মাশরাফির জন্য হলেও বিশ্বকাপ স্মরণীয় করতে চান মুশফিক

আসন্ন বিশ্বকাপের মধ্যে দিয়েই হয়তো ক্রিকেট থেকে বিদায় নেবেন বাংলাদেশ দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। শেষ বারের মত তার অধীনে বিশ্বমঞ্চে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তাইতো তার বিদায়ী বিশ্বকাপ বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রাখতে চান সতীর্থরা। সম্ভবত মাশরাফির মতো বাংলাদেশ দলের আরও কয়েকজনের শেষ বিশ্বকাপ এটি। তবে নিজেদের কথা না ভেবে আপাতত অধিনায়কের জন্য হলেও বিশ্বসেরা এই মঞ্চ রাঙাবেন তামিম-মুশফিকরা। রবিবার নিজেদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন নিয়ে আলোচনার সময় এমনটাই জানালেন উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম।

চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন, নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতিটা কেমন?

মুশফিক- শুধু বিশ্বকাপ না, বাংলাদেশের হয়ে আপনি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবেন, একটা টুর্নামেন্ট খেলবেন এটা যে কোনো ক্রিকেটারের জন্য গর্ব ও সম্মানের বিষয়। আর বিশ্বকাপ তো অবশ্যই অনেক বড় মঞ্চ। আর আমরা তিন-চারজন আছি আমাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছি। আমাদের ইচ্ছে আছে এটাকে স্মরণীয় করে রাখার ও ইচ্ছে আছে শেষ পর্যন্ত যাওয়ার। আমার মনে হয় অসাধ্য কিছুই না। হয়তো বা অনেক কঠিন একটা কাজ। তবে যে কোনো কাজই সহজে অর্জিত হলে সেটার মজা আসলে থাকে না। আমার কাছে মনে হয় আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের যথেষ্ট সামর্থ্য আছে নক আউট পর্বে যাওয়ার। আর নক আউট পর্বে গেলে যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। আমাদের সামনে আয়ারল্যান্ড সিরিজটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আয়ারল্যান্ড সিরিজ থেকেই ইতিবাচক ছন্দটা ধরতে হবে।

আপনার ক্যারিয়ারের সেরা পারফর্মেন্স শো করার মঞ্চ এই বিশ্বকাপ?

মুশফিক-তা তো অবশ্যই। এমন একটি ইভেন্টে সবাই চায় খেলত। তো আমার মনে হয়, আমিও ব্যতিক্রম নই। তবে কন্ডিশন একটা চ্যালেঞ্জ থাকবে, প্রতিপক্ষ একটা চ্যালেঞ্জ থাকবে। হিউজ ক্রাউড থাকবে।  সব কিছু মিলিয়ে এটা আমার জন্য অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ চতুর্থবারের মতো আমি খেলতে যাচ্ছি। শেষ তিনটি বিশ্বকাপে আমি রান করেছি, আমার নিজেরও একটা ব্যতিক্তগত লক্ষ্য আছে। এই বিশ্বকাপে যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে যেতে পারি। আমি মনে করি সুযোগ আছে, সামর্থ্যও আছে। আমি সেভাবেই চেষ্টা করব। যদি সুযোগ থাকে তাহলে বাংলাদেশকে দুহাত ভরে দিব।

অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের জন্য এবারের বিশ্বকাপ চাপদায়ক নাকি অনুপ্রেরণাদায়ক?

মুশফিক-আন্তর্জাতিক প্রতিটি খেলাই কিন্তু প্রত্যাশা থাকে, চাপও থাকে। কারণ আপনি একটা দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। আপনি চাইলেই বলতে পারবেন না একদিন খেলব, আরেকদিন খেলব না। এটা অনেক সম্মানের বিষয়। এটা আমি সবসময় অনুভব করি। আমিও চাই যে, একসঙ্গে হয়তো এটা আমাদের কয়েকজনের শেষ বিশ্বকাপও হতে পারে। মাশরাফি ভাই যদি এরপরে আর বিশ্বকাপ খেলতে না পারে এটাই আমাদের সঙ্গে শেষ বিশ্বকাপ। তো আমরা সবাই চাইব মাশরাফি ভাই’র জন্য হলেও যেন বিশেষ কিছু করতে পারি। যেটা কি না স্মরণীয় হতে পারে। আমার মনে হয় এটা অবশ্যই অনেক বড় সুযোগ। একই সাথে আমাদের সুযোগও অনেক বেশি আছে এই বিশ্বকাপে ভালো করার।

নিজের প্রথম বিশ্বকাপ ২০০৭ এর কোনো বিশেষ মেমোরি আছে?

মুশফিক-২০০৭ পুরোটা আসলে ঘোরের মধ্যেই ছিলাম। কখন যাবো কখন খেলব, অনেক তরুণ ছিলাম। এত বড় স্টেইজ, আর গ্রেট গ্রেট প্লেয়ার ছিল তখন। শচিন টেন্ডুলকার বলেন, ব্রায়ান লারা বলেন, পন্টিং বলেন, তাদের সঙ্গে খেলা, যাদের টিভিতে দেখেছি তাদের সঙ্গে খেলা, এগুলো অনেক রোমাঞ্চিত করেছিল। তবে এখন যারা খেলছে ওরা অনেক ম্যাচিউরড। রাহি ছাড়া বাকিরা বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে। এই অভিজ্ঞতা গুলো একটু হলেও কাজে দেবে। উপভোগ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিকেট শুধুমাত্র একটা খেলা, এই মানসিকতা নিয়ে যাওয়া ও ১০০% দেয়া, এটাই সবচেয়ে বড় কথা।

এবারের বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি করা নিয়ে কোনো লক্ষ্য?

মুশফিক-মাইলফলক সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের টপ অর্ডারে যারা আছে, সবাই চেষ্টা করে বড় ইনিংস খেলার। আমিও করি। আর আমি সব সময় বিশ্বাস করি ম্যাচ জেতানোর ক্ষেত্রে যে রানটা দরকার, আমি সেটাই করতে চাই। বড় ইনিংস খেলার সুযোগ এলে আমি তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবি। বড় কিছু করার জন্য, স্মরণীয় কিছু করার জন্য চেষ্টার কোনো কমতি থাকবে না।

বড় সিরিজে ফিজিক্যালি মেন্টালি ফিট থাকাটা কতটুকু দরকার?

মুশফিক-ফিটনেস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রথম যে ওয়ার্ল্ড কাপ খেলি, তখন দুই মাস ওয়েস্ট ইন্ডিজে ছিলাম। এটাও দীর্ঘ টুর্নামেন্ট। অনেকে ভাবতে পারে লম্বা সিরিজে ফিটনেস তেমন গুরুত্বপূর্ন না, আসলে তা নয়। এটা গুরুত্বপূর্ণ। ম্যানেজমেন্ট আমাদের যত্ন নিচ্ছে। পরিবার নেয়ারও সুযোগ আছে। যা আমাদের রিলাক্স থাকতে সহায়তা করবে। অনেক সময় দেখা যায় অনেক চাপের ম্যাচের সময় রিলাক্স থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। দিনশেষে মাঠে আমাদের ভালো খেলতে হবে। কোচরা সেভাবেই পরামর্শ দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের বিষেষ বাঁধা হতে পারে কোন দলগুলো?

মুশফিক- যে কোনো দলই হতে পারে। আফগানিস্তানও কঠিন দল। ভারত-পাকিস্তান বা অন্য যে কোনো দলই কঠিন। আবার আমরা ভালো খেললে যে কোনো দলকেই হারানো যাবে। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্দিষ্ট দিনে সব বিভাগে আমরা কী করছি। আমাদের ধারাবাহিকতাটা ভালো রাখতে হবে। তার আগে আয়ারল্যান্ডে আমাদের ভালো সুযোগ আছে। সেখানে আয়ারল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভালো দল। তাদের বিপক্ষে আমাদের ভালো খেলতে হবে। এরপর অনুশীলন ম্যাচে ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষেও আমরা সুযোগ পাবো। সব মিলিয়ে আমরা কোনো দলকেই ছোট করে দেখার সুযোগ দেখছি না।

ইংল্যান্ডে হাই স্কোরিং ম্যাচের বিষয়ে কতটা সতর্ক?

মুশফিক- চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যদি খেয়াল করেন, উইকেট গুলো একটি ফ্ল্যাট ধরনের থাকে। টিপিক্যাল ইংল্যান্ড কন্ডিশনের মত উইকেট থাকে না। আর ৩০০+ তো যে কোনো গ্রাউন্ডেই হয়ে থাকে। আমরাও ওইভাবে প্র্যাকটিস করছি। যাতে স্ট্রাইক রেটটা বেশি থাকে সেটায় নজর দিচ্ছি। ফলে ৩৩০-৩৫০ ক্রস করলেও যেন আমরা চেইজ করতে পারি। আবার পোস্ট করতে পারি, যেন আমাদের বোলাররা সেটা ডিফেন্ড করতে পারে। আমরা সেভাবে চেষ্টা করছি ব্যাটিং ইউনিট হিসাবে। বোলারদের জন্যও কঠিন হবে, কারণ তেমন সুবিধা থাকবে না। তবে এটা ব্যাটসম্যানদের দায়িত্ব। আমরা যদি ১০-২০টা রান বেশি করতে পারি তাহলে বোলারদের সুবিধা হবে।

হাই স্কোরিং ম্যাচ আর ব্যাটিং আক্রমণে পার্থক্য দেখতে চান কিনা?

মুশফিক- স্ট্রাইক রেটটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কত রান করলেন, কত গড়ে রান করলেন, তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্ট্রাইক রেট। আপনি যদি দেখেন, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আমরা ৩২০ এর মতন করেও ইংল্যান্ডের কাছে হেরে গেছি। এটাই প্রমাণ করে যে ওই উইকেটে আমাদের ৩৫০-৩৬০ রান করা উচিত ছিল। আমরা টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানরা সেটাই চিন্তা করছি। আমরা যদি ১০০ করি, সেটাকে কিভাবে ১৩০-১৫০ এ নিয়ে যাওয়া যায় এবং কত দ্রুত সময়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেটা ভাবতে হবে। শুধু বাউন্ডারি না, মাঠ গুলো হয়তো বড় হবে, তাই আপনার রানিং বিটউইন দ্য উইকেটও গুরুত্বপূর্ণ।

আয়ারল্যান্ডের পর দেশে ফেরা হবে?

মুশফিক- এক দিনের জন্য দেশে আসা আমার জন্য মনে হয় একটু কঠিন। সবার পরিবারই মোটামুটি ইংল্যান্ড যাচ্ছে। যা একটা ভালো দিক।

সফর নিয়ে নিজে কতটা আত্মবিশ্বাসী?

মুশফিক- আমাদের একটাই কথা- আমরা বিশ্বাস করি যে আমরা জেতার জন্য যাচ্ছি; শুধু অংশগ্রহণের জন্য নয়। এটা আমরা যেভাবে বিশ্বাস করি, আশা করি আপনারাও তা করবেন ।

এবারে টুর্নামেন্টের ফরম্যাটকে কিভাবে দেখছেন?

মুশফিক- আগে দেখা গেছে আমরা বিশ্বকাপে স্ট্রং গ্রুপে পড়েছি, তখন মনে হয়েছে এই গ্রুপে না পড়ে অন্য গ্রুপে পড়লে ভালো হতো। ২০০৭ সালে আমরা ভারতকে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে কোয়ালিফাই করেছিলাম। অনেক সময় ইজি গ্রুপে পড়েও কোয়ালিফাই করতে পারিনি। এটা কঠিন ফরম্যাট। কিন্তু ফেয়ার সুবিধা পাবে। সে দিক থেকে বলবো, এই ফরম্যাট যে কোনো দিক থেকেই সুবিধাজনক। আর বাংলাদেশ এখন আগের মতো নেই। আমার মনে হয় বাংলাদেশ আগের চেয়ে বড় দল। এই ফরম্যাটকে আমরা স্বাগত করছি। আমার মনে হয় আমরা এই ফরম্যাটে ভালো খেলেই পরের ধাপে কোয়ালিফাই করবো।

ব্যক্তিগত লক্ষ্য?

মুশফিক- লক্ষ্য তো সবারই থাকে। আমারও আছে। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। তখন যদি হয়ে যায় বুঝতে পারবেন কী লক্ষ্য ছিলো।

আপনার মতে এটাই কি বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বিশ্বকাপ দল?

মুশফিক- অভিজ্ঞতার কথা বললে বলবো যে, হ্যা অবশ্যই শক্তিশালী দল। হয়তো বা ওই রকম না হলেও আমার কাছে মনে হয় অন্যতম বড় দল। গত কয়েক বছরে খুব কাছে গিয়েও হেরে গিয়েছি। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা হয়তো বড় কিছু আমাদের জন্য রেখে দিয়েছেন।

(নাবা/২৮ এপ্রিল/এইচএ)