সাম্প্রদায়িকতার কবলে বাংলা নববর্ষ

আজ পহেলা বৈশাখ । বাঙ্গালীর বর্ষবরন। যার সৃষ্টি হয়েছিলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের স্রোতধারায়।  আমাদের বাঙালি হয়ে ওঠার আকুতি , এক অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে জন্ম নেয় পহেলা বৈশাখ। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তার আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ্উল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সন নির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয় । তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে এটি পরিচিত হয়। ১৯১৭ সালে প্রথম আধুনিক নববর্ষ উদযাপন হয় ।  ১৯৬৭ সনে উৎসবটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। অর্থাৎ আকবরের সময় কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।
আজ সাম্প্রদায়িকতার কবলে আমাদের পহেলা বৈশাখ। যারা বাঙালিত্বে বিশ্বাস করে না, তারা নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকের মতো বলছে, এটা হিন্দুয়ানি সংষ্কৃতি। মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যে নানারকম মুখোশ থাকে এটাকে তারা ইসলামবিরোধী মনে করে।  নির্ভেযাল বর্ষবরনের আনন্দ , মঙ্গল শোভাযাত্রা , সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান এসবের মধ্যে তারা কেন ইসলামবিরোধী গন্ধ পান তা আমাদের বোধগম্য নয়। । সম্ভবত তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এমন কি অবচেতন মনে পাকিস্তানের প্রেমে বুদ হয়ে আছেন। তাই এত আপত্তি।

তবে এ সাম্প্রদায়কতার সুচনা অনেক আাগে  থেকে হয়েছে । ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার বেশ পরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ বাংলা ক্যালেন্ডার কে ‘হিন্দু ক্যালেন্ডার’ আখ্যাদিয়ে এর সাথে যেন না  মেলে সেজন্য পহেলা বৈশাখকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই একদিন আগে অর্থাৎ ১৪ই এপ্রিল নির্দিষ্ট করে দেন।  যা অন্যায়ভাবেই করা হয়েছে । এখানে একটি প্রশ্ন ইংরেজী ক্যালেন্ডার কে আমরা কি খ্রীস্টান ক্যালেন্ডার বলি?  তাহলে বাংলা ক্যালেন্ডার হিন্দু ক্যালেন্ডার হবে কিভাবে? এটি প্রতিটি বাঙ্গালীর।
সব দেশের দিনপঞ্জিকার মত বাংলা ক্যালেন্ডারের কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। সেটি আগে তুলে ধরি। ১.বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিনে হবে।
২.চৈত্র থেকে আশ্বিন পরবর্তী সাতমাস ৩০ দিনে হবে।
৩.প্রতি লিপ ইয়ারে ফাল্গুন মাসের সাথে এক দিন যুক্ত হবে।
পাকিস্তান ভাগের পর তদানিন্তন সরকার  পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশে এই ক্যালেন্ডারটিকে হিন্দুয়ানী আখ্যা দেয় এবং ভারতবিরোধী  স্রোতের  কারনে কিছু পরিবর্তন আনার চিন্তা করে। ১৯৬৬ সালের ১৭ ই ফেব্রুয়ারী  একে সম্পূর্ন ইংরেজী ক্যালেন্ডারের অনুকরনে সাজানোর প্রস্তাব দেয়া হয়  এবং ফলস্বরুপ এর স্বকীয়তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

এই একই  ভাবধারায়  ছিলেন আমাদের এরশাদ সাহেব স্বাধীনতার অনেকবছর পর পুনরায় তিনি আমাদের বাংলা ক্যালেন্ডার নষ্ট করেন। হিন্দুয়ানী আখ্যা দিয়ে , অন্যায় ভাবে আমাদের উপর ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ চাপিয়ে দেয়া হয়। এই অপকর্মটি করেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং তিনি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেই  তা করেছেন।  যদিও বৈজ্ঞানিকভাবেই পহেলা বৈশাখ কাল ১৫ এপ্রিল ,১৪ এপ্রিল নয়। তাহলে বাংলাদেশে কেন তা আজকে (১৪ এপ্রিল) পালন করা হচ্ছে?

সাধারণত বাংলাদেশে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন হয়ে থাকে। পশ্চিম বাংলায় ১৫ এপ্রিল। সেই হিসাবে ১৪ এপ্রিল চৈত্রসংক্রান্তি বা চৈত্র মাসের শেষ দিন, বা বছরের শেষ দিন। কখনো কখনো দুই বাংলায় একই দিনে পহেলা বৈশাখ হয়, যেমন ২০১৬-তে ১৪ এপ্রিল একই দিনে নববর্ষ পালিত হয়েছে।  এরশাদ চালাকি করে দুই বাংলার বাঙালিরা যাতে একদিনে পহেলা বৈশাখ পালন করতে না পারে, সেজন্য এ অপকর্মটি করেছেন। সামরিক কায়দায় তিনি ভাদ্র মাসের একদিন কেটে দিয়েছেন।  ব্যাপক অর্থে সাধারণ মানুষ এটি মেনে নিয়েছে,  এ বিষয়টি নিয়ে বাংলা একাডেমী আর দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবিরাও নিশ্চুপ। বর্তমান সরকার কি এরশাদের এই অপকর্মটিও রদ করতে পারেন?
আজ পুলিশ বেষ্টনীতে আমাদের পহেলা বৈশাখ পালিত হচ্ছে। কারন মৌলবাদী চক্র সবসময় বর্ষবরনের উৎসব কে নষ্ট করার চেষ্টায় থাকে। কখনও বোমা  মারার হুমকি , মেয়েদের শ্লীলতাহানীর চেষ্টা , যাতে করে  আমরা বর্ষবরন করতে না পারি।
কিন্তু বাঙ্গালির এ প্রানের উৎসবকে কখনই ভয়ভীতি দেখিয়ে আটকে রাখা যাবেনা। উৎসব তার আপন শক্তিতে বের হয়ে আসবে আপন  গতিতে।  আমাদের পহেলা বৈশাখের উৎসবের প্রস্তুতির ব্যাপ্তি বাড়াতে হবে। কারন পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসবের দিন নয় এটি বাঙ্গালী জাতীয়বাদ জাগানোর , সাম্প্রদায়িকতা রুখে দেয়ার অন্যতম হাতিয়ার। তাই বৈশাখ উদযাপনের প্রস্ততি ও ব্যাপ্তি বাড়াতে হবে। মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ  সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় এমনকি ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে শুরু করতে হবে। – শুধু তাই নয় বাঙ্গালীর যে কোন উৎসব জাতি ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে পালন করতে হবে।

যেসব বাঙ্গালী মুসলমানরা ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করতে চান বা বর্ষবরনে হিন্দুয়ানী গন্ধ পান তাদের উদ্ধেশ্যে বলছি একটি জাতি তার সংষ্কৃতি ছাড়া বাচতে পারেনা। আর ধর্ম সংষ্কৃতির অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ।  তাই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকে বের হয়ে আসুন। নিজের স্ংষ্কৃতির চর্চা করুন।