বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান

পল্লীগ্রামের এক সাধারন বাবা। সকালে কাজে যাওয়া ছেলে মেয়েদের লালন করা এই ছিল তার জীবন। কিন্তু সাধারণ হয়েও তিনি ছিলেন অসাধারন কারন তার ঔরসে জন্ম লাভ করেছে এক মহানায়ক। এই অসাধারন পিতার নাম শেখ লুতফর রহমান।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শখে মুজবিুর রাহমানের পিতা। যার ছায়া ছিল বলেই বঙ্গবন্ধু এত বড় একজন মানুষ হতে পেরেছেন। পুত্র বড় খোকার জন্য ছিল বটবৃক্ষ। সকল আন্দোলন সংগ্রামে ছেলেকে সর্মথন দিয়েছে। কখনো তাকে সংসারে আটকে রাখেনি। বরং আর্থিক ও সামাজিক সকল ক্ষেত্রেই সহযোগিতা করেছেন। শৈশবে শেখ মুজিব ছিলেন ভীষণ বাবাভক্ত ছেলে। তিনি বাবার আশেপাশে থাকতে ভালবাসতেন। বঙ্গবন্ধু শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘তাঁর গলা ধরে রাতে না ঘুমালে আমার ঘুম আসত না।’ শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে জানতে পারি, শেখ লুৎফর রহমান খেলাধুলা পছন্দ করতেন, নিজে ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি স্থানীয় অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন। বঙ্গবন্ধুরও খেলাধুলায় ঝোঁক থাকার কারণে মাঝে মাঝে তাঁর বাবার টিমের সাথে তাঁদের খেলা পড়ত। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আর আমি মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। আব্বার টিম আর আমার টিমে যখন খেলা হত তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করত।’

আসলে পিতার ছায়া পুত্রের মাঝে থেকেই যায়। ‘ঠিক যেন ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’। তাই যেন বঙ্গবন্ধু বাবারই প্রতিচ্ছায়া। বাবার গুনাবলী নিয়েই বঙ্গবন্ধু বেড়ে উঠছেনে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইতে তাঁর দাদা-দাদি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‘আমার দাদা-দাদি অত্যন্ত উদার প্রকৃতির ছিলেন। আমার আব্বা যখন কাউকে কিছু দান করতেন তখন কোনোদিনই বকাঝকা করতেন না বরং উৎসাহ দিতেন। আমার দাদা ও দাদির এই উদারতার আরও অনেক নজির রয়েছে।’’

শেখ মুজিব রহমান ছোটবেলা থেকে সাধারণ মানুষের সুখ, দুঃখ, বেদনা নিয়ে ভাবতেন। অসহায় গরিবদের সাধ্যমত সহযোগিতা করতেন। গায়ের চাদর দিয়ে, ক্ষুধার্তকে খাবার দিয়ে তাঁর সাধারণ অসহায় মানুষদের পাশে থাকার অসংখ্য নজির রয়েছে। শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুন ছেলের কর্মকান্ডে খুশি হতেন। এমন বাবা মা না হলে কি আর বঙ্গবন্ধুর মত সন্তান জন্মায়?

শেখ লুৎফর রহমান সংস্কৃতিমনা ছিলেন। পত্রপত্রিকা পড়তে পছন্দ করতেন বলে নিয়মিত খবরের কাগজ রাখতেন। আনন্দবাজার, আজাদ, বসুমতি, মোহাম্মদী, সওগাত পত্রিকা পড়তেন তিনি। বাবার মতই শেখ মুজিব পড়ুয়া ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে জেলে। তাকে কোন কারাগারে রাখা হয়েছে তা অনেকসময় সহজে জানা যেত না। তখন শেখ লুৎফর রহমান ছেলের খোঁজখবর নিতে ছুটে বেড়াতেন এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে। পুত্রের অনিশ্চিত জীবন জানা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে দূরে থাকতে কখনো বলেননি। উল্টো তিনি শেখ মুজিবের পাশে থেকেছেন এবং সাহস যোগাতেন। শেখ মুজিব জেলে গেলে তিনি তাঁকে টাকা পাঠাতেন নিয়মিত, তিনি ছেলের জন্য সবসময় কি খেলো না খেলো, শরীরটা শেখ মুজিবরের কেমন যাচ্ছে কিংবা কারাগারে কি রকম কষ্ট দিচ্ছে, তা নিয়ে সব সময় চিন্তায় থাকতেন।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, ‘আমি আস্তে আস্তে রাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করলাম। আব্বা আমাকে বাধা দিতেন না, শুধু বলতেন, লেখাপড়ার দিকে নজর দেবে।’ বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেন, এ নিয়ে কিছু মানুষের মাথাব্যথার শেষ ছিল না। কেউ কেউ বিচার দিত বাবা শেখ লুৎফর রহমানের কাছে। একবার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি তাঁকে হুশিয়ারি করে বলেছেন, আপনার ছেলে যা আরম্ভ করেছে সে জেল খাটবে, তার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। ঐ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সেইদিন এক ঐতিহাসিক জবাব দিয়েছিলেন বাবা শেখ লুৎফর রহমান। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘‘আমার ছেলে দেশের কাজ করছে, অন্যায় তো করছে না; যদি জেল খাটতে হয়, খাটবে; তাতে আমি দুঃখ পাব না। জীবনটা নষ্ট নাও তো হতে পারে, আমি ওর কাজে বাধা দিব না।’’ এমনই দেশপ্রেমিক পিতা ছিলেন শেখ লুৎফর রহমান। তাঁর বলিষ্ঠ অবস্থানের কারণে বঙ্গবন্ধু সক্রিয় রাজনীতি করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের কয়জন পিতা আছেন যে ছেলেকে এ ভাবে দেশের জন্য উৎর্স্বগ করেছেন ?

সংসারের বড় ছেলে হয়েও বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করে বেড়িয়েছেন, সংসার সামলানোর কাজ করে গেছেন শেখ লুৎফর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘‘আমি তো আব্বার বড় ছেলে। আমি তো কিছুই বুঝি না, কিছুই জানি না সংসারের। কত কথা মনে পড়ল, কত আঘাত আব্বাকে দিয়েছি, তবু কোনোদিন কিছুই বলেন নাই, আমার বাবা একজন সাদা মনের মানুষ ছিলেন। সকলের পিতাই সকল ছেলেকে ভালবাসে এবং ছেলেরাও পিতাকে ভালবাসে ও ভক্তি করে। কিন্তু আমার পিতার যে স্নেহ আমি পেয়েছি, আর আমি তাঁকে কত যে ভালবাসি সে কথা প্রকাশ করতে পারব না।’’ পিতা হিসেবে শেখ মুজিবকে নিয়ে শেখ লুৎফর রহমান গর্বিত বোধ করতেন। স্বাধীনতার পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘শেখ মুজিব সৎসাহসী ছিল। তার উদ্দেশ্য সবসময় নেক ছিল।….গরিবের প্রতি ছোটবেলা থেকে তার খুব দয়া ছিল। ….সে যেখানেই যেত সেখানেই নেতৃত্ব দিত।’ শেখ মুজিবকে শৈশবে তাঁর পিতামাতা ‘খোকা’ বলে ডাকতেন।

শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু থেকে তিনি হয়েছেন বাঙ্গালি জাতির জনক, তখনও তিনি শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের কাছে আদরের ‘খোকা’ই ছিলেন। শেখ লুৎফর রহমান আজীবন সাদামাটা জীবনযাপন করে গেছেন। তিনি জীবিত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও পরে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তিনি বঙ্গভবনে থাকতেন না, বরং গ্রামেই সাধারণের মত জীবনযাপন করতেন। বিশ্বে এত সাদামাটা জীবনযাপন আর কোন প্রধানমন্ত্রীর বাবা করেছেন বলে আমার জানা নেই। শেখ লুৎফর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৯ মার্চ ইন্তেকাল করেন। তাঁকে নিজ গ্রাম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দাফন করা হয়। তাঁর নামে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিবছর আওয়ামী লীগ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে। আমরা পরম করুনাময়ের কাছে এই মহান পিতার আত্নার শান্তি কামনা করছি।

শেখ লুৎফর রহমান এর আদররে নাতনি হাসু বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের চার চার বারের প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বে সৎ রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়, তার কর্মযজ্ঞতায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের মধ্যে রোলমডেল। আমার হাসুবুবু দীর্ঘজীবি হন এবং আমৃত্যু প্রধানমন্ত্রী থাকুন, পরম করুনাময়ের কাছে এই প্রার্থনা।

যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন। আর যতদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন, ততদিন কৃতজ্ঞতার সাথে জাতি স্মরণ করবে এই মহৎপ্রান পিতা, শেখ লুৎফর রহমানকে।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

ড. মোহাম্মদ হাসান খান; সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।