শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু ও ফজিলাতুন্নেসার কোল আলো করে প্রথম সন্তান তাদের অতি আদরের হাসু। বাবাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন হাসু, দেখেছেন তাঁর দৈতসত্তা। একদিকে বাবা বঙ্গবন্ধু, অন্যদিকে জননেতা বঙ্গবন্ধু। যে কারনে বাবা বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা, মানবিক ভাবনা ও সমাজচিন্তা শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করেছে। তাই বর্তমানে তার দেশ পরিচালনা ও নীতি নির্ধারনে আমরা বঙ্গবন্ধু প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ্য বাবার যোগ্য মেয়ে। আমাদের সৌভাগ্য আমরা বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছি। কারন তিনি না থাকলে আজ এ দেশ সমৃদ্ধ ও স্বয়ংসম্পূর্ন হত না।

শেখ হাসিনা যখন হাঁটতে শিখেন তখন বঙ্গবন্ধু জেলে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ১১৮ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘রেণু তখন হাসুকে নিয়ে বাড়িতেই থাকে। হাসু তখন একটু একটু হাঁটতে শিখেছে।’ পরিবারকে সময় না দিতে পারার বিষয়টি বঙ্গবন্ধুকে খুব দুঃখ দিত। তাঁর বড় ছেলে কামালের জন্ম হলে তিনি তাঁকে ভাল করে ঐ সময় দেখতেও পারেননি। শেখ হাসিনা বাবাকে কম কাছে পেতেন বলে বঙ্গবন্ধু বাড়িতে এলে তাঁকে হাতছাড়া করতে চাইতেন না। বঙ্গবন্ধু নিজেই স্মৃতিচারণে বলেছেন, ‘হাসু তো আমাকে পেলে ছাড়তেই চায় না।’ আবার অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ১৮৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘এক বৎসর পরে আজ ওদের সাথে আমার দেখা। হাসু আমার গলা ধরলে আর ছাড়তে চায় না।’ শুধু তাই নয়, শেখ মুজিব বাড়িতে এলে কন্যা হাসু তাঁকে আর ঢাকা যেতে দিতে চায় না। জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ‘স্মৃতির দখিন দুয়ার’ লেখায় লিখেছেন, ‘আমার বাবা যখনই সময় ও সুযোগ পেতেন একবার বাড়ি এলে আমরা কিছুতেই তাঁকে ছেড়ে নড়তাম না। বাবার কোলে বসে গল্প শোনা, তাঁর সঙ্গে খাওয়া, আমার শৈশবে যতটুকু পেয়েছি তা মনে হতো অনেকখানি।’

কিন্তু শেখ মুজিবকে আবার দেশের কাজে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু দিনে চলে গেলে শিশু হাসু কাঁদতো। তাই তিনি রাতে চলে যেতেন। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘রাতে রওয়ানা করে এলাম, দিনেরবেলায় আসলে হাসু কাঁদবে।’

বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় জেলে কাটিয়েছেন। দেশের কাজ করতে গিয়ে তিনি পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারতেন না। তিনি লিখেছেন, ‘ছেলেমেয়েদের জন্য যেন একটু বেশি মায়া হয়ে উঠেছিল। ওদের ছেড়ে যেতে মন চায় না, তবুও তো যেতে হবে। দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে।’

বাবাকে অনুসরণ করত হাসু। ভাষা আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু। পরবর্তীতে গণমানুষের চাপের মুখে বঙ্গবন্ধু ও অন্য বন্দীদের মুক্তি দেয়া হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু বাড়িতে এলে হাসু তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘‘আব্বা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই।’’ বয়সে ছোট হলেও ঐ সময়কার জ্বালাময়ী স্লোগান শিশু হাসিনার মুখস্থ ছিল। বাড়িতে প্রায়ই রাজনৈতিক মিটিং বসতো। কিশোরী বয়সে শেখ হাসিনা জানালার পাশে বসে মিটিংয়ের কথা শুনতেন। অনেকসময় তিনি সবার জন্য চা বানিয়ে দিতেন। শেখ হাসিনার স্মৃতিকথা: ‘১৯৬৬ সালের কথা মনে আছে। কয়েকদিন ধরে আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী কমিটির সভা চলছিল। আমার তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। …..কিন্তু পড়ব কি! মিটিং চলছে বাড়িতে, মন পড়ে থাকে সেখানে। একবার পড়তে বসি আবার ছুটে এসে জানালার পাশে বসে মিটিং শুনি। সবাইকে চা বানিয়ে দিই।’ শেখ হাসিনা ১৯৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৭০-এর নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত এবং স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকান্ড দেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর সুখ-দুঃখের ভাগিদার হয়েছেন। শেখ হাসিনা দেখেছেন তাঁর পিতার প্রতি সাধারণ মানুষের ভালবাসা। বিভিন্ন আন্দোলনে ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়িতে সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের ঢল নামতো। শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘অসহযোগ আন্দোলনের সময় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এসে আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে যেত। আব্বা কখনও গেটে পাশে চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে, কখনও বাড়ির বারান্দার ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতেন। আমরা আব্বার পাশে এসে দাঁড়াতাম, হাজার হাজার মানুষের ঢল নামত তখন এ বাড়ির সামনে।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে গল্প, আলাপ, আলোচনা করতেন। অনেক রাত পর্যন্ত জনসভার গল্প বলতেন। এমন রাজনৈতিক আলোচনা শুনে শুনে তিনি মানষিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর মত পিতা এবং পরিবারকে অকালে হারিয়েছেন শেখ হাসিনা। ১৯৯১ সালে ১৩ আগস্টের ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘যেদিন কামাল আব্বাকে ‘আব্বা’ ডাকার অনুমতি চেয়েছিল, আমি সঙ্গে সঙ্গে ওকে আব্বার কাছে নিয়ে যাই। আব্বাকে ওর কথা বলি। আব্বা ওকে কোলে তুলে নিয়ে অনেক আদর করেন। আজ আর তারা কেউই বেঁচে নেই-আজ যে বার বার আমার মন আব্বাকে ডাকার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।’

বঙ্গবন্ধু শেষ জীবন গ্রামে কাটাতে চেয়েছিলেন। সেই ইচ্ছার কথাও তিনি শেখ হাসিনাকে বলেছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর কন্যাকে প্রায়ই বলতেন, ‘শেষজীবনে আমি গ্রামে থাকব। তুই আমাকে দেখবি। আমি তোর কাছেই থাকব।’ বঙ্গবন্ধুর মত শেখ হাসিনাও তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলি তাঁর গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় কাটাতে চান। তিনি বলেছেন, ‘আমার জীবনের শেষ দিনগুলো আমি টুঙ্গিপাড়ায় স্থায়ীভাবে কাটাতে চাই। খুব ইচ্ছে আছে নদীর ধারে একটা ঘর তৈরি করার।’

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ দ্বারা শেখ হাসিনা প্রভাবিত। যে কারনে বাবার মতো শতনির্যাতন জীবন ঘাতি হামলা হলেও রাজনীতি থেকে সরে যাননি। তিনি প্রায়ই ভাষনে বলেন, আমি আমার জীবন দেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করলাম। ১৯৮১ সাল থেকে শেখ হাসিনা রাজপথে আছেন। এরই মধ্যে তিনি স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনি এবং একাত্তরের ঘাতক, রাজাকারদের বিচার করতে সক্ষম হয়েছেন। টানা ৫ বার দুর্নীতির সূচকে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করেছেন। আজ তিনি নিজেও নেতৃত্বগুণে হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সৎ নারী রাষ্ট্রপ্রধান। জননেত্রী শেখ হাসিনা গনতন্ত্রের মানষকন্যা ও উন্নয়নশীল ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার। বঙ্গবন্ধু যেমন একটি সাহসী জাতি হিসেবে আমাদেরকে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তার কন্যা শেখ হাসিনাও এদেশকে পরিচয় করে দিয়েছেন সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে। পিতার যোগ্য সন্তান, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও মানবিকতায় যেন বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি। তাই বঙ্গবন্ধু মানে এখন বাংলাদেশ, আর বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ মানে এখন আমাদের প্রাণের নেত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশ। তার বালিষ্ঠ নেতৃত্যে বাংলাদেশ আজ জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলার দ্বারপ্রান্তে।

বঙ্গকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘজীবী হউন ও আমৃত্যু প্রধানমন্ত্রী থেকে আমাদেরকে আলোকিত করুন এই প্রার্থনা করি।

“এমন কন্যা যুগে, যুগে যেন জন্মায়
বাংলার প্রতি ঘরে, গ্রামে গঞ্জে
সবশেষে বলি, বুবু আমারো তো কিছু হন যে।”

লেখক: ড. মোহাম্মদ হাসান খান,
সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।