বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে শেখ হাসিনা

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙ্গালি জাতির জনক এবং সাধারণ মেহনতি মানুষের সবচাইতে প্রিয় নেতা। তাঁর মেয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মানসকন্যা এবং উন্নয়নশীল সমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার। বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালিদের সাহসী জাতি হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আর বঙ্গকন্যা শেখ হাসিনা পৃথিবীর কাছে এই দেশকে পরিচয় করে দিয়েছেন সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় একটি রাষ্ট্র হিসেবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বঙ্গবন্ধুর মধ্যে যেসব গুণ ছিল সেসব গুণের অধিকাংশই তাঁর কন্যার মধ্যে উপস্থিত রয়েছে। বিংশ শতাব্দিতে বিশ্ববাসীর কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সফল ও অনুসরণীয় নেতা। আর একবিংশ শতাব্দিতে শেখ হাসিনা বিশ্বের অন্যতম সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সার্বিকভাবে। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর অতি আদরের কন্যা শেখ হাসিনার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ২৮ বছর অর্থাৎ প্রায় তিনযুগ শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর আদর-স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছেন। মেয়ে হিসেবে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে খুব কাজ থেকে দেখেছেন। তিনি ব্যক্তি শেখ মুজিবকে যেমনি দেখেছেন, তেমনি দেখেছেন জননেতা শেখ মুজিবকেও। ফলে বঙ্গবন্ধুর কর্মকান্ড, রাষ্ট্রচিন্তা এবং সমাজচিন্তা সম্পর্কে শেখ হাসিনা স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই বর্তমানে তাঁর দেশ পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণের বিষয়ে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি। অনেকে তাই শেখ হাসিনাকে বলেন, ‘যোগ্য বাবার যোগ্য মেয়ে’। আমাদেরও সৌভাগ্য অনেক। আমরা বঙ্গবন্ধুর মত মহান নেতার কন্যাকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীরূপে পেয়েছি। কারণ তিনি না থাকলে আজ বাংলাদেশ এতদূর উন্নতির দিকে এগুতে পারতো না। দেশের সার্বিকক্ষেত্রে এত উন্নতিও হতো না।

বঙ্গবন্ধুর প্রথম সন্তান ছিলেন শেখ হাসিনা। শেখ মুজিব ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব তাঁকে আদর করে ডাকতেন ‘হাসু’। আর শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুকে ডাকতেন ‘আব্বা’ বলে। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের তিনভাগের একভাগ সময় জেলে জেলে কাটিয়েছেন। দেশের কাজ করতে গিয়ে তিনি পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারেননি। সে কথা তিনি নিজেও বুঝতে পারতেন। কিন্তু সবার আগে যে দেশ। তাই তাঁর করার কিছু ছিল না। তিনি লিখেছেন, ‘ছেলেমেয়েদের জন্য যেন একটু বেশি মায়া হয়ে উঠেছিল। ওদের ছেড়ে যেতে মন চায় না, তবুও তো যেতে হবে। দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে।’ শেখ হাসিনা যখন হাঁটতে শিখেন তখন বঙ্গবন্ধু জেলে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ১১৮ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘রেণু তখন হাসিনাকে নিয়ে বাড়িতেই থাকে। হাসিনা তখন একটু হাঁটতে শিখেছে।’ পরিবারকে সময় না দিতে পারার বিষয়টি বঙ্গবন্ধুকে খুব দুঃখ দিত। তাঁর বড় ছেলে কামালের জন্ম হলে তিনি তাঁকে ভাল করে ঐ সময় দেখতেও পারেননি। শেখ হাসিনা বাবাকে কম কাছে পেতেন বলে বঙ্গবন্ধু বাড়িতে এলে তাঁকে হাতছাড়া করতে চাইতেন না। বঙ্গবন্ধু নিজেই স্মৃতিচারণে বলেছেন, ‘হাসিনা তো আমাকে পেলে ছাড়তেই চায় না।’ আবার অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ১৮৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘এক বৎসর পরে আজ ওদের সাথে আমার দেখা। হাসিনা আমার গলা ধরল আর ছাড়তে চায় না।’ শুধু তাই নয়, শেখ মুজিব বাড়িতে এলে কন্যা হাসিনা তাঁকে আর ঢাকা যেতে দিতে চায় না। জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ‘স্মৃতির দখিন দুয়ার’ লেখায় লিখেছেন, ‘আমার বাবা যখনই সময় ও সুযোগ পেতেন একবার বাড়ি এলে আমরা কিছুতেই তাঁকে ছেড়ে নড়তাম না। বাবার কোলে বসে গল্প শোনা, তাঁর সঙ্গে খাওয়া, আমার শৈশবে যতটুকু পেয়েছি তা মনে হতো অনেকখানি।’ কিন্তু শেখ মুজিবকে আবার দেশের কাজে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু দিনে চলে গেলে শিশু হাসিনা কাঁদতো। তাই তিনি রাতে চলে যেতেন। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘রাতে রওয়ানা করে এলাম, দিনের বেলায় আসলে হাসিনা কাঁদবে।’

আর দশজন সন্তানের মত পিতার অনুকরণ করতেন শেখ হাসিনা। ভাষা আন্দোলনের সময় ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন বলে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে গণমানুষের চাপের মুখে বঙ্গবন্ধু ও অন্য বন্দীদের মুক্তি দেয়া হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু বাড়িতে এলে শেখ হাসিনা তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘‘আব্বা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই।’’ বয়সে ছোট হলেও ঐ সময়কার জ্বালাময়ী স্লোগান শিশু হাসিনার মুখস্থ ছিল। বাড়িতে প্রায়ই রাজনৈতিক মিটিং বসতো। কিশোরী বয়সে শেখ হাসিনা জানালার পাশে বসে মিটিংয়ের কথা শুনতেন। অনেকসময় তিনি সবার জন্য চা বানিয়ে দিতেন। শেখ হাসিনার স্মৃতিকথা : ‘১৯৬৬ সালের কথা মনে আছে। কয়েকদিন ধরে আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী কমিটির সভা চলছিল। আমার তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। …..কিন্তু পড়ব কি! মিটিং চলছে বাড়িতে, মন পড়ে থাকে সেখানে। একবার পড়তে বসি আবার ছুটে এসে জানালার পাশে বসে মিটিং শুনি। সবাইকে চা বানিয়ে দিই।’ শেখ হাসিনা ১৯৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৭০-এর নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত এবং স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকান্ড দেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর সুখ-দুঃখের ভাগিদার হয়েছেন। শেখ হাসিনা দেখেছেন তাঁর পিতার প্রতি সাধারণ মানুষের আত্মীয়সুলভ টান। বিভিন্ন আন্দোলনে ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়িতে সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের ঢল নামতো। শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘অসহযোগ আন্দোলনের সময় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এসে আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে যেত। আব্বা কখনও গেটে পাশে চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে, কখনও বাড়ির বারান্দার ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতেন। আমরা আব্বার পাশে এসে দাঁড়াতাম, হাজার হাজার মানুষের ঢল নামত তখন এ বাড়ির সামনে।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে গল্প, আলাপ, আলোচনা করতেন। অনেক রাত পর্যন্ত জনসভার গল্প বলতেন। এমন রাজনৈতিক আলোচনা শুনে শুনে তিনি সমৃদ্ধ হতেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এমনটাই হত।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হলেন। ঐ সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় তাঁরা প্রাণে বেঁচে গেলেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার দেশে আসার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। তা সত্ত্বে ও ১৯৮১ সালে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। তাঁর ইচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর খুনিদের বিচার করা। তখনকার সংগ্রামমুখর দিনে শেখ হাসিনার বড় শক্তি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং রাজনৈতিক শিক্ষা। কখনো কখনো ভুলে যেতেন তাঁর পিতা যে বেঁচে নেই। তাই স্বপ্নে শেখ হাসিনা দেখেন, ‘অনেক রাত হবে। দোতলায় মায়ের ঘরে খাটে আমরা সবাই। মা, আব্বা, ভাই-বোন কেউ শুয়ে কেউ বসে খুব গল্প করছি। আব্বাও অনেক কথা বলছেন, আমরা শুনছি। সেই আগের মতো ৩২ নং বাড়িটায় সবাই আছি।…হঠাৎ টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। বুঝে উঠতে কিছুটা সময় লাগল যে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম।’

বঙ্গবন্ধুর মত পিতা এবং পরিবারকে অকালে হারিয়েছেন শেখ হাসিনা। পৃথিবীর অন্যান্য সন্তানদের মত তিনি পিতা স্নেহ ভালোবাসার অভাব অনুভব করেন। কারণ বাবা-মায়ের অভাব কখনও পূরণ হবার নয়। ১৯৯১ সালে ১৩ আগস্টের লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ রচনায় বাবা ডাকার আকুলতা আমরা দেখতে পাই। শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘যেদিন কামাল আব্বাকে ‘আব্বা’ ডাকার অনুমতি চেয়েছিল, আমি সঙ্গে সঙ্গে ওকে আব্বার কাছে নিয়ে যাই। আব্বাকে ওর কথা বলি। আব্বা ওকে কোলে তুলে নিয়ে অনেক আদর করেন। আজ আর তারা কেউই বেঁচে নেই – আজ যে বার বার আমার মন আব্বাকে ডাকার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।’

বঙ্গবন্ধু শেষ জীবন গ্রামে কাটাতে চেয়েছিলেন। সেই ইচ্ছার কথাও তিনি শেখ হাসিনাকে বলেছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর কন্যাকে প্রায়ই বলতেন, ‘শেষজীবনে আমি গ্রামে থাকব। তুই আমাকে দেখবি। আমি তোর কাছেই থাকব।’ বঙ্গবন্ধুর মত শেখ হাসিনাও তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলি তাঁর গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় কাটাতে চান। তিনি বলেছেন, ‘আমার জীবনের শেষ দিনগুলো আমি টুঙ্গিপাড়ায় স্থায়ীভাবে কাটাতে চাই। খুব ইচ্ছে আছে নদীর ধারে একটা ঘর তৈরি করার।’

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকান্ড দেখার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা বেড়ে উঠেছিলেন। শৈশব থেকে দেখেছেন বঙ্গবন্ধু অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। শেখ হাসিনা তাঁর পিতাকে গ্রেফতার হয়ে দেখেছেন, জেলজুলুম সহ্য করতে দেখেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কখনো পালাননি, আদর্শ থেকে সরেননি। শেখ হাসিনাও বঙ্গবন্ধুর মত শত নির্যাতন, জীবনঘাতি হামলা হলেও রাজনীতি থেকে সরে যাননি। তিনি প্রায়ই বক্তৃতায় বলেন, আমি আমার জীবন দেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করলাম। ১৯৮১ সাল থেকে শেখ হাসিনা রাজপথে আছেন। এরই মধ্যে তিনি স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনি এবং একাত্তরের ঘাতক, রাজাকারদের বিচার করতে সক্ষম হয়েছেন। টানা ৫ বার দুর্নীতির সূচকে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করেছেন। তিনি নিজেও নেতৃত্বগুণে হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সৎ নারী রাষ্ট্রপ্রধান। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা সোনার বাংলাদেশ গড়ছেন। তাই বঙ্গবন্ধু মানে এখন বাংলাদেশ, আর বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ মানে এখন আমাদের প্রাণের নেত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশ।

মহান আল্লাহ তায়ালা বঙ্গকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে দীর্ঘজীবী করুক ও আমৃত্যু প্রধানমন্ত্রী থাকুক।

 

লেখক : ড. মোহাম্মদ হাসান খান, সদস্য,
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।