৭ মার্চ : বাঙ্গালির মুক্তির সনদ

‘‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’’ এটি একটি কবিতা, একটি ভাষণ, একটি মাইলস্টোন। একটি জাতির রক্তগাথা সংগ্রামের ইতিহাস, সমস্ত জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন।

এক কালজয়ী সময়ের কথা বলছি। কিংবদন্তীর কথা বলছি। ৭ মার্চ ১৯৭১। রেসকোর্স ময়দানে অপেক্ষা করছে দশ লক্ষ বাঙ্গালি। তিনি এসে শোনাবেন মহাকাব্যতুল্য অমর ভাষণ। এটি একটি সাধারণ দিন নয়। এদিন জাতির পিতা বিশে^র সামনে আমাদের নাগরিকত্ব উপহার দিয়েছেন। দিয়েছেন পরিচয়। আজ আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। তাই পিতা, আজকের দিনের প্রকৃত নায়ক তোমাকে জানাই সহশ্র সালাম। আর যারা এ দেশের নাগরিক বলে নিজেদের পরিচয় দেয়, সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে অথচ আজকের দিনের প্রকৃত নায়ককে অস্বীকার করে, ইতিহাস বিকৃত করে তাদের ঘৃণা ভরে প্রত্যাখান করছি। ৭ মার্চের ভাষণ শুনে জাতি মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। নয়মাসের যুদ্ধ শেষে ত্রিশ লক্ষ শহিদ আর দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছিলাম আমাদের বহুল কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।

৭ মার্চের ভাষণ একদিনে তৈরি হয়নি। বাঙ্গালি জাতির শোষিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত হওয়ার যে ইতিহাস, সে বঞ্চনার ইতিহাস থেকে মুক্তির আলো নিয়ে এসেছিলেন আামাদের পিতা। আমাদের অধিকার আদায়ে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনি ছিলেন একজন গণতন্ত্রকামী, ধর্মনিরপেক্ষ, এবং সমাজতন্ত্রী নেতা। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা দেয়া হল না। শুরু হল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রহসন। অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন তিনি। বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে জনতা।
প্রতিবাদে ২ মার্চ ঢাকায় হরতাল ডাকা হয়। হরতাল পালনকালে পাকিস্তানি সৈন্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এদিন প্রায় ৫০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে হতাহত হন। ৩ মার্চ নিহতদের স্মরণে সারাদেশে শোক এবং হরতাল পালন করা হয়। ৪ মার্চ পাকিস্তান সরকারের আরোপিত সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে সাধারণ মানুষ। হাজার হাজার মানুষের আন্দোলনে সারাদেশ উত্তাল হয়ে উঠে। ফলে অচল হয়ে পড়ে সবকিছু। জাতি একটি দিকনির্দেশনা চাচ্ছিল। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যেখান থেকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেন। পাকিস্তানী শোষকরাও আশঙ্কা করেছিল যে, ৭ মার্চ রেসকোর্স থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা আসতে পারে। পৃথিবীর বিখ্যাত পত্রিকা দি ডেইলি টেলিগ্রাফে ৬ মার্চে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয় : ‘‘শেখ মুজিব একতরফা ভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা করতে পারেন।’’

৭ মার্চ প্রকাশিত পত্র-পত্রিকায়ও স্বাধীনতা ঘোষণার কথা উল্লেখ করা হয়। এ কারণে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ৭ মার্চের দিন ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়। মেজর সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, ‘‘পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ৭ মার্চের জনসভার প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ নেতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হলে তা শক্তভাবে মোকাবেলা করা হবে। বিশ্বাসঘাতকদের (বাঙালি) হত্যার জন্য ট্যাংক, কামান, মেশিনগান সবই প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজন হলে ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে। শাসন করার জন্য কেউ থাকবে না কিংবা শাসিত হওয়ার জন্যও কিছু থাকবে না।”

জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও রেসকোর্সে সেদিন জনতার ঢল নামে। রেসকোর্সে ৭ মার্চ ১০ লক্ষ লোক সমাগত হয়েছিলো। পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুও উপস্থিত হন জনতার মঞ্চে। তিনি যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন জনসভার উপর দুটি হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে প্রায় ১৯ মিনিটের মহাকাব্যিক ভাষণ প্রদান করেন। এ ভাষণকেই আমরা ৭ মার্চের ভাষণ বলি। অলিখিত মন্ত্রমুগ্ধকর এ ভাষনে তিনি শোনালেন বাঙালির মুক্তির সনদ। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ ‘‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’’ বাংলার সাধারণ মানুষ বঙ্গবন্ধুর আহ্বান অক্ষরে অক্ষরে বুঝেছিলো। তাঁর নির্দেশে ৭ মার্চ রেসকোর্স থেকে ফিরে গিয়েই জনগন স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্ততি নেয়া শুরু করে। প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ওই ভাষণ দিয়েছিলেন। একদিকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, অন্যদিকে তাকে যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিহিত করা না হয়, সেদিকেও তাঁর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। তাঁর এই সতর্ক কৌশলের কারণেই ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই জনসভার ওপর হামলা করার প্রস্তুতি নিলেও তা করতে পারেনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ‘চতুর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘‘শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলো, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’’

ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা যুদ্ধের রূপরেখা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, মানুষের অধিকার চাই। প্রধানমন্ত্রীত্বের লোভ দেখিয়ে আমাকে নিতে পারেনি, ফাঁসীর কাষ্ঠে ঝুলিয়ে নিতে পারেনি। আপনারা রক্ত দিয়ে আমাকে ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন। সেদিন এই রেসকোর্সে আমি বলেছিলাম, রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়ে শোধ করবো; মনে আছে ? আজো আমি রক্ত দিয়েই রক্তের ঋণ শোধ করতে প্রস্তুত।’ প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন তিনি যে কোনো মুহূর্তে গ্রেফতার হতে পারেন। সেজন্য জনতার উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আামি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।’’ সেটাই হয়েছিল ২৫ মার্চ কাল রাতে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী হানাদারদের হাতে বন্দী হওয়ার আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পুরো যুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকলেও বঙ্গবন্ধু পূর্ব নির্দেশ মোতাবেক মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বন্দী ছিলেন সত্য, কিন্তু তাঁর প্রতিটি নির্দেশ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। এই কারণেই মাত্র নয়মাসে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা ভূখন্ড পেলাম, মানচিত্র ও পতাকা পেলাম। এত অল্পসময়ে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস আর কোনো জাতির নেই।

ঐতিহাসিক সাত মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের মানুষের গর্ব তো বটেই, এ ভাষণ এখন পৃথিবীবাসীর গর্ব। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ^ ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটি অনেক গৌরবের। ১২টি ভাষায় এ ভাষণ অনূদিত হয়েছে। অথচ বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী এ ভাষণটি পঁচাত্তরের পরে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বর্তমান প্রজন্ম যদি স্বল্পতম সময়ে বাঙ্গালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাস জানতে চায়, তাহলে অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ শুনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জেনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ৭ মার্চের ভাষণ হোক আমাদের জাতীয় জীবনে সুদৃঢ়ভাবে পথচলার অনুপ্রেরণা এবং অগ্রগতির হাতিয়ার। আজ পুরো পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য একটি ভাষণ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। সুপ্রিয় পাঠক সব শেষে বলতে চাই আমাদের একটি পতাকা, একটি দেশ,একজনই জাতির পিতা। আসুন ইতিহাস বিকৃতকারীদের ঘৃনভরে প্রত্যাখান করি এই হোক ৭ই মার্চের অঙ্গীকার।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

ড. মোহাম্মাদ হাসান খান।

ড. মোহাম্মদ হাসান খান; সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।
প্রকাশিত গ্রন্থ : বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনা।

তা.আ/