বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন

ছবি: সংগ্রহীত।
আমাদের ভাষা বেঁচে থাকে আমাদের লেখায়, কথায় ও পড়ায়। আর আমরা বেঁচে থাকি আমাদের ভাষায়। আমরা বড় সৌভাগ্যবান আমাদের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। ‘‘বিনা স্বদেশী ভাষা মেটে কি আশা ?’’ আমার দু:খিনী বর্ণমালা অনেক বন্ধুর পথ বেয়ে আজ উজ্জল নক্ষত্রের মত জ্বলজ্বল
করছে।
১৯৪৮ এর এক সকাল, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এলেন পূর্বপাকিস্তানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোষণা করলেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ছাত্ররা প্রতিবাদ করে। সেই থেকে ভাষা আন্দোলনের সুত্রপাত। আর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে আর একজন মহানায়কের  নামও যুক্ত হয়, তিনি বঙ্গবন্ধু। তাকে আমরা জাতির জনক হিসেবে জানি, কিন্তু অনেকেই হয়ত জানেন না, তিনি প্রথমে একজন ভাষা সৈনিক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘‘আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া, তাই নিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ।’’
সেই সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের তরুন ছাত্র শেখ মুজিব ভাষা অন্দোলনের একজন কর্মী ও সংগঠক। তার ভাষার বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গঠিত হওয়া তমুদ্দীন মজলিসের সাথে সম্পৃক্ততা  দিয়ে। আবার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কর্মকান্ডেও তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বাংলা ভাষার দাবির সপক্ষে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচিতে যুক্ত থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজও করেন। বাংলা ভাষার দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমান মিছিল-মিটিং করেছেন, অনেক মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং অনেক সমাবেশের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা করেছেন। ভাষা প্রেমে বলীয়ান মুজিব ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর বাংলা ভাষার দাবি নিয়ে খাজা নাজিমুদ্দীনের বাসভবনের অভিমুখে যাওয়া মিছিলের নেতৃত্ব দেন। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। ওই ধর্মঘটে অংশ নিতে শেখ মুজিব ১০ মার্চ গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন। পরেরদিন ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন। পুলিশ সকাল নয়টায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। কয়েকদিন পরেই তিনি মুক্তি লাভ করেন। জেল থেকে মুক্ত হয়ে ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাধারণ সভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এর পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলন নিয়ে হওয়া প্রায় সবকটি সভা, মিছিল, মিটিংয়ে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ফলে ১৯৪৯ সালে তিনি আরো দুবার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হলে তাঁকে ১৯৫২ সালের পূর্বে আর মুক্তি দেওয়া হয়নি। ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের পর জেল থেকে ছাড়া পান। যার কারণে তিনি বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেননি। কিন্তু তিনি জেলে থেকে ভাষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং আন্দোলনকে সক্রিয় করতে পরামর্শ দিতেন। ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহম্মদ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন। মওলানা ভাসানী শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহম্মদের মুক্তির দাবিতে পত্রিকায় বিবৃতি প্রদান করেন।
এর আগে ১৯৪৭ সালে করাচিতে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের ঘোষণাপত্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে সুপারিশ করা হয়। সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে নানা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে পাকিস্তান সরকার। একই সাথে সরকার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করলে ১৯৪৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বাংলা ভাষার দাবিতে সভা সমাবেশ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ’৪৭ সালের ৬-৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক যুবলীগের কর্মীসভায় ভাষাবিষয়ক কয়েকটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা’ গ্রন্থে গাজীউল হক এ ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। সেদিন সবার উদ্দেশ্যে শেখ মুজিব বলেছেন : ‘‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’’ কর্মী সম্মেলনে এই প্রস্তাব থেকে বোঝা যায় যে, ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমান সোচ্চার ছিলেন এবং এ আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রেখেছেন।
অন্যদিকে বাঙ্গালির আরেক জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রথমে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন। তিনি প্রথমদিকে রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষপাতি ছিলেন না। শেখ মুজিবুর রহমানের চেষ্টায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেষ পর্যন্ত তাঁর মত পরিবর্তন করেন। শেখ মুজিব শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে দেখা করে রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। সোহরাওয়ার্দী পরবর্তীতে উর্দুর পক্ষে দেওয়া বিবৃতি প্রত্যাহার করে বাংলা ভাষার পক্ষে বিবৃতি প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জবানীতে এই ঘটনার বিবরণ পাই। তিনি বলেছেন, ‘সে সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাষা সংক্রান্ত বিবৃতির প্রকাশিত হওয়ার পর আমরা বেশ অসুবিধায় পড়ি। তাই ওই বছর জুন মাসে আমি তাঁর সাথে দেখা করার জন্য করাচি যাই এবং তাঁর কাছে পরিস্থিতি ব্যখ্যা করে বাংলার দাবির সমর্থনে তাঁকে বিবৃতি দিতে বলি।’ রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার সমর্থনে সোহরাওয়ার্দীর দেওয়া ওই বিবৃতিটি ২৯ জুন ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়। এটিও ভাষা আন্দোলনের একটি বিশেষ ঘটনা ছিলো। ১৯৫৩ সালে ভাষা শহীদদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শেখ মুজিব উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
‘দুই’
১৯৫৪ সালে তিনি যুক্তফন্টের মন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালের আইন পরিষদের অধিবেশনে সংসদের কার্যসূচি বাংলায় লিপিবদ্ধ করার আহ্বান জানান। একই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি তারিখের অধিবেশনে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন, ‘আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সকল সরকারি অফিস আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু হবে।’ ১৯৭২ সালে দেশের প্রথম সংবিধান রচনা করা হয়। এই সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৭৪ সালে ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশনে তিনি বাংলায় ভাষন দেন। তিনি ওই বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, মাননীয় সভাপতি, আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগিদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন।’’ পৃথিবীর দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দ স্বদেশের ভাষাপ্রীতি দেখে বিস্মিত হয়েছেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিনন্দিত করেছেন। এর বহু আগেও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। ১৯৫২ সালে চীনে আয়োজিত আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে তিঁনি বাংলায় বক্তব্য রাখেন।
১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ অফিস-আদালতে বাংলা ব্যবহারের নির্দেশ জারি করেন। ওই আদেশে বলা হয়, দেশ স্বাধীনের দীর্ঘ তিন বছর পরেও বাংলাদেশের বাঙালি কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় নথি লিখবেন সেটা অসহনীয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার বাস্তবায়ন চাইতেন।
ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে এম আর মাহবুব রচিত ‘রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ গ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল-তা বিস্তারিতভাবে এই গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে। যারা বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে চান তারা গ্রন্থটি পড়তে পারেন।
বঙ্গবন্ধুর স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। তিনি তাঁর প্রতিটি বক্তব্যে জয় বাংলা বলতেন। স্বাধীনতাকামী প্রতিটি মানুষের স্লোগান ছিল জয় বাংলা। এই জয় বাংলা মানে হল বাংলাদেশের জয় হোক, জয় বাংলা মানে হল বাংলা ভাষার জয় হোক, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জয় হোক। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি প্রথম বইমেলা উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমীতে।  জাতির জনক এর মত তাঁর কন্যা জননেত্রী ও দেশরত্ন শেখ হাসিনাও বাংলাদেশ ও বাংলাভাষা কে ভালবাসেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর সালে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলা এখন একটি আন্তজার্তিক ভাষা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা দশমবার বাংলা ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন। সেই সঙ্গে সর্বাধিক ২১ শের বইমেলা উদ্বোধনকারী রাষ্ট্রনায়ক। সিয়েরালিওন তাদের নিজস্বভাষার পাশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছে। তাদের একটি বাংলা টিভি চ্যানেলও রয়েছে।  আমার বিশ্বাস, হাসুবুবুর  হাত ধরেই  বাংলা ভাষার ক্রম উন্নতি হবে। সবাই শুদ্ধ বাংলায় কথা বলবে। শিশুদের আধুনিক পদ্ধতিতে বাংলা বর্ণমালা শেখানো হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভুল বাংলার ব্যবহার বন্ধ হবে। আমাদের ভাষা বিশ্ববাসীর কাছে একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে পরিচিতি পাবে। সেই দিন আর বেশি দূরে নয়।
ভাষার মাসে শ্রদ্ধাভরে জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করছি। আসুন আমরা বাংলা ভাষা ও সংষ্কৃতির শুদ্ধ চর্চা করি। আমাদের চিন্তা চেতনা, শিক্ষা পোশাকে, জীবনদর্শনে বাঙ্গালীয়ানার চর্চা করি। ধর্মন্ধতা নয়, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের কাছে আমাদের কিছুটা হলেও ঋন পরিশোধ করি।
লেখক, অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান
লেখক : অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান; সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা শাখা।