বঙ্গবন্ধুর মনের মণিকোঠায়

  • প্রকাশিতঃ 2019-07-13 21:52:30
বঙ্গবন্ধুর মনের মণিকোঠায়

আজ আর বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন নিয়ে কিছু লিখব না। অথবা কারাবন্দী বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও কিছু লিখব না। আজ অন্যরকম এক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু লিখতে চাই।

ঘটনাকাল ১৯৬৯-এর জুন মাস। ফরিদপুর শহরের অম্বিকা ময়দানে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের জনসভায় বক্তব্য দিয়ে ফিরছিলেন। ফেরার পথে জনৈক জেলারের বাসার সামনে দায়িত্বরত এক পুলিশকে দেখে তিনি জিপ থামালেন। তারপর বঙ্গবন্ধু ঐ পুলিশ সদস্যকে উচ্চস্বরে ‘আলমগীর’ বলে কাছে ডাকলেন। তার খোঁজখবর নিলেন। এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন অর্থনীতিবিদ মোঃ আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব। তিনি ভেবেছিলেন, পুলিশ সদস্য আলমগীর হয়তো বঙ্গবন্ধুর কোনো আত্মীয় হবেন। কিন্তু পরদিন আলমগীর জানালো, বঙ্গবন্ধু তার আত্মীয় নয়। তিনি ১৫ বছর আগে ডিউটি করতেন সেন্ট্রাল জেলে। তখন বঙ্গবন্ধু ওই জেলে ছিলেন। ঐ সময় তাঁর সাথে দুই তিনবার দেখা হয়েছিল। অর্থাৎ তিনবার দেখা হওয়া সাধারণ এক পুলিশ সদস্যের নাম ও চেহারা বঙ্গবন্ধু ১৫ বছর পরেও মনে রেখেছিলেন। এমনি স্মৃতিশক্তি বঙ্গবন্ধুর!

১৯৬৫ সালের আর এক ঘটনা। ছাত্রনেতা আবু আহমেদ কুমিল্লার গুণবতী হাইস্কুলের ছাত্র। নির্বাচনী প্রচার করতে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কুমিল্লার গুণবতী স্টেশনে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শোনার জন্য শত শত লোক উপস্থিত হন। স্টেশনে ট্রেন থামলে আবু আহমেদ বিশেষভাবে সাধারণ মানুষের মনের আকুতির কথা বঙ্গবন্ধুর কাছে তুলে ধরেন। তার কথা শুনে বঙ্গবন্ধু সেদিন জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। যাওয়ার সময় আবু আহমেদকে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ঢাকা আসিস্ এবং দেখা করিস।’ এর ৯ বছর পর আবু আহমেদ ১৯৭৪ সালে পেশাগত সমস্যার কারণে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। বঙ্গবন্ধু তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এই ৯ বছরে বঙ্গবন্ধুর সাথে তার দেখা বা কথা হয়নি। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা হওয়ার পর আবু আহমদ কিছু বলার আগেই বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কি মিঃ গুণবতী, কি চাস?’ এ থেকে বুঝা যায়, ১৯৬৫ সালে স্টেশনে মাত্র একদিনের দেখায় গুণবতী হাইস্কুলের আবু আহমেদকে ১৯৭৪ সালেও চিনতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

সাংবাদিক সৈয়দ বদরুল আহসান বঙ্গবন্ধুর ৯৭তম জন্মবার্ষিকীর একক বক্তৃতা একটি ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘একটা যুবক আসল, তার একটা চাকরি দরকার। আমরা সবাই বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছি। বঙ্গবন্ধু বললেন, তোর বাড়ি কোথায়? ও খুলনার একটা এলাকার নাম বলল। তখন তার বাবার নাম জিজ্ঞেস করলেন এবং বললেন, ‘তোর মায়ের নাম এটা? তোর মা কি আগের মতো এখনো পিঠা তৈরি করে?’ এটা শুনে ওই ছেলে আবেদন-আর্জি করবে কি, সে কেঁদে ফেলেছে। একটা বড় মাপের মানুষ, একটা ছেলেকে এই প্রশ্ন করছেন !’’ বঙ্গবন্ধু মনে রেখেছিলেন গ্রামের এক মায়ের পিঠা বানানোর কথা।

১৯৪৬ সালে ভারতের সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তীর সাথে বঙ্গবন্ধুর পরিচয় ছিল। ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকায় এসেছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে। নিখিল চক্রবর্তী ভেবেছেন এত বছর পর বঙ্গবন্ধু চিনবেন না তাঁকে। ‘‘বঙ্গভবনের দরবার হলে একবারে পেছনের সারিতে তিনি (নিখিল চক্রবর্তী) বসলেন। তার মনে একটি কথা আমার এই পুরনো বন্ধু আমাকে চিনবে না, চিনবার কারণও নেই। বঙ্গবন্ধু দরবার হলে প্রবেশ করলেন চারদিকে তাকালেন। একসময় তার দৃষ্টি সেই ভারতীয় সাংবাদিকের দিকে নিক্ষেপ করলেন। ‘তুই নিখিল না?’ নিখিল চক্রবর্তী অভিভূত। এত বছর পর আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন? তার প্রশ্ন বঙ্গবন্ধুর কাছে। ‘আপনি কি? তুই গেল কোথায়?’ বঙ্গবন্ধুর উত্তর। বঙ্গবন্ধু নিখিল চক্রবর্তীকে জড়িয়ে ধরলেন। এই ছিলেন ব্যক্তি মুজিব। কোনো অহঙ্কার নেই মানুষের থেকে কোনো দূরত্ব নেই।’’ (সূত্র: সাংবাদিক সৈয়দ বদরুল আহসানের বক্তৃতা)।

ভোরের কাগজ পত্রিকায় একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল খালেকের একটি কলাম পড়েছিলাম। সেখানে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিশক্তির একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘‘জয়নাল আবেদীন নামক আওয়ামী লীগের একজন সাধারণ কর্মীর এক আত্মীয়কে (শ্যালক) অনেক দিন পর দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তুই জয়নালের শালা না ?’ মনোবিজ্ঞানের মতে মানুষকে আপন করে নেয়ার এক যাদুকরী ক্ষমতা হচ্ছে তার নাম মনে রাখা। যেসব কারণে একজন মানুষ হাজার হাজার মানুষের নাম মনে রাখতে পারে তা হচ্ছে প্রখর স্মৃতিশক্তি, মানুষের প্রতি আগ্রহ এবং অকৃত্রিম ভালোবাসা। কিন্তু পৃথিবীর খুব কম লোকেরই এই অসাধারণ গুণটি থাকে।’’

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সিকিউরিটি অফিসার ছিলেন আলী মেহদী খান। তার কাছে বঙ্গবন্ধুর স্মরণশক্তির গল্প শুনেছেন তাঁর ছেলে মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু। তিনি লিখেছেন, ‘একদিন গণভবনে নেতার সাথে দেখা করার জন্য একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক আসেন। তার পড়নে ছিল লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী। গেটে পাহারারত পুলিশ বৃদ্ধ ভদ্রলোককে কিছুতেই গণভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এমন সময় বঙ্গবন্ধুকে সাথে নিয়ে বাবা গণভবনের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছিলেন। বাবা তখন গাড়ির সামনের আসনে বসা। বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে গেটের একপাশে অসহায়ের মত দাঁড়ানো অবস্থায় দেখে বঙ্গবন্ধু গাড়ি থামাতে বললেন। পরে তিনি নিজে গাড়ি থেকে নেমে ভদ্রলোককে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং নিজের পাশে বসিয়ে গণভবনের ভেতরে নিয়ে আসেন। গণভবনে রুমের ভেতরে কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনার পর তারা দুজন একসাথে বাহিরে আসলে বঙ্গবন্ধু উপস্থিত সকলকে বললেন, আপনারা যারা এই ভদ্রলোককে গণভবনের ভেতরে ঢুকতে বাধা দিয়েছেন আপনারা তার অতীত সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আপনাদের জানার কথাও নয়। পাকিস্তানী পুলিশ যখন আমাকে গ্রেফতারের জন্য হন্য হয়ে সারাদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছিল তখন তিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে আমাকে তার বাসায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। আমি তার কাছে অনেক ঋণী। তার এই ভালবাসার কথা, তার এই উপকারের কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় যে ঐ ভদ্রলোক কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কাছে কিছু চাইতে আসেননি, এসেছেন নেতার সাথে একবার দেখা করার জন্য। এই হলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু।’

১৯৫৫ সাল। ফুটবলার জাকারিয়া পিন্টু বরিশাল মঠবাড়িয়া স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়েন । রাজনৈতিক কাজে শেখ মুজিবুর রহমান একবার বরিশালের মঠবাড়িয়াতে যান। ফুটবল খেলা পিন্টুর দারুণ নেশা। ওই সময় শেখ মুজিবুর রহমানের সৌজন্যে মঠবাড়িয়া হাইস্কুলের সঙ্গে স্থানীয় অফিসার্স ক্লাবের মধ্যে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। জাকারিয়া পিন্টু জানান তিনি স্কুলের পক্ষে অংশ নিয়ে দু-দুটি গোল করে অফিসার্স ক্লাবের পরাজয় ত্বরান্বিত করেন। খেলা শেষে বঙ্গবন্ধু তাঁকে কাছে ডেকে খেলার প্রশংসা করে মাথায় হাত বুলাতে থাকেন এবং তাঁর বাবা ক্যাপ্টেন নাজিমউদ্দিনকে ডেকে বলেন, ছেলেকে যেন সে ফুটবল খেলতে আরও উৎসাহিত করে। জাকারিয়া পিন্টু স্মৃতিচারণে বলেছেন, ’৭৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল দেশের বাইরে প্রথম মালয়েশিয়াতে অনুষ্ঠিত মারদেকা কাপ ফুটবলে অংশ নেয়ার প্রাক্কালে পুরো ফুটবল দল গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান। এ সময় এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। জাকারিয়া পিন্টু বঙ্গবন্ধুকে দেখে সালাম দিতেই বঙ্গবন্ধু চিনতে পারেন এবং বলেন, ‘তোকে বলেছিলাম না তুই বড় ফুটবলার হবি’। এই হলেন আমাদের বঙ্গবন্ধু। যাঁকে একবার দেখেছেন তাকে মনে রেখেছেন আজীবন।’

উপরের সবগুলো ঘটনাই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিশক্তির, এক অসাধারণ স্মরণশক্তি ছিল তাঁর। আর ছিল মানুষকে ভালবাসার অসাধারণ ক্ষমতা। হাজার হাজার নেতা কর্মী, সাধারণ মানুষের নাম ও চেহারা মনে রাখতেন তিনি। বিশতিরিশ বছর পর দেখলেও চিনতে পারতেন মানুষদের। আর পারবেন নাই বা কেন? তিনি যে বঙ্গবন্ধু। যার কাছে এদেশের মানুষই ছিল একমাত্র পরিবার। মানুষ কে ভালবাসার এমন ক্ষমতা বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কার আছে? আর কে পারেন বটবৃক্ষের মত সাধারণ মানুষকে জড়িয়ে ধরতে। আর তাই তো তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি। আমাদের একটিই দেশ, একটি পতাকা একজন জাতির পিতা। এই মানুষটি আমাদের এক মাত্র আইডেন্টিটি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও বাংলাদেশের মানুষই তাঁর পরিবার। মানুষের জন্য কাঁদতে পারেন, মাথায় স্নেহ স্পর্শ করতে পারেন। মানুষের খুব কাছে যেতে পারেন। যাকে দেখলেই মনে হয় আমাদের একজন হাসু বুবু আছেন। আমাদের কোনো ভয় নাই। আমাদের সকল ভাবনা তিনি একাই বহন করবেন। এক বহ্নিশীখা। সকল অপশক্তি, পেশীশক্তি যার কাছে মাথা নত করে। আজীবন তাঁর মঙ্গলময় স্পর্শ আমাদের উপর থাকুক এই প্রার্থনা।জয়তু হাসু বুবু। জয়বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক : ড. মোহাম্মদ হাসান খান;
সদস্য,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা শাখা।

    মতামত দিন