‘বিশ্বকাপে সাকিব আমাদের বড় প্রাপ্তি’

আট ম্যাচে ৬০৬ রান, ১১টি উইকেট। এবারের বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসান নিজেকে নিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। ব্যাটে-বলের ছন্দে ছাপিয়ে গেছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা অনেক ক্রিকেটারকে। এডাম গিলক্রিস্ট, জাভেদ মিয়াঁদাদ, মাহেলা জয়াবর্ধনে, শচীন টেন্ডুলকারদের মতো বিশ্বকাপ ইতিহাসের একজন তিনিও। তাই তো অন্য দেশের গ্রেটদের নয়, বরং নিজ দেশের রত্ন সাকিবকেই অনুসরণ করার কথা বলছেন সতীর্থ মোহাম্মদ মিঠুন।

দেশে ফিরে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করলেন মিঠুন। ভালো ক্রিকেট খেলেও প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির মেলবন্ধন করতে না পারার আক্ষেপে পুড়ছেন মিডল অর্ডার এই ব্যাটসম্যান।

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রত্যাশার মধ্যে প্রাপ্তির কতটা ফারাক মনে হয়?

প্রত্যাশা তো অনেক ছিল। যাওয়ার আগে সবাইকে জানিয়ে গিয়েছিলাম, সেমিফাইনালের স্বপ্ন নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু প্রাপ্তি তো প্রত্যাশার সঙ্গে মেলাতে পারলাম না। সেটা সবাই দেখেছেন। সবচেয়ে বড় কথা আমরা আমাদের লক্ষ্য পূরণ করতে পারিনি।

আপনার কি মনে হয় বড় মঞ্চে আমাদের মানসিক দুর্বলতা এখনো প্রখর?

আসলে আমার এটা মনে হয় না। কারণ বিশ্বকাপে আমাদের পুরো পারফরম্যান্স দেখুন আমরা কিন্তু অতটাও খারাপ খেলিনি। আমরা শেষ ম্যাচটা ছাড়া বাকি সব ম্যাচেই ভালো ক্রিকেট খেলেছি। হয়তো দলের সবাই একসঙ্গে কিক করেনি। কিন্তু আমরা ভালো দলের মতোই খেলেছি। ফলাফল হয়তো আমাদের পক্ষে আসেনি। কিছু কিছু ছোটখাটো জিনিস যদি আমাদের পক্ষে আসত তাহলে বিষয়টা অন্যরকমও  হতে পারত। তার মধ্যে বৃষ্টির একটা প্রভাব ছিল। আমরা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি খেলতে পারিনি। বিশ্বকাপে মোট আটটি ম্যাচ খেলেছি। তার মধ্যে শুধু তিনটিতে জিতলেও সাতটিতেই আমরা ভালো খেলেছি। শুধু পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি আমরা দল হিসেবে খেলতে পারিনি।

ভালো খেলার কথা বললেন, তাহলে কি মনে হয় দল হিসেবে সেমিতেই বাংলাদেশের পজিশন ছিল?

আমরা সেমিফাইনালের স্বপ্ন নিয়েই বিশ্বকাপে গিয়েছিলাম। সবার মধ্যে সেই বিশ্বাসও ছিল। সবাই নিজেদের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করেছে। বিষয়টি হচ্ছে বিশ্বকাপের মতো জায়গায় সব দলই শক্তিশালী। এমন না যে গ্রুপ পর্বে দুই তিনটা ম্যাচ জিতেই কোয়ার্টার বা সেমিফাইনাল খেলব। এমন না যে এক-দুইটা দল দুর্বল পাব। এখানে প্রতিটি দলই শক্তিশালী। আমি বলব এই ফরম্যাটে জয়টাই অনেক বড়।

ব্যর্থতার পেছনে ত্রুটি টা কী মনে হয়?

ওই ভাবে আসলে ত্রুটি বের করা যায় না। আমার মনে হয়, যেই ফলাফলটা এসেছে সেটাও সবার কারণেই হয়েছে। আবার যা ভালো হয়েছে সেটাও সবার অবদানেই হয়েছে। ভালো দিকগুলো যেমন সবাইকে মেনে নিতে হবে ভালো দিকগুলোও মেনে নিতে হবে। ব্যর্থতার জন্য আমাদের সবারই খারাপ লাগছে। কিন্তু মেনে নেওয়া ছাড়া এখন আর কিছু করার নেই। নিজেদের ভুলগুলো বের করে সামনের দিকে আগাতে হবে। নতুনভাবে ভাবতে হবে।

নিজের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে ব্যক্তিগতভাবে কী শিক্ষা নিলেন?

দেখুন, বিশ্বকাপের আগে তো স্বপ্ন অনেক ছিল। সেমিফাইনালে যাব এই আশা ছিল। যদিও হয়নি তা। সব ম্যাচ খেলার সুযোগও হয়নি আমার। প্রথম কয়েকটা ম্যাচ খেলেছি। তারপর যে ভুল শুধরে নিজেকে প্রমাণ করব সেই সুযোগ আর আসেনি। এটা অবশ্যই যে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। অনেক কিছু শিখেছি। সামনে নিজেকে প্রস্তুত করার আরো জায়গা আছে। সেখানে ভুলগুলো শুধরে আমায় বের হতে হবে। সেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। চেষ্টা করব নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে। বাকিটা দেখা যাক।

সামনে লঙ্কা সফর ভুল শুধরে কাম ব্যাক করার ভাবনা কী?

সেই চিন্তা অবশ্যই আছে। আমি এরই মধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছি। নিজের ভুলগুলো বের করছি। শ্রীলঙ্কা সফরের আগে চেষ্টা করব সেইগুলো নিয়ে কাজ করতে। আমি আগামী সফরের জন্য আবার নতুনভাবে তৈরি হতে চাই। সুযোগ পেলে নতুনভাবে সব শুরু করতে চাই।

বিশ্বকাপে সাকিবকে দেখে কতটা শিক্ষা নিয়েছেন?

বিশ্বকাপ বলেন আর আন্তর্জাতিক ম্যাচ বলেন, সব সময়ই ভালো ব্যাটসম্যানদের অনুসরণ করি। আর তাদের মধ্যে একজন আমাদের সাকিব ভাই। বিশেষ করে উনার কথা বলতেই হয়। এবারের টুর্নামেন্টে উনি যেভাবে খেলেছেন বিশ্বক্রিকেটে কারো আর তেমন রেকর্ড নেই। বোলিং-ব্যাটিং সব মিলিয়ে অনন্য সাকিব ভাই। উনাকে কাছ থেকে দেখা আমাদের সৌভাগ্য। উনার মতো একজনের সঙ্গে ড্রেসিং রুম অনেক উপভোগ করেছি। আমি মনে করি, এবারের বিশ্বকাপে সাকিব আমাদের বড় প্রাপ্তি।

সাকিবের শিক্ষা রপ্ত করার চেষ্টা কতটুকু?

আমি সেটাই বলতে চাইছি। আমাদের বাইরের দেশে তাকানোর দরকার নেই। আমরা সবাই যদি সাকিব ভাইকে অনুসরণ করি তাহলেও অনেক কিছু শিখতে পারব। শুধু সাকিব ভাই কেন, আমাদের দেশে অনেকেই আছেন যারা বিশ্বক্রিকেটে নিজেদের একটা ভালো অবস্থা তৈরি করেছেন। ভালো কিছু করতে গেলে আগে অবশ্যই উনাদের পরামর্শ নিই। কীভাবে নিজের উন্নতি করব, কীভাবে সামনে এগিয়ে যাব তাদের থেকে পরামর্শ নিই। খারাপ সময়গুলোতেও তাদের সাহস নিই।

প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছেন, খারাপ-ভালো অনেক কিছুই ছিল, সব মিলিয়ে প্রথম বিশ্বকাপের আপনার সেরা মুহূর্ত কী ছিল?

ওই রকম ভাবে বিশ্বকাপের নিজের সেরা মুহূর্ত বলা কঠিন। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচে জিতলেই খুব ভালো লাগে। তিনটি ম্যাচ জিতেছি তিনটিতেই একই রকম অনুভূতি ছিল। আমি মনে করি, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে জয়ের অনুভূতির চেয়ে বিশেষ আর কিছু নেই। সব জয়ই বিশেষ।

শেষ ম্যাচের পর দলের অবস্থা কেমন ছিল?

সবার আশা ছিল শেষ ম্যাচটা জেতা। জিতলে আমরা পঞ্চম অবস্থানে থেকে বিশ্বকাপ শেষ করতে পারতাম। যেটা আমাদের জন্য ভালো লাগার হতো। সবার ইচ্ছেও ছিল তাই, শেষ ম্যাচটা নিয়ে আমরা খুব আশা করেছিলাম। সবার প্রত্যয় ছিল, যে করেই হোক পাকিস্তানকে হারাবো। কিন্তু খেলায়তো হার-জিত থাকেই। আর পাকিস্তানও ভালো দল। শেষ পর্যন্ত আমাদের লক্ষ্য আর পূরণ হয়নি। আর হারলে স্বাভাবিক সবার মন খারাপ থাকে। আরো বাদ পড়ার একটা তাড়না ছিল। সব মিলিয়ে সবাই হতাশ ছিল। কিন্তু দিন শেষে মেনে নিতে হয়। এখন আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে এটাই বড় কথা। সামনের সিরিজ নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। সাফল্যের পথ বের করতে হবে।

(নাবা/১১ জুলাই/হিমু)