সিগন্যালেই ইফতার…

দুপুরের উত্তপ্ত সূর্যের কাঠফাটা রোদ কিংবা অঝোর ঝড়-বৃষ্টির মাঝেও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় রাজপথের গতি সামলানোর দায়িত্বে। সকলের সহজ গন্তব্যের কাজ করা মানুষটি সারাদিন রোজা রেখেও ইফতারের সময় ফিরতে পারে না নিজ পরিবারের কাছে। বলছি রাজপথের অতন্ত্র প্রহরী ট্রাফিক পুলিশের কথা।

রাজধানীর প্রতিটি ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে দায়িত্ব পালন করছেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা সবার গন্তব্যের ফেরার তাড়া থাকলেও তাদের যেনো নেই কোনো তাড়া। কেবল রাস্তাই যেনো তাদের ঠিকানা। ব্যতিক্রম হয় না রমজানের ইফতারেও। নগরের প্রতিটি মানুষ দিন শেষে পরিবারের সকলের সঙ্গে ইফতারের জন্য ছুটলেও তাদের কাজ ছুটে চলা মানুষদের পথ নির্বিঘ্ন করা।

চলছে পবিত্র মাহে রমজান মাস। সামনেই ঈদ-উল-ফিতর। কর্মব্যস্ততা বেড়েছে ঢাকা মহানগরীর। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রাস্তার ট্রাফিক জ্যাম। সন্ধ্যা নামার আগেই ঘরমুখো মানুষের বাসায় ফেরার লড়াই শুরু হয়। রাস্তায় নামে মানুষের ঢল। ট্রাফিক জ্যাম সামলাতে হিমশিম খেতে হয় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের। এরপরও ঘরমুখো মানুষ যেন ইফতারের আগেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন এজন্য নীরবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা। সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয়জনদের সাথে ইফতার করতে পারলেও স্বজনদের সাথে ইফতার করা হয়না তাদের। ইফতারের সময়ও তাদের দায়িত্ব চালিয়ে যেতে হয়। আর দায়িত্বের ফাঁকে যেনোতেনোভাবে রাস্তায়ই সেরে নিতে হয় ইফতার। রাস্তায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ইফতারি করেন তারা, বসারও জায়গা থাকেনা অনেক সময়। কখনো কখনো বসার জায়গা থাকলেও সময় হয় না বসে ইফতার করার।

ইফতারির ফাঁকেই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে হয়ে তাদের। দেখা যায়, এক হাতে ইফতারির খাদ্য নিয়ে আরেক হাতে দেন ট্রাফিক সংকেত।

চলছে প্রচন্ড তাপদাহ। এই গরমে যেখানে ঘরেই থাকা দায়, সেখানে সারাদিন রোজা রেখে তাপদাহ মাথায় নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। যে কষ্টটা অনুমান করা সত্যিই কষ্টকর। রমজানে নগরীর প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে এমন চিত্রই দেখা যায়। রাজধানীর একটি ট্রাফিক পয়েন্টে দায়িত্বরত একজন পুলিশ সদস্য জানান- ইফতার দাঁড়াইয়া করবো না বইসা করবো তা নির্ভর করে গাড়ির চাপের উপর। তিনি বলেন, রাস্তায় করা হয় দায়সারা ইফতার। পরিবারের সবার সঙ্গে ইফতার করতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু আগে দায়িত্ব, পরে সবকিছু। দেশ সেবায় যেদিন চাকরিতে প্রবেশ করেছি, সেদিন থেকে ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতিকে কবর দিয়েছি। জাতীয় সকল উৎসবে সবাই যখন তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে আনন্দ করে আমরা তখন সবকিছু ভুলে সবার নিরাপত্তায় ব্যস্ত থাকি।

ট্রাফিক পুলিশ সদস্য আরো বলেন- আমাদের ইফতারিতে তেমন কোন বিশেষ খাবার থাকে না। খাবারের তালিকায় থাকে সামান্য ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি ও পানি।

এ নিয়ে কথা হয় একজন পথচারির সাথে। তিনি বলেন, সন্ধ্যা নামার আগেই রাস্তায় ঘরমুখো মানুষের ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়। রাস্তায় শুধু দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের। এটা সত্যিই কষ্টের জীবন। রোজা রেখে দায়িত্ব পালন করতে করতে অনেকে রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে যান। কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করছেন রাস্তায়ই। তেমনই একজন ট্রাফিক কনস্টেবল আজিজুল ইসলাম। রোজা রেখে গত সোমবার (২০ মে ) দুপুরের ডিউটিতে যান তিনি। প্রচন্ড রোদে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন।

শুধুই কি ইফতার? ঈদের জামাতেও নামাজ পড়তে পারেন না ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। কোন একটি ঈদ জামাতের পাশেই রাস্তার মোড়ে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। ইউনিফর্মের আড়ালে ট্রাফিক পুলিশও একজন মানুষ। অথচ সেই মানুষটির গায়ে ঈদের দিনেও থাকেনা নতুন কাপড়। গায়ে জড়ানো থাকে দায়িত্বরত ইউনিফর্ম। যারা দেশের সেবায় এমনইভাবে নিজেদেরকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন তাদের প্রতি কোন সমবেদনা নয়, মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সিক্ত করুক তাদের অন্তর।

নাবা/২৩মে/তারেক