ক্রীড়ানুরাগী বঙ্গবন্ধু

  • প্রকাশিতঃ 2019-07-31 19:48:36
ক্রীড়ানুরাগী বঙ্গবন্ধু

খেলার প্রতি বঙ্গবন্ধুর অনুরাগ নিয়ে কিছু বলার অপেক্ষা রাখেনা। তিনি নিজেই খেলোয়ার ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ক্রিড়াপ্রেম আর দেশপ্রেম যেন এক ও অভিন্ন। তাইতো তিনি দেশ স্বাধীনের পর কাবাডি কে জাতীয় খেলা ঘোষনা করেছিলেন। আমাদের গ্রামের এই খেলা কে আন্তজার্তিক অঙ্গনে পরিচিত করেছিলেন।

আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, ‘খেলাধুলার দিকে আমার খুব ঝোঁক ছিল’। ‘ফুটবল, ভলিবল ও হকি নিলেও ফুটবল ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। প্রায় সময় তিনি দল নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ফুটবল খেলতে যেতেন। যদিও হার্টের অসুখ ছিল বলে শেখ মুজিবকে তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান বেশি খেলতে দিতেন না। আবার অনেক সময় তিনি নিজেই আদরের খোকার সাথে মাঠে খেলতে নামতেন।

বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। স্থানীয় অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারির দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। শেখ মুজিব তখন মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন। মাঝে মাঝে অফিসার্স ক্লাব ও মিশন স্কুল দলের মধ্যে খেলা হত। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আব্বার টিম ও আমার টিমে যখন খেলা হত তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করত।’ ‘১৯৪০ সালে আব্বার টিমকে আমার স্কুল টিম প্রায় সকল খেলায় পরাজিত করল।’

‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘‘আব্বা যখন খেলতেন তখন দাদাও মাঝে মাঝে খেলা দেখতে যেতেন। দাদা আমাদের কাছে গল্প করতেন যে, ‘তোমার আব্বা এত রোগা ছিলেন যে, বল জোরে লাথি মেরে মাঠে গড়িয়ে পড়তো। আব্বা যদি ধারে কাছে থাকতেন তবে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করতেন। আমরা তখন সত্যিই খুব মজা পেতাম।’

কেবল স্কুল টিমে নয়, ফুটবলের প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনগুলোতেও শেখ মুজিব অংশ নিতেন। তিনি মহকুমা দলে খেলেছেন। খেলেছেন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লীগেও। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত নিয়মিত খেলেছেন ঢাকার মাঠে। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে ৯ বা ১০ নাম্বার জার্সি পরতেন। খেলতেন স্টাইকার পজিশনে। পালন করেছেন অধিনায়কের দায়িত্ব। তাঁর নেতৃত্বে বগুড়ার টুর্নামেন্টে ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ৫-০ গোলে বিজয়ী হয়। যার মধ্যে শেখ মুজিব দিয়েছিলেন ২টি গোল। খ্যাতনামা ফুটবলার গজনবী বঙ্গবন্ধুর খেলা সরাসরি দেখেছেন। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘রাজনীতিতে ব্যস্ততার কারণে বঙ্গবন্ধু বেশি দিন খেলতে পারেননি। যদি খেলতেন তিনি চল্লিশ দশকে এশিয়ার অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হতে পারতেন।’ দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু খেলার মানকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে মনযোগী হন। ক্রীড়াবিদদের সাথে তাঁর আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। বাংলাদেশ ফুটবল দল দেশের বাইরে খেলতে গেলে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে যেতেন খেলোয়াড়রা। ফুটবলার শেখ আশরাফ জানিয়েছেন, ‘‘উনার সঙ্গে দেখা করতে গেলেই উনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আমাদের বলতেন, ‘ভাল করে খেলবি, স্বাধীন দেশের মান-সম্মান যেন থাকে। আমি কিন্তু খেলাধুলার সব খবর রাখছি।’’ মুখে কেবল বলতেন না, তিনি সত্যি সত্যিই খেলাধুলার খবর রাখতেন নিয়মিত। দেশের মাটিতে খেলা হলে তিনি নিজে মাঠে গিয়ে উপস্থিত হতেন। খেলায়াড়দের উজ্জীবিত-উৎসাহিত করতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ফুটবল ম্যাচ হয় ১৯৭২ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারী। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় স্বাধীনতাকামী ফটুবলার নিয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে এদিন একটি প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করা হয়। খেলায় মুজিবনগর একাদশ ও প্রেসিডেন্ট একাদশ অংশ নেয়। ম্যাচটি স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকে সরাসরি তৎকালিন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপভোগ করেন। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে কলকাতার মোহনবাগান দল এবং ১৯৭৩ সালে রাশিয়ার মিন্সক ডায়নামো ক্লাব ঢাকা খেলতে এলেও খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

ছাত্রজীবনে ভালো খেলায়াড়দের এনে বঙ্গবন্ধু স্কুলে ভর্তি করাতেন। তাদের বেতন ফ্রি করে দেয়ার ব্যবস্থা করতেন। খেলা দেখে বুঝতে পারতেন ঐ খেলোয়াড় ভালো করবে কি না। ১৯৫৫ সালে মঠবাড়িয়ায় ক্লাস সেভেনের ছাত্র জাকারিয়া পিন্টুর খেলা দেখা মুগ্ধ হয়েছিলেন শেখ মুজিব। খেলা শেষে তিনি জাকারিয়া পিন্টুর প্রশংসা করেন। তাঁর বাবা ক্যাপ্টেন নাজিমউদ্দিনকে ডেকে বললেন, ছেলেকে ফুটবল খেলতে যেন আরও উৎসাহিত করে। জাকারিয়া পিন্টু পরবর্তীতে জাতীয় ফুটবল টিমে খেলেছেন। ১৯৭৩ সালে জাতীয় ফুটবল টিম বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে গণভবনে যায়। বঙ্গবন্ধু জাকারিয়া পিন্টুকে দেখে বলেন, ‘তোকে বলেছিলাম না তুই বড় ফুটবলার হবি।’

ক্রীড়া অনুরাগী ছিলেন বিধায় বঙ্গবন্ধু নিজে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকি করতেন। ফুটবলের উন্নতিকল্পে তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ফুটবলই নয়, দেশের অন্য সকল খেলার প্রতি তিনি সচেতন ছিলেন। ’৭২ সালে তাঁর উদ্যোগে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড গঠিত হয়। এটির বর্তমান রূপ ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড’। একই বছর বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার বর্তমান নাম ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ’। ১৯৭৪ সালে তিনি ‘বাংলাদেশ স্পোটর্স কাউন্সিল অ্যাক্ট’ পাস করেন। ১৯৭৫ সনের ৬ আগস্ট ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন করেন। উদ্দেশ্য ক্রীড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার ক্ষেত্রে যারা বিশেষ অবদান রেখেছেন বা রাখছেন তাদের এবং তাদের পরিবারের কল্যাণ। ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নির্মমভাবে নিহত হলে এ প্রস্তাব আলোর মুখ দেখতে পারেনি। ২০১১ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন, ২০১১’ পাস করেন। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেরিতে হলেও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালকে বলা হয় বাংলাদেশের আধুনিক ফুটবলের পথিকৃৎ। ক্রীড়াক্ষেত্রে তিনি অনেক অবদান রেখেছেন। তিনি আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৩ সালে আবাহনীর জন্য বিদেশি কোচ এনে বাংলাদেশের ফুটবলকে করে তোলেন আরো সম্ভাবনাময়। তাঁর ক্রীড়া কর্মকান্ডের প্রধান উৎসাহদাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সবসময় তিনি শেখ কামাল ও শেখ জামালকে ক্রীড়াঙ্গনে ভূমিকা রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন।

দৈনিক জনকণ্ঠে জাহিদ রহমানের একটি লেখা পড়েছিলাম। তিনি সেখানে ফুটবলার শেখ আশরাফ আলীর একটি স্মৃতিকথা তুলে ধরেছেন, ‘‘...’৭৩ সালে প্রথম যেদিন আমরা কুয়ালালামপুর স্টেডিয়ামে খেলতে নামি সেদিন স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আর শেখ মুজিব বলে চিৎকার করছে। সে ছিল এক অপূর্ব দৃশ্য। সদ্য স্বাধীন দেশ আর সেই দেশের নেতাকে সেদিন স্টেডিয়ামে আসা সাধারণ দর্শকরা যেভাবে অভিনন্দিত করেছিল তা ভোলার নয়। আসলে বঙ্গবন্ধু নামটি এমনই, যার অস্তিত্ব শুধু রাজনৈতিক ময়দান নয়, দেশের বাইরের ফুটবল ময়দানেও স্বচক্ষে দেখেছি। মানুষটি অসম্ভব রকম অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল।’’

বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাও ক্রীড়ামোদী রাষ্ট্রনায়ক। পিতার মতই খেলাধুলার প্রতি তাঁর আগ্রহ, আন্তরিকতা আমাদের মুগ্ধ করে। তিনি ফুটবল, ক্রিকেটসহ সব খেলা ও খেলোয়াড়দের জন্যে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি খেলোয়াড়দের খোঁজখবর নেন। সুযোগ পেলে বঙ্গবন্ধুর মত নিজে স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখেন। তাঁর সামগ্রিক প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা বর্তমান বিশ্বে সুনাম অর্জন করছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ক্রীড়া চর্চা বৃদ্ধি করতে শেখ হাসিনা বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা জাতীয় গোল্ডকাপ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় গোল্ডকাপ’-এর আয়োজন করছেন। আমরা বিশ্বাস করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রীড়া ক্ষেত্রে আরো এগিয়ে যাবে, ক্রিকেটে একদিন বিশ্বকাপও আনতে পারে। আর বাংলাদেশ সার্বিকভাবে এগিয়ে গেলেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

ড. মোহাম্মদ হাসান খানসদস্য,
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।


    মতামত দিন