মেঘের রাজ্য সাজেকে একদিন

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের নগরী ‘সাজেক’। চারিদিকে সবুজ বৃক্ষরাজি বেষ্টিত ছোট বড় অসংখ্য পাহাড় আর পাহাড়ে ঘেরা প্রাকৃতির লীলাভূমি। আকাশে মেঘের খেলা আর পূর্ব দিগন্তে সূর্য উদয় হয়ে পশ্চিমে অস্তমিত হওয়ার অপরূপ দৃশ্য ভ্রমণ পিপাসুদের নজর কাড়ে। বর্তমান সময়ে যে’কটি ভ্রমণ গন্তব্য জনপ্রিয় তার মধ্যে অন্যমত বাংলাদেশের রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের রুইলুই পাড়া ও কংলাক পাড়া।

ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের মুখে মুখে শোনা আর সংবাদ মাধ্যমে সাজেক ভ্যালির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনায় ভ্রমণে উৎসাহী হয়ে উঠে চাঁদপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। প্রিয় শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় মেঘের রাজ্য সাজেক ভ্যালিতে বার্ষিক শিক্ষা সফর-২০১৯ স্থান নির্ধারণ করা হয়। প্রতি বছর শীতের সময়ে দেশের কোনো না কোনো ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানে শিক্ষা সফরে যাওয়া বিভাগীয় রীতিতে পরিণত হয়েছে। নতুন বছরকে প্রকৃতির প্রেমে বন্দী করতে ১৫ জানুয়ারী মঙ্গলবার রাত ১১টায় কলেজ গেইট থেকে পদ্মা বাসে পাড়ি জমাই আমরা ৫২জন ভ্রমণ পথিক।

এ ভ্রমণ যাত্রায় আমাদের সফর সঙ্গী হিসেবে ছিলেন বাংলা পরিবারের অভিভাবক বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আজিম উদ্দিন স্যার ও স্যারের সহধর্মিনী অহিদুন্নেসা (শিপন), ছেলে মেডিকেল শিক্ষার্থী সাব্বির আহম্মদ শাকিল, মেয়ে আমেনা ও আয়েশা; এবং আরেক অভিভাবক সহকারী অধ্যাপক মো. সাইজ্জামান স্যার ও স্যারের সহধর্মিনী চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাহমিনা ফেরদৌস ম্যাডাম, মেয়ে সানজা ও ছেলে ছোট অতিথি ধাঁধাঁ প-িত সুখন।

কুয়াশার দখলে থাকা সড়কে অবিরাম যাত্রা পথে সবাইকে জাগিয়ে রাখতে আশরাফুল ভাইয়ের মিনি সাউন্ড বক্স এবং ঔষধের বাক্স আনন্দের মাধ্যম হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। রকমারি গানে মুখর যাত্রাপথে শিক্ষক ছাত্রদের মহা মেলবন্ধন তৈরি হয়। সুর আর বেসুরা কন্ঠে জমে উঠে গানের আড্ডা। ঔষধের বাক্সে থাকা বমি, মাথা ব্যাথা ট্যাবলেট এবং চিকিৎসা সামগ্রীতে গড়ে উঠে ভ্রাম্যমান প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র। কাজী সাইফ ভাইয়ের দেয়া উপাধি এমবি বেহুঁশ ডিগ্রি পেয়ে রোগী দেখে দিশেহারা আশরাফুল ভাই।

ছবি: নাগরিক বার্তা.কম

সাজেকপানে ছুটে চলা দীর্ঘ পথে প্রথম যাত্রা বিরতি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে টাইম স্কয়ার রেস্টুরেন্টে । রাত ২টায় প্রায় ঘন্টাব্যাপী যাত্রা বিরতির শেষে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে বাস যাত্রা করে।

খাগড়াছড়ির আঁকা-বাঁকা বন্ধুর পাহাড়ি সড়কে ঢেউয়ের তালে গাড়ি ছুটছে যেন দোলনায় চড়ে। মাঝে মধ্যে ঝাঁকিতে একসিট থেকে অন্য সিটে অদল-বদল হয়ে যাই। সকাল ৭টায় খাগড়াছড়ি সদরে নারকেল বাগান মাউন্ট ইন হোটেলের সামনে বাস থামে। হোটেলে প্রায় ঘন্টাব্যাপী বিশ্রাম শেষে সাজেক ভ্যালির পাহাড়ি অঞ্চলে সড়কের রাজা ৪টি চান্দের (জিপ) গাড়ীতে আমরা উঠে বসি। এ দিকে সেনাবাহিনীর একটি গাড়ী এসে চান্দের গাড়ি গুলোকে এক সাথে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তারপর সামনে এবং পিছনে সেনাবাহিনীর দুইটি গাড়ি এসকর্ট দিয়ে সাজেকের পথে পাড়ি জমায়। দিনে দুইবার নির্দিষ্ট সময়ে (সকাল সকাল ১০টা এবং বিকাল ৩:৩০) সাজেক ভ্যালীতে পর্যটকদের নিরাপত্তার সেনাবাহিনী যাতায়াতের অনুমতি দেয়।

খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে সাজেক ভ্যালির দূরুত্ব ৭০ কিলোমিটার। দীঘিনালা থেকে ৪৯ কিলোমিটার এবং বাঘাইহাট থেকে ৩৪ কিলোমিটার। খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা আর্মি ক্যাম্প হয়ে সাজেকের দিকে যাত্রা করে চান্দের গাড়ি। পরে ১০নং বাঘাইহাট পুলিশ ও আর্মি ক্যাম্পে সাজেকে যাওয়ার অনুমতি নিয়ে পাহাড়ের ঢেউয়ের মতো আঁকা-বাঁকা বন্ধুর পথে করে। যাত্রাকালে আমরা চার বন্ধু চালকের অনুমতি না নিয়েই গাড়ির ছাদে উঠি। গাড়ির ছাদে কনকন বাতাস আর পাহাড়ে ঢেউয়ের মতো আকাঁ-বাঁকা বন্ধুর সড়কে ভয়কে জয় করতে বেসুরা কন্ঠে গান ধরি।

প্রায় দীর্ঘ ৪ ঘন্টা যাত্রা পথে আদিবাসী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন বৈচিত্র বাসস্থান দেখে মন জুড়িয়ে গেল। পথিমধ্যে বাঘাইহাট সেনা ক্যাম্পে আমাদের গাড়ির ছাদ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। পথে কাসালং ব্রিজ, টাইগার টিলা আর্মি পোস্ট ও মাসালং বাজার বর্তমানে সাজেক থানা পার হয়ে যাত্রা পথে চান্দের গাড়িগুলো থামিয়ে ড্রাইভার জাকির ভাই ও তার সঙ্গী চালকেরা গাড়ির ইঞ্জিন ঠান্ডা করার জন্য পানি ছিটিয়ে দেয়। প্রায় আধাঘন্টা অবসর নিয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়ে রুইলুই পাড়ায় প্রবেশ করে।

রুইলুই পাড়ার প্রবেশ পথে সেনিলুসাই রেস্টুরেন্ট কটেজের সামনে চান্দের গাড়িগুলো থামে। সাইজ্জামান স্যার প্রত্যেককে গাড়ী থেকে ব্যাগ নামানোর নির্দেশ দেন। স্যার আমাদের ৫জনের জন্য একটি একটি করে রুম ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আমরা ব্যাগ নিয়ে রুমে চলে যাই। তারপর বিশ্রাম নিয়ে নিচে নামতেই নজরে পড়ে সেনিলুসাই রেস্টুরেন্টের চায়ের স্টলে। প্রায় ১৪ বছরের কিশোরী পর্যটকদের চা তৈরি করে দিচ্ছে। কিশোরীর গায়ের রং ফর্সা, নাক হালকা চ্যাপ্টা, মাথার চুল কালো তা কোমর পর্যন্ত ঝুলে থাকে; দেখতে চেহারা মায়াবী, মুখে সব সময় হাসি ফুঁটে থাকে এবং কাস্টমারদের আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকে।

কটেজে বিশ্রাম শেষে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। অজানা সাজেকের নতুন কিছু জানার প্রবণতায় ছটফট করছে মন। এ অঞ্চল সম্পর্কে জানতে চারিদিক ছুটাছুটি করতে চাইলেও ইচ্ছে মতো তা সম্ভব নয়। দুপুর ১:৩০ মিনিটে আমাদের খাবারের আয়োজন করা হয় সেনিলুসাই রেস্টুরেন্টে। খাবার তালিকায় ছিল ভাত, দেশি মুরর্গির মাংস, শুটকির ভর্তা, বিশেষ ধরণের সবজি এবং গাজর, মুলা, পাতাকপি ও পাহাড়ি কাঁচা মরিচের সালাদ। সালাদে প্রচুর ঝাল। সুস্বাদু খাবার তৈরিতে পারদর্শী পাহাড়িরা। প্রায় ৮ থেকে ৯ প্রকার তরকারি দিয়ে রান্না করা সবজির স্বাদ অতুলনীয়।

বিকেল সাড়ে ৩টায় আমাদের প্রিয় শিক্ষক মো. আজিম উদ্দিন স্যার এবং সাইদুজ্জামান স্যার অজানা সাজেকের দৃশ্য দেখানোর জন্য জিপে (চান্দের গাড়ী) উঠতে নির্দেশ দেন। সাজেক ভ্যালির শেষ গ্রাম রুইলুই পাড়া থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ভ্রমণ পিপাসুদের শেষ ঠিকানা কংলাক পাহাড়। কংলাক পাহাড়ের ঢালুতে জিপ থামায়। এর পর আর জিপ সামনের দিকে যায় না। কংলাকে উঠার আগে মাহবুব ভাই সবাইকে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে নিলেন। এদিকে লোকমুখে শুনা কথায় কংলাকে উঠার জন্য লাঠি ক্রয় করার জন্য পাশের একটি দোকানে যাই লাঠির সন্ধানে কিন্তু সেখানে লাঠি পাওয়া যায়নি। লাইন ধরে কংলাক পাহাড় জয়ের মিশনে প্রস্তুত নেই। এ যেন হিমালয় পর্বত জয়ের আনন্দ।

কংলাক পাহাড়ে উঠতে গিয়ে ক্লাসমেট নুসরাত জাহান জুঁথিকে উপর উঠাতে আমার উপর গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয়। কারণ কংলাকের উঁচুতে উঠতে গিয়ে সে ভয়ে কাঁপছে এবং হাঁপাচ্ছে। আমি একধাপ এগিয়ে যাই তারপর তাকে টেনে উঠাই। এভাবে কংলাক জয় করলাম আমরা। কংলাকে উঠে চারিদিক তাকিয়ে সাজেক তথা বাংলা অপরূপ বৈচিত্র দেখে বিস্মিত হই। এ পাহাড় থেকে ভারতের লুসাই পাহাড় দেখা যায়।

এদিকে কংলাকে সবাই মোবাইল ও ক্যামেরায় ছবি এবং সেলফি তুলে ব্যস্ত সময় পার করছে। তখন পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্তমিত হওয়ার পালা। সূর্য অস্তমিত হওয়ার দৃশ্য এবং মেঘ দেখতে সাজেক ভ্যালির দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার পর্যটক ভীড় জমায়। পশ্চিমাকাশে দিন শেষে সূর্যের বিদায় লগ্নে এক অপরূপ রং ধারণ করে। গোধলী রূপ দেখে কবি জীবনানন্দ দাশের “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর” কবিতার ছন্দে হারিয়ে যাই। ভ্রমণ পিপাসু সফর সঙ্গীদেরকে আমার পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে চকলেট দেই। সাঈদুজ্জামান স্যার আমাদেরকে দ্রুত কংলাক ত্যাগ করার কথা বলে কয়েকটি ছবি তুলে নিলেন। এর পর আমরা ধীরে ধীরে পাহাড় থেকে নেমে জীপে চড়ে রুইলুই পাড়ার বিজিবি হ্যালিপ্যাডে অবস্থান নেই। সবাই আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে। হ্যালিপ্যাডে উপজাতি মেয়েরা ব্যাম্বু টি, বিস্কুট, বিভিন্ন খাবার সামগ্রী বিক্রয় করে।

সন্ধ্যা ৭টায় আমরা আবারো রুইলুই পাড়া সেনিলুসাই কটেজে ফিরে আসলাম। তারপর পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী খাবার ব্যাম্বু চিকেন রান্না করার পদ্ধতি দেখলাম । সাড়ে ৮টায় সেনিলুসাই রেস্টুরেন্টে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সাইদুজ্জামান স্যার। গান, গল্প, ধাঁধার আসর জমে উঠে। এ দিকে আমাদের রাতের খাবার হিসেবে পাহাড়িদের জনপ্রিয়
ব্যাম্বু চিকেন এবং পরোটা ভাজা হয়। মুরগির মাংসের ছোট ছোট টুকরো মসলা মিশিয়ে বাঁশের খোলসের ভিতরে ঢেলে তারপর কলাপাতা দিয়ে মুখ মুড়িয়ে লাকড়ির আগুনে পুড়িয়ে ব্যাম্বু চিকেন রান্না করে।

রাতের খাবার শেষে সবাই কটেজে বিশ্রাম নিলেও আমি প্যাড কলম হাতে নিচে নেমে আসি। সাজেকের ইতিহাস ঐতিহ্য জানতে সেনিলুসাই রেস্টুরেন্ট মালিকের সাথে কথা বলি। উপজাতির সম্প্রদায়ের মানুষ গুলো কথা বললেও নিজের নাম গোপন রাখে। রেস্টুরেন্টের মালিকের সাথে কথা বলার সময় বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করে সেই চা স্টলের দায়িত্বে থাকা কিশোরী সেনিলুসাই। মেয়েটির নাম সেনি আর গোত্র হিসেবে লুসাই সংযুক্ত করা হয়েছে। রূপে গুণে অপূর্ব সেনিলুসাইয়ের সাথে বন্ধুত্বের বন্দোবস্ত করি। সে খাগড়াছড়ি পুলিশ লাইন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। খাগড়াছড়ি সদরে হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা করে। বিদ্যালয় বন্ধের সময় রুইলুই পাড়ায় ফিরে এসে পর্যটকদের আপ্যায়নে নিজেকে সর্বদা ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করে । সেনির কাছ থেকে অনেক আজানা তথ্য জেনে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সাজে সজ্জিত সাজেক। শীতের সময় দুপুরে সূর্যের কড়া শাসন আর বৈকালের হিমেল বাতাস, রাতে কুয়াশাছন্ন পুরো প্রকৃতি। ভোর বেলায় কুয়াশার স্থিরতায় উঁচু-নিচু পর্বতের মাঝে নদীর জল বয়ে যাওয়ার দৃশ্য পর্যটকদের নজর কাড়ে। বর্ষার মৌসুমে সবত্র মেঘ, পাহাড় আর সবুজের দারুণ মিতালী চোখে পড়ে। এখানে তিনটি হেলিপ্যাড বিদ্যমান; যা থেকে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত আর মেঘের খেলার অপূর্ব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যায়। সাজেকে একটা ব্যতিক্রমি অভিজ্ঞতা হচ্ছে এখানে ২৪ ঘণ্টায় প্রকৃতির তিনটি রূপই দেখা মিলে। কখনো খুবই গরম, একটু পরেই হঠাৎ বৃষ্টি এবং তার কিছু পরেই হয়তো চারদিক ঢেকে যায় মেঘের চাদরে ; মনে হয় যেন একটা মেঘের উপত্যকা । পর্যটকদের থাকার জন্য সাজেকে রয়েছে নানা রঙ-বেরঙ্গের কটেজ ও রেস্টুরেন্টের সমাহার।

সৌন্দর্যের দাবিদার রুইলুই গ্রাম হলেও বাংলাদেশ তথা বিশ^ব্যাপী পর্যটকদের কাছে মেঘের রাজ্য সাজেক ভ্যালি হিসেবে পরিচিত। যা এখন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বাংলাদেশের দার্জিলিং হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় অবস্থিত রুইলুই গ্রামটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ বর্ডারগার্ড বিজিবি’র নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত।

২০১০ সালে এ অঞ্চলকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বিজিবি’র তত্ত্বাবধায়নে পরিকল্পনা হাতে নেয়। দিঘীনানা থেকে কংলাক পাড়া পর্যন্ত পাহাড়েরর মধ্য দিয়ে রাস্তা এবং নিরাপদ যাতায়াতের জন্য অবকাঠামো তৈরি করে প্রায় চার বছর পর ২০১৪ সালে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সাজেকের বিজিবি ক্যাম্প বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উঁচুতে অবস্থিত। রুইলুই মূলত সাজেক ইউনিয়নের একটি গ্রাম। রুইলু গ্রাম থেকে প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যবর্তী নদী ‘সাজেক’ । পাহাড়ি জলধারা প্রবাহিত সাজেক নদীকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছে সাজেক।

‘সাজেক’ রুইলুই পাড়া এবং কংলাক পাহাড়ের সমন্বয়ে গঠিত। রাঙামাটি জেলার সর্বত্তরে মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত সাজেক নদী। সাজেক নদীর পূর্ব দক্ষিণে রাঙামাটি জেলা এবং উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মিজোরাম সীমান্ত। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইউনিয়ন ‘সাজেক’। এর আয়তন প্রায় ৭০২ বর্গমাইল। সাজেককে রাঙামাটির ‘ছাদ’ বলা হয়। খাগড়াছড়ি থেকে যাতায়াতের কারণে অনেকের কাছ খাগড়াছড়ির সাজেক নামে পরিচিত।

‘সাজেকের প্রথম গ্রাম রুইলুইপাড়া ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। লুসাই ভাষার শব্দ থেকে এ গ্রামের নামকরণ করা হয় রুইলুই পাড়া। যার বাংলা অর্থ “সোনা বা সম্পদের নদী” । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এ পাড়ার উচ্চতা প্রায় ১৭২০ ফুট এবং ১৮০০ ফুট উচ্চতায় কংলাক পাহাড় অবস্থিত। এ পাড়ার প্রবীণ আধিবাসী লুসাই সম্প্রদায়। লুসাই ছাড়াও বসবাসকারী অন্যান্যদের মধ্যে চাকমা, পাংকুয়া ও ত্রিপুরা আধিবাসীরা বসবাস করে। লুসাই সম্পদ্রায় প্রায় ১০৮ বছর পূর্বে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। এ পাড়ায় বিজির একটি গির্জা, রুইলুই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রুইলুই জুনিয়র হাইস্কুল রয়েছে; যা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ২৭ বর্ডারগার্ড ব্যাটলিয়ন নির্মাণ করে। এ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিজিবি ম্যারিশ্যা জোন। পাশে একটি গণপাঠাগার রয়েছে। স্বাস্থ্য সেবার জন্য রয়েছে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। তাছাড়া সেখান একটি লুসাই এগ্রিকালচার ক্লাব রয়েছে যার একটু সামনে গেলে সাজেক ইউনিয়ন পরিষদ। এর ইউনিয়ন পরিষদের আয়তন দেশের সর্ববৃহৎ হলে পরিষদ কার্যালয়ের আয়তন সব চেয়ে ছোট যা দেখতে খুঁটির উপর মাচায় গড়ে তোলা টিনের তৈরি একটি দোকানঘরের মতো। বর্তমানে সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের পাশাপাশি ‘সাজেক থানা’ প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সাজেক থানায় সার্বিক নিরাপত্তায় বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী এবং বিজিবি যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

কটেজেরাত্রি যাপন শেষে ভোর সাড়ে ৬টায় সূর্যোদয় দেখতে গিয়ে ছবি তুলে সময় পার করি। এরপর সকাল ৮টায় কটেজে ফিরে এসে সকালের-নাস্তা খিচুড়ির সাথে ডিমঝোল খেয়ে আমরা রুইলুই ছেড়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে খাগড়াছড়ি শহরে আসি। সেখান থেকে খাগড়াছড়ি হটিকালচার পার্কে ঝুলন্ত ব্রিজ ঘুরাঘুরি শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে আলুটিলা গুহার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। আলুটিলা গুহা প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি। এ গুহার টিলায় মুলার মত একধরনের আলু পাওয়া যায়; যার কারণে এগুহার নাম কারণ করা হয় আলু টিলা। জনশ্রুতি রয়েছে এ টিলাটি ১৯৯৩-৯৪ সালে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন ও জেলা পরিষদ সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।

এ শিক্ষা সফরে পাহাড়ি অঞ্চলের আধিবাসীদের জীবন বৈচিত্র্য; জানা-অজানা পথের অনেক তথ্য-উপাত্ত এবং শিক্ষণীয় বিষয় বাস্তবে উপলদ্ধি করতে পেরেছি।

লিখেছেন: গাজী মহিনউদ্দিন
বাংলা বিভাগ, চাঁদপুর সরকারি কলেজ, চাঁদপুর।