধ করিনি।

তিনি বলেন, ওই দিন হামলাকারীদের উদ্দেশ্যই ছিলো তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ আওয়ামী লীগের নেতাদের হত্যা করে আওয়ামী লীগকে একদম শেষ করে দেওয়া। কিন্তু কেউ চাইলে কি আর মেরে ফেলতে পারে। ভাগ্য কতো ভালো। সব নেতাকর্মীরা জীবন দিয়ে নেত্রীর জীবন রক্ষা করেছে। আইভি আপা আমার সামনেই ছিলো। এই ঘটনা ঘটার একটু আগে আইভি আপা আমাদের সামনে দিয়ে গেলো।


মাহমুদা আরো বলেন, ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তাররাই আমাকে বলেছিলো আমার ডান পা কেটে ফেলতে হবে। এমনকি তিন বার আমাকে অপরেশন করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। কিন্তু আমি পা কাটতে রাজি ছিলাম না। আমার এই পা থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত রক্ত ঝরে। স্প্রিন্টারের আঘাতে আমার এই পা ঝাজরা হয়ে গিয়েছিলো। আমার হাত, পা, বুক, এমনকি আমার মাথার চামরার মধ্যেও ইস্প্রিন্টার রয়ে গেছে। এক কথায় আমার পুরো শরীরটা জুড়ে এখনো স্প্রিন্টার। আমার আশা ছিলো নিশ্চই কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়াবে। পরে আমার এলাকার সংসদ সদস্য বাড্ডা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে এসে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। আমাকে অনেকবার ভারত নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলো সবাই। কিন্তু আমি যেতে রাজি হইনি। আমি বলেছি- আমি দেশে চিকিৎসা করাবো। কারণ আমার ছোট ছোট ৩টা ছেলে-মেয়ে। আমি ওদের ছেড়ে গেলে ওদের কি হবে। আল্লাহর রহমতে আমার কোথাও যেতে হয়নি। অর্থোপেডিক্সের ডা. রুহুল হক স্যার এসে এসে আমাকে চিকিৎসা করতেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড. রোকেয়া আপা আমাকে অনেক সহায়তা করেছে। প্রায় ৫ মাস চিকিৎসা নিতে হয়েছে। কিন্তু এখনো আমাকে প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, আমি কতোটা নিবেদিত আওয়ামী লীগ কর্মী ছিলাম সেই চিহ্ন আমার শরীরে যেমন আছে, তেমনি আমার বাসার দরজা-জানালায়ও রয়েছে। কারণ ২০০১ সালের নির্বাচনের সময়ে বিএনপি-জামায়াতের পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়েছিলাম। প্রাণে বাঁচলেও আমার দরজাগুলোতে তাকালে দেখবেন চাইনিজ কুড়ালের কোপের আঘাত এখনো রয়েছে। আমি স্কুল জীবনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু করি। আমার মা-বাবা সবাই আওয়ামী লীগের। আমার রক্তে আওয়ামী লীগ। আজও দল করছি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মতো নিবেদিত কর্মীরা আজ অবহেলিত। আমরা যারা জীবন বাজি রেখে রাজপথে রাজনীতি করেছি তাদের এখন মূ্ল্যায়ন করা হয় না। আওয়ামী লীগে এখন হাইব্রিড আর নব্য আওয়ামী লীগের ভিড়ে আমরা মূল্যহীন।

আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, স্কুল জীবন থেকে রাজনীতি করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে আমাদের জন্য হতাশা বেড়েছে। আমাদের নেত্রী বারবার বলেছে, আপনারা তালিকা দেন কারা হাইব্রিড তাদের বিষয়ে তথ্য দেন। কিন্তু নব্য আওয়ামী লীগের ভিড়ে এখন কি অবস্থা হয়েছে তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। ২১ আগস্টের ঘটনার পরে আমাদের আর আগের অবস্থা নাই। এখন কোথাও যেতে পারি না। এখন এমন অবস্থা হয়েছে না পারি গরম সহ্য করতে, না পারি ঠান্ডা সহ্য করতে। আগের মতো বাহিরে যেতে পারি না। রাতে ঘুমাতে পারি না। অসহ্য যন্ত্রনায় ঘুমাতে পারি না। আগে ভারত না গেলেও এখন মনে হচ্ছে ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারলে মনে হয় কিছুটা সুস্থ হতে পারতাম। আমি আরও কিছু দিন বেঁচে থাকতে চাই। আমি আমার ছেলে-মেয়েদের জন্য আর বিচার দেখার আশায় বেঁচে থাকতে চাই।

২১ শে আগস্ট হামলা মামলার রায়ে অনেকের শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের বিচার বাস্তবায়নের পাশাপাশি সেই সময়ে ঘটনার নেপথ্যে থাকা অনেকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদেরকেও বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হোক। মৃত্যুর আগে অন্তত বিচারটা দেখতে চাই। আর তাদের বিচার দেখে যেনো বিশ্ব বুঝতে পারে যে কারো ক্ষতি করলে তাদেরও ক্ষতি হতে পারে। আমাদের সঙ্গে যা করলো এর পিছনে তো তৎকালীন সরকারের হাত রয়েছে। সরকারের সহযোগীতা ছাড়া তো এটা করা সম্ভব না। তাই কোনোভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এর দায় এড়াতে পারে না। এর বিচার বাস্তবায়নের জন্য আমার নেত্রী চেষ্টা করছে। কিন্তু সে একা আর কতোটা করবে। কিন্তু আমরা চাই তাদের বিচার হোক।

তবে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় যতটা না কষ্ট পেয়েছি, তার চেয়ে এখন দলের নেতাদের আচরণে বেশি কষ্ট পাচ্ছি। এখন মন্ত্রীদের আশেপাশে এমন কিছু লোকদের দেখা যায় যারা নব্য আওয়ামী লীগ। কিন্তু তাদের চৌদ্দপুরুষ সব বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এরাই দলের সুনাম নষ্ট করছে। এদের জন্যই নিবেদিত কর্মীরা অবহেলিত হচ্ছে। অনেকে আবার টাকার জোরে নেতাদের পাশে থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। তাই নেতাদের উচিত এদিকে একটু নজর দেওয়া। কারা দলের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করছে।


নাবা/ডেস্ক/তারেক

রিলেটেড নিউজঃ