বাংলার জনগণ ও বঙ্গবন্ধু

ছবি: সংগ্রহীত।
আমি আজ আমার না দেখা সেই পিতার কথা বলছি, যে পিতা শহীদের জন্য, বীরাঙ্গনাদের জন্য, যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, বাংলার জনগনের জন্য অশ্রুবিসর্জন করতেন। মাথায় রাখতেন স্নেহের স্পর্শ। নিজের পরিবার নয় বাংলার জনগনই ছিল তার পরিবার। কারন তিনি জানতেন, তাকে তার দেশের মানুষ উপহার দিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি জনতেন, বাংলার জনগন তার ডাকে সারা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। কত ত্যাগ সংগ্রামে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। তিনি ৭১ এর কত পিতৃহীন পরিবারের আশ্রয়, বীরাঙ্গনাদের মা বলে ডাকতেন। তাদের কে দিয়ে ছিলেন পিতৃ পরিচয়। যাদের কাছে গেলে তার বজ্র কন্ঠ হয়ে যেত বেদনা ময়। জনগনের সামনে কন্ঠে নেমে আসত আবেগ, ভালবাসা। আমার সেই না দেখা পিতা আর কেউ নন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবুর রহমান।
৭৫ এ আমার পিতা চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশের উপর বয়ে যায় এক বিভীষিকাময় ঝড়। সামরীক সৈরাচারী শাষকের পদাঘাতে লুন্ঠিত হল আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনা। নির্যাতিত হল মুক্তিযোদ্ধারা, আর স্বাধীনতারপক্ষের শক্তি। রাজাকার পেল ক্ষমতা।
যেসব পিশাচের দল বঙ্গগবন্ধুকে জাতির পিতা মানতে দ্বীধা করে, ৭৫ এর পর যারা নানা ভাবে ইতিহাস বিকৃত করেছে তারা কি পেরেছে বঙ্গবন্ধুকে বাংলার জনগনের মন থেকে মুছে দিতে ? বাংলাদেশ, বাঙ্গালী আর বঙ্গবন্ধু এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর কাছে বাংলার জনগনই ছিল পরিবার। সাধারণ মানুষকে পরিবারের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। এ কারণেই তিনি ১৯৭২ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আগের দিন পরিবারের কাছে ছুটে যাননি, তিনি আগে গিয়েছিলেন তাঁর জনগণের কাছে। জনমানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু। জনগন তার বিকল্প খুঁজে পেলনা, আদরের শেখ সাহেব হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু।
পৃথিবীর আর কোনও নেতা তাদের জনগণের ছিলেন কিনা তা আমার জানা নেই। সাধারণ মানুষ, দলের নেতাকর্মী যারাই তাঁর কাছে যেতেন বঙ্গবন্ধু তাদেরকেই সাদরে গ্রহণ করতেন। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার মানুষের নাম তিনি মনে রাখতে পারতেন। তাঁর এমনি স্মরণশক্তি ছিল, একবার যাকে দেখতেন তাকে আর ভুলতেন না। এমন কি গ্রামে-গঞ্জের কর্মীদের নাম-পরিচয়ও তিনি ভুলতেন না। কারন তিনি যে বাংলার জনগনের মাথার উপর বটবৃক্ষ ছিলেন। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ এক স্মৃতি চারণে বলেন , ‘‘বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর প্রথম দেখা হয় ১৯৬৪ সালে। ভিড়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রথমবার পরিচিত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁকে মনে রেখেছিলেন। বছর তিনেক পর বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর আবার দেখা হয়। তিনি ভাবেননি বঙ্গবন্ধু তাঁকে চিনতে পারবেন। অথচ বঙ্গবন্ধু তাঁকে দেখে নাম ধরে ডেকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। শুধু মহামান্য রাষ্ট্রপতির ছাত্র জীবনের এমন ঘটনা একটি নয়, অসংখ্য ঘটনা এমন আরো রয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জে থেকে কেউ এলেও বঙ্গবন্ধু ওই গ্রামেরই কারো কারো নাম ধরে ধরে তাদের খোঁজখবর নিতেন।
বঙ্গবন্ধু নিজেকে নিয়ে চিন্তা করতেন না। চিন্তা করতেন দেশ ও দেশের মানুষের অধিকার নিয়ে। ক্ষমতার চিন্তা বঙ্গবন্ধুর ছিল না। তাই তো তিনি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে দৃঢ়কণ্ঠে বলতে পেরেছেন, ‘‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, বাংলার মানুষের অধিকার চাই।  প্রধানমন্ত্রী আসে এবং যায়। কিন্তু, যে ভালোবাসা ও সম্মান দেশবাসী আমাকে দিয়েছেন, তা আমি সারাজীবন মনে রাখবো। একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠেই এমনভাবে জনগণকে নিঃসার্থভাবে ভালোবাসার কথা বলা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রীত্বের লোভ দেখিয়ে আমাকে নিতে পারেনি, ফাঁসীর কাষ্ঠে ঝুলিয়ে নিতে পারেনি। আপনারা রক্ত দিয়ে আমাকে ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন। সেদিন এই রেসকোর্সে আমি বলেছিলাম, রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়ে শোধ করবো; মনে আছে ? আজো আমি রক্ত দিয়েই রক্তের ঋণ শোধ করতে প্রস্তুত।’’ হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালির আর কোন নেতা  এমন করে গণমানুষের কথা ভেবেছেন ?
একবার একজন বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনার শক্তি কী ?’ বঙ্গবন্ধু উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি’। সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার দুর্বলতা কী ?’। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি আমার জনগণকে খুব বেশি ভালোবাসি’। কেবল জনগণের সাথে দূরত্ব তৈরি হবে বলে তিনি স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও বঙ্গভবনে যাননি। বঙ্গবন্ধু ভাবতেন বঙ্গভবনে গেলে কঠিন নিরাপত্তার বেষ্টনির কারণে সাধারণ মানুষ তাঁর কাছে যেতে পারবেন না। তিনি কোনো ভাবেই সাধারণ মানুষ থেকে দূরে থাকতে চাননি। তাঁর নিরাপত্তার জন্যে হলেও বঙ্গভবনে যাওয়া উচিত- মিত্ররাষ্ট্র ভারতের পক্ষ থেকেও এ কথা বলা হয়েছিলো বারবার। কিন্তু বঙ্গবন্ধু রাজি হননি। ভারতীয় মেজর জেনারেল সুজান সিং উবান ‘ফ্যান্টমস অব চিটাগং’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘‘এবারও আমি লক্ষ্য করলাম, তার বাসায় কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। সব রকমের মানুষ সময়-অসময়ে যখন-তখন এসে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার চাইতো। তার সঙ্গে দেখা করতে আসা লোকদের কোনো বাছ-বিচার নেই। এ কথা তুলতেই তিনি বললেন, “আমি জাতির জনক, দিন বা রাতে কোনো সময়েই তো আমি আমার দরজা বন্ধ করে দিতে পারি না।” আমৃত্যুই বঙ্গবন্ধু হৃদয়ের দরোজা সাধারণ মানুষের জন্যে খোলা ছিলো। এক বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘সাত কোটি বাঙ্গালির ভালোবাসার কাঙ্গাল আমি। আমি সব হারাতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারব না।’
তিনি যখন বক্তব্যও দিতেন তখন সচেতনভাবেই ‘আমি’ শব্দটির পরিবর্তে ‘আমরা’ শব্দটি বেশি ব্যবহার করতেন। বঙ্গবন্ধুর এই আমরা’র মানে হলো তিনি ও এদেশের জনগণ। তাঁর যে কোনো নির্দেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করতো সাধারণ মানুষ। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন বলেছেন, ‘আজ থেকে কোর্ট-কাচারী, হাইকোর্ট, সুপ্রীম কোর্ট, অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহ অনির্দিষ্ট-কালের জন্য বন্ধ থাকবে। কোন কর্মচারী অফিস যাবেন না।’’ সাধারণ মানুষ তাঁর কথা মেনে নিয়ে সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে একই ভাষণে সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সীমাহীন দরদও ফুটে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু ওই ভাষণে বলেছেন, ‘গরীবের যাতে কষ্ট না হয় তার জন্য রিক্সা চলবে।’ চাকুরিজীবীদের মাসের নির্ধারিত সময়ে গিয়ে বেতন আনার নির্দেশও দেন তিনি। আক্ষরিক অর্থে ৭ মার্চের দিন থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তান পরিচালিত হয়েছিলা। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন। একাত্তরে বাঙালিরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে এবং যার যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ত্রিশ লক্ষ শহিদ, দু লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলার মানুষ বহুল কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা অর্জন করে।
বঙ্গবন্ধু শাসকদের ক্ষমতায় নয়, জনগণের ক্ষমতায় আজীবন বিশ^াসী ছিলেন। তাঁর সরকারের আমলে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে লেখা হয়েছে; ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীনের পর এ দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি সেই সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখতেন, যে দেশের সাধারণ মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত ভাবে বসবাস করবে। তাদের সকল নাগরিক অধিকার সুনিশ্চিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক হবে বাংলাদেশ। খাদ্যে-বস্ত্রে-চিকিৎসাসহ সবক্ষেত্রে বাংলাদেশ সমৃদ্ধশালি হবে। বাংলাদেশের নাগরিক পৃথিবীতে মর্যাদাবান নাগরিক হিসেবে পরিচিত হবে। বঙ্গবন্ধু বলতেন, এই স্বাধীন দেশে মানুষ যখন পেট ভরে খেতে পাবে, পাবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন; তখনই শুধু এই লাখো শহীদের আত্মা তৃপ্তি পাবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে বঙ্গবন্ধু খুব দ্রুতই দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। কিন্তু ১৫ আগস্টের কাল রাতে জাতির জনককে হত্যা করা হলে বাঙালির সোনার বাংলার স্বপ্ন অধরা রয়ে যায়। পঁচাত্তরের পর পাকিস্তানি প্রেতাত্মার ভর করে বাংলাদেশের ওপর। মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়, পিছিয়ে পড়তে থাকে বাংলাদেশ। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর আবারো জাতির জনকের সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়। বর্তমানে সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা এখন সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে টানা তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে সোনার বাংলাকে আজ উন্নত দেশে রূপান্তর করছেন, জনগন শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধুর মতই ভালবাসেন, আমি এবং বাংলার জনগন চায় বঙ্গবন্ধুকন্যা আমৃত্যু প্রধানমন্ত্রী থাকবে।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে পঁচাত্তরের পর শত চক্রান্ত করেও কুচক্রি মহল মুছে দিতে পারেনি। বরং ষড়যন্ত্রকারীরাই হারিয়ে গেছে। প্রতিটি বাঙালির মনেপ্রাণে অজেয় মৃত্যুঞ্জয় বঙ্গবন্ধু ছিলেন, আছেন, থাকবেন আমৃত্যু। বাংলার আপামর সাধারণ মানুষই তাঁকে হৃদয়ের সিংহাসনে বাঁচিয়ে রাখবে হাজার হাজার বছর। বীরের নাম রয়ে যায় যুগ থেকে যুগে। কাপুরুষের নাম যেনে নিতে হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। পিতা তুমি যেখানেই থাকো সোনার বাংলার প্রতিটি ধুলিকনা থেকে ঠিক চিনে নেবো, তোমাকে, তুলে নেবো তোমার প্রাপ্য উপহার।
জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক: অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান

লেখক : অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান; সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।