মহানায়কের প্রত্যাবর্তন

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি এক মহামানবের প্রতিক্ষায় বাঙ্গালী জাতি। কখন আসবেন তিনি। বিমানবন্দর এলাকায় ভিড় জমিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। তাকে স্বাগত জানাতে লোকে লোকারণ্য বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত। দীর্ঘ ৯ মাস ১৬ দিনের পাকিস্তানের কারাবাস শেষে  স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্সে যাবেন তিনি, সেই রেসকোর্স যেখান থেকে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যেখানে আত্মসমর্পন করে ১৬ই ডিসেম্বর। ১০ জানুয়ারি দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেন। তাঁকে ভালোবাসার আনন্দ অশ্রুতে বরণ করে নিল বাংলাদেশের আপামর জনগন। রেসকোর্স ময়দানও যেন তার প্রতীক্ষায় ছিল।
 ৯ মাস ১৬ দিন পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।
 বঙ্গবন্ধুর গাড়িবহর ধীরে ধীরে চলছিল রেসকোর্সের দিকে। বিকেল ৫টায় তিনি রেসকোর্সে ভাষণ দেন লক্ষ লক্ষ জনতার উদ্দেশ্যে। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে পেয়ে বাংলার মানুষ কেঁদেছিল আনন্দে। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব কাঁদলেন শিশুর মত। অশ্রুসিক্ত কন্ঠে তিনি বললেন, ‘স্মরণ করি আমার বাংলাদেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সিপাই, পুলিশ, জনগণকে, হিন্দু, মুসলমানকে যাদের কে হত্যা করা হয়েছে। তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা করে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমি আপনাদের কাছে দুই একটা কথা বলতে চাই।’ তিনি আবেগভরা কণ্ঠে বললেন, ‘‘বিশ্বকবি তুমি বলেছিলে ‘হে মুগ্ধ জননী, সাত কোটি সন্তানেরে রেখেছ বাঙাল করে মানুষ করনি।’ আজ কবিগুরু তোমার ধারনা ভুল প্রমানিত হয়েছে, তোমার বাঙ্গালী আজ মানুষ হয়েছে।  আজ ৭ কোটি বাঙালী যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছে। বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের ভাষণে জনতার উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি বাঙালী, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু এসে থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব। আমার বাঙালী জাতিকে অপমান করে যাব না। তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না এবং যাবার সময় বলে যাব, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালী আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান। বঙ্গবন্ধুর ওইদিনের  ৪০ মিনিটের ভাষণ স্বাধীন বাঙ্গালী জাতির জন্য এক নতুন দিক নির্দেশনা। কারন ঐ ভাষণে তিনি বাঙালির জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, কূটনীতি, অর্থনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি গণহত্যার অপরাধে পাকিস্তানের বিচার দাবি করেন।
তিনি আরও বললেন দেশ গড়ার কথা। বললেন, ‘আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ, আজ থেকে আমার হুকুম ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এই স্বাধীনতা পূর্ণ হবে না, যদি এ দেশের মা-বোনেরা ইজ্জত ও কাপড় না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণতা হবে না যদি এ দেশের মানুষ, যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।’…‘যথেষ্ট কাজ পড়ে রয়েছে। আপনারা জানেন, আমি সমস্ত জনগণকে চাই, যেখানে রাস্তা ভেঙ্গে গেছে, নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দাও। আমি চাই জমিতে যাও, ধান বোনাও, কর্মচারীদের বলে দেবার চাই, একজনও ঘুষ খাবেন না, আমি ক্ষমা করব না।’’ তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং চিরস্বাধীন থাকবে।’
৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু  প্রথমে লন্ডন যান। নিজের প্রটৌকল ভেঙ্গে সেদিন বঙ্গবন্ধুকে বহন করা গাড়ির দরজা খুলে দিয়েছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথ। সেখানে তিনি ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে ক্যারিজেস হোটেলে অবস্থান করেন। সেদিন দুপুরে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এক মুহূর্তের জন্য আামি বাংলাদেশের কথা ভুলিনি। আমি জানতাম ওরা আমাকে হত্যা করবে, আমি আপনাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাব না, কিন্তু আমার জনগণ মুক্তি অর্জন করবে।’ লন্ডন থেকে বিশেষ বিমানে ১০ জানুয়ারি সকালে বঙ্গবন্ধু ভারতের দিল্লিতে। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান এবং অভিনন্দিত করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও মন্ত্রীবৃন্দ। বঙ্গবন্ধু সেখানে ভারত, ভারতের জনগণকে বাংলাদেশের পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। বাংলাদেশের আসার পর ১২ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
সে সময়ের বিখ্যাত পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে একটি সংবাদ পরিবেশন করেছিল ১১ জানুয়ারি। সেখানে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কাছে ফেরার দৃশ্যগুলির বর্ণনা রয়েছে। টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, সেদিন জনসভা শেষ করে বঙ্গবন্ধু তাঁর ধানমন্ডির বাসায় ফিরলে আবেগঘন পুনর্মিলনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দুই মেয়েকে জড়িয়ে নেন বুকে। ৯০ বছর বয়সী পিতার পা ছুঁয়ে সালাম করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন শিশুর মতো। এ এক আবেগঘন মুহূর্ত। তখন জননেত্রী শেখ হাসিনা মা হয়েছেন। ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই জন্ম নিয়েছে বঙ্গবন্ধু পরিবারের নতুন সদস্য জয়, আমাদের প্রিয় নেতা সজীব ওয়াজেদ জয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ এক গুরুত্বপূর্ন অধ্যায়। কারন এদিন বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরলে বাংলাদেশের মানুষ অনুভব করে স্বাধীনতার পরিপূর্ণ সাধ। এর আগে দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু যাঁর নেতৃত্বে স্বাধীনতা পেয়েছি তিনি নেই। জাতির হৃদয়ে হাহাকার । এমন কি  বঙ্গবন্ধু জীবিত আছেন কি না তাও এ দেশের মানুষ জানে না। শুধু অনিশ্চয়তা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে বাংলার মানুষ। কখন বঙ্গবন্ধু ফিরবেন।  বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধুর থাকবে।
‘‘যতদিন রবে গঙ্গা, পদ্মা গৌরী বহমান
ততদিন তুমি অমর রবে শেখ মুজিবর রহমান।’’
 জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
বাংলাদেশের জয় হোক।
লেখক : ড. মোহাম্মদ হাসান খান; সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।