হাইমচরের শিশু শিক্ষার্থী মারজানা হত্যাকারী আসামীরা একবছরেও আটক হয়নি

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট। নাগরিক বার্তা.কম
হাইমচর উপজেলার ৪নং নীল কমল ইউনিয়েনর প্রত্যন্ত ও দূর্গম চর এলাকা ইশানবালা বাজার। মেঘনার পশ্চিম পারের নদী বেষ্টিত এই গ্রামের খলিল মাতাব্বর কান্দির এক হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ে মারজানা আক্তার (৯)। ২০১৭ সনের ২২ ডিসেম্বর ধর্ষণ শেষে খুন হয় শিশু মারজানা। এই ঘটনার দীর্ঘ এক বছর পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত তিন পালাতক বখাটে যুবককে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে ১০ মাস পরে মামলার তদন্তভার হাইমচর থানা পুলিশের কাছ থেকে চাঁদপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শামীম হোসেন এই প্রতিবেদককে জানান, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। এ ছাড়া অভিযুক্ত আসামীদের আটক করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এদিকে মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে মারজানার পিতা মোকশেদ হাওলাদার এবং মা সেলিনা বেগম এখন অনেকটাই পাগল প্রায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় ৩২নং চর কোড়ালিয়া সপ্রাবি’র তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্রী মারজানা আক্তার সবেমাত্র ৯ বছরে পা রাখা শিশু মারজানার উপর দৃষ্টি পরে স্থানীয় কিছু বখাটে যুবকের। বিষয়টি অসহায় বাবা মা জানলেও সাহস করে প্রতিবাদ করেনি। ফলশ্রুতিতে ২০১৭ সনের ২২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ধর্ষণ শেষে হত্যার শিকার হয় মারজানা। স্থানীয় দুষ্ট মানুষের ভুল পরামর্শে মেয়েকে ভূতে মেরেছে বলে ময়না তদন্ত ছাড়াই লাশ দফনের অনুমতি চায় তার পরিবার। অক্ষরজ্ঞানহীন বাবা মায়ের কথায় প্রশাসনও লাশ ময়না তদন্ত ছাড়া দাফনের অনুমতি দেয়। ঘটনার এদকিন পরে লাশ গোসল দেয়া নারী মারজানার পিতাকে জানায়, লাশের গোপনাঅঙ্গসহ বিভিন্ন স্থানে তিনি আঘাতের চিহ্ন দেখেছিলেন। আর মারজানার মা সেলিনা বেগমও জানায়, মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে প্রতিবেশী এক যুবককে দৌড়ে পালাতে দেখেছেন তিনি। এভাবেই বেরিয়ে আসে একের পর এক নানান তথ্য। এমন কথাা প্রকাশ হতেই পুরো ঘটনা ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। মেয়ে হারানোর শোকে পাগল প্রায় পিতাও ছুটে যান বিলের পাশের সেই বাঁশ ঝাড়ের কাছে। যেখানে মারজানার লাশ পড়ে ছিলো। খোঁজ নিয়ে দেখেন ওই স্থানে পাশেই স্থানীয় সেলিম সর্দারের পরিত্যাক্ত একটি ঘরের মাটিতে রক্ত লেগে আছে। আর বাঁশঝাড়ে ঝুলে আছে বাবার কাছে যাওয়ার সময় মারজানার হাতে থাকা সেই বাজারের ব্যাগটি।

এরপর ২৯১৮ সনের ১৯ জানুয়ারী শিশু মারজানাকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়েছে এমন দাবিতে মো. মোকশেদ হাওলাদার বাদী হয়ে হাইমচর জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্টে মামলা দায়ের করেন। মামলায় সন্দেহভাজন স্থানীয় সেই তিন যুবককে আসামী করা হয়। যার মামলা নং জিআর ০৪/১৮। ধারা ৩০২/৩৭৬/২০১/৩৪ ও ১০৯। আসামীরা হলো, ওই গ্রামের সুরুজ কান্দী এলাকার দ্বিন ইসলামের ছেলে জালাল মিয়া (২০), কাদির বেপারীর ছেলে সিদ্দিক (২১) এবং মো. সফি উল্যাহর ছেলে সেলিম (২১)। এ বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে, ওই মামলার সূত্র ধরেই হত্যার রহস্য উৎঘাটনে ২৫ জানুয়ারী, আদালত কর্তৃক লাশ উত্তলন করে ময়না তদন্তের নির্দেশ দেয়।

পৌনে দুই মাস পর ১২ ফেব্রুয়ারী নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটে উম্মে হাবিবা মীরার ও হাইমচর থানার উপ-পরিদর্শক মো. মুকবুলসহ পুলিশ সদস্যরা উপস্থিতে কবর থেকে মারজানার লাল উত্তোলন করে ময়না তদন্ত করা হয়। লাশ চাঁদপুরে মর্গে এনে সেখানে সরকারি জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক দিয়ে ৩ সদস্য বিষিষ্ট মেডিকেল টিম গঠনের মাধ্যমে ময়নাতদন্ত করা হয়। এরপর ওই রাতে পূনরায় তাকে কবরে দাফন করা হয়।

মারজানার মা সেলিনা বেগম জানায়, ঘটনার দিন সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে সদাইয়ের জন্যে তিনি ব্যাগ হাতে মেয়েকে বাজারে বাবার দোকানে পাঠান। এরপর রাত ৮টার বাজলেও মেয়ে বাড়িতে ফেরেনি। এরইমধ্যে তার স্বামীও বাসায় চলে আসে। বিষয়টি জানার পরে বাবা-মা দুজনে মিলে মেয়েকে খুঁজতে বের হয়। প্রতিমধ্যে বাজার থেকে বাদীর বাড়ি রাস্তার মাঝখানে একটি বাঁশঝাড়ে বিলের পাড়ে মেয়ের লাশ দেখতে পান।

মারজানার পিতার মো. মোকশেদ জানায়, যখন মারজানার লাশ পাওয়া যায় তখন তার গায়ের কামিজটি উল্টানো ছিলো, এবং নাকে-মুখে এবং চোখে জখমের চিহ্ন ছিলো। খবর পেয় হাইমচর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। পুলিশ ওই স্থান থেকে কটি টর্চ লাইট উদ্ধার করে। স্থানীয় কয়েকজন বলেন, মারজানাকে ভূতে মেরেছে। বিষয়টি বুঝতে না পেরে পুলিশের অনুমতি নিয়ে আমরা লাশ ময়না তদন্ত না করে দাফন করেছিলাম। পরে লাশ গোসল করানো মহিলা যখন বললো মারজানার গোপনস্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিলো তারপরে আমরা নিশ্চিত হলাম আমার মেয়েকে খারাপ কাজ করে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, যাদের আসামী করা হয়েছে তারা প্রায় স্কুলে যাওয়ার সময় মারজানাসহ অন্যান্য স্কুল ছাত্রীদের প্রায় উত্তক্ত করতো। আদালতে মামলা করার পর থেকে আসামীদের পরিবারের পক্ষ থেকে নানানভাবে আমাকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং আপোশ করারও প্রস্তাব দিচ্ছে।

তিনি আরো জানান, এই ঘটনার কয়েক মাস পরে গত মে মাসে হাইমচর থানা পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহভাজন হিসেবে আওলাদ (২১) নামে একজনকে আটক করে। পরবর্তিতে আদালত তাকে তিন দিনের রিমান্ড দেয়। কিন্তু আইনের ফাঁক গলে ১৫ জুলাই আওলাদ জামিনে বেরিয়ে আসে। এ বিষয়ে আমি পুলিশ সুপার স্যারের সাথেও দেখা করেছি। আমাদের দেশ এতো উন্নত হয়েছে অথচ পুলিশ তিনজন আসামীকে ৭মাসেও অটক করতে পারেনি। আর কতদিন অপেক্ষা করলে আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচার পাবো।

এদিকে চলতি বছরের ১৮ জুলাই চাঁদপুরের সাবেক পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার পিপিএম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং মারজানার পরিবার ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বলেন। পুলিশ সুপার জানিয়েছিলেন অপরাধি যে হোক না কেনো দোষী প্রমানিত হলে তাদের শাস্তি পেতে হবেই।
এমএমএ/