রিফাতের ভালবাসার জয়!

আগুনের লিলিহান শিখা যখন চকবাজারের চুড়িহাট্টায় সব কিছু পুঁড়িয়ে ছাঁই করে দিচ্ছে ঠিক তখন ভালবাসার জয় আমরা দেখতে পেয়েছি। বাঁচতে কে না চায় বলুন? কিন্তু ভালবাসার মানুষটিকে মৃত্যুের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজে বাঁচাটা সত্যি এক নির্মম-নিষ্ঠুর আর বেদনাদায়ক। হয়তো একথাটা উপলদ্ধি করে নিজে জীবন দিয়ে ভালবাসার জয় এনে দিলেন।

দু’ বছর হলো রিফাত- রিয়ার দাম্পত্য জীবন। আনন্দ, হাসি,খেলা কী না ছিল তাদের জীবনে। ক’দিন পরই তাঁদের ঘরে নতুন অতিথি আসার কথা ছিল।

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রিয়া। আগুনের লিলিহান শিখা যখন আস্তে আস্তে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে ছিল ঠিক তখন ইচ্ছে করলেই বেঁচে যেতে পারতেন রিফাত। দত্ত রোডের ‘ওয়াহিদ ম্যানশন’ রিয়া রিফাতের বসবাস। ভবনটির ঠিক তৃতীয় তলায় থাকতেন তারা। রিয়া অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় বেশ অসুস্থ ছিলেন। নড়াচড়া করা সম্ভব ছিল না তাঁর। দৌড়-ঝাঁপ করে যে সড়ে যাবে সেটিও ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু স্বামী রিফাত ইচ্ছে করলেই সটকে যেতে পারতেন। কিন্তু হয়তো তিনি ভেবেছেন প্রিয়তমাকে ফেলে কী করে তিনি একা বাঁচবেন। হয়তো তিনি একা বাঁচতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেন নি। আগুনের লিলিহান শিখা যখন আস্তে আস্তে তাঁদের কক্ষের দিকে আসছিলো,হয়তো তিনি বুক পেঁতে ছিলেন, বাঁধা দিতে চেয়েছিলেন আগুনকে।

কিন্তু অগ্নিকে রোখা বড় যে দায়। রিয়ার গর্ভের সন্তান, রিয়া দু’জনকে নিয়েই রিফাত অগ্নিদগ্ধ হয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। জীবন্ত মানুষ,জ্বলন্ত আগুনে পুঁড়ে ছাড়খাড়।

স্বজনরা মিডিয়া কর্মীদের বলছিলেন, আগুন লাগার পর রিফাতের পরিবারের সাথে নাকি মোবাইল ফোনে কথা হয়।  রিফাত জানায় রিয়াকে নিয়ে নামা সম্ভব হচ্ছে না। তাই সে নিজেও নামবে না।

ভালবাসাটা কত দামী ছিল। ইচ্ছে করলেই তো বাঁচতে পারতো রিফাত। রিফাতের মৃত্যুতে ভালাবাসার চড়ম এক বিজয় হয়েছে। সত্যিকারের ভালবাসার মানুষরা এমনই হন। কখনো তারা ভালবাসার মানুষকে বিপদে ফেলে সটকে পড়েন না। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে দেন, তবু ভালবাসাকে হারতে দেন না। রিফাতের মতো ভালবাসার মানুষরা আছে বলেই এখনো ভালাবাসা টিকে আছে।

চকবাজারে অগ্নিকান্ডের ঘটনা এতটাই মর্মাহত যে এসব ঘটনা গুলো আমাদের হৃদয়ে দাগ কেটে দিচ্ছে। একের পর এক অগ্নিকান্ডে জীবন্ত মানুষ গুলো লাশ হয়ে যাচ্ছে। ভালবাসার মানুষ গুলোকে হারাচ্ছে স্বজনরা। তবু কর্তা ব্যক্তিদের টনক নড়ছে না।

নিমতলীর ঘটনার পর চকবাজার! যেন পুরো বাংলাদেশের ই এক হাল! এভাবে আর কত? প্রাণের দাম বুঝি এত কম। দু’চারদিন রিফাত আর রিয়াদের আবেগ নিয়ে দু’চার লাইন লেখালেখি। এরপর হয়তো আমরাও ভুলে যাবো তাঁদের।

কিন্তু প্রকৃতি কী ভুলে যাবে? না চকবাজারের বাতাসে যে রিয়া -রিফাতের ভালবাসা ঘুরে  বেড়াবে। রিয়ার গর্বে থাকা সন্তান ও যে ক্ষমা করবে না তাঁদের যারা আবাসিক এলাকায় গড়ে তুলেছে ক্যামিকেল ইন্ড্রাস্টি।

এত কিছুর পর ও,জয় হল ভালবাসার।  জয় হলো সত্যিকারের মনুষ্যত্বের।  ভালবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তারা।

লেখক:  রিফাত কান্তি সেন
সাংবাদিক,কলামিষ্ট।