পুরনো স্মৃতি নয়, তামিমের ভাবনায় বিশ্বকাপ

বাংলাদেশিদের মধ্যে ইংল্যান্ডের মাটিতে বেশ সফল দেশ সেরা ওপেনার তামিম ইকবাল। শেষ ইংলিশদের মাটিতে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও ব্যাট দুর্দান্ত ছিলেন তামিম। লর্ডস-ওভালে আছে তাঁর সেঞ্চুরিও। সেই ইংল্যান্ডের মাটিতেই বিশ্বকাপ খেলতে কয়দিন পর উড়াল দেবেন তিনি। তবে দেশটিতে নিজের কিছু ভালো স্মৃতি থাকলেও সেটা নিয়ে আপাতত ভাবছেন না তামিম ইকবাল। তাঁর চিন্তায় শুধুই বিশ্বকাপ। তাই পুরনো স্মৃতি মাথায় না রেখে ক্রিকেটের এই বড় মঞ্চে নতুন করেই জ্বলে ওঠতে চান ড্যাশিং এই ওপেনার। ঢাকা লিগে খেলেন নি। তবে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ক্যাম্পের শুরু থেকেই অনুশীলন করে যাচ্ছেন। এরই ফাঁকে বুধবার জানালেন বিশ্বকাপ নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা।

ইংল্যান্ডের মাটিতে আপনার অনেক অর্জন। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভালো খেলেছেন, লর্ডসে টেস্ট সেঞ্চুরি। এই স্মৃতি গুলো কতটা বিশ্বকাপে কতটা প্রেরণা দেবে?

তামিম:  এগুলো নিয়ে আমি একটা ফোঁটাও ভাবি না যে আমি ইংল্যান্ডে ভালো করেছি। আমার কাছে মনে হয় এগুলো আমাকে কোনো সাহায্য করবে না। আমি এতটুকু জানি খুব কঠিন হতে যাচ্ছে। আরও বেশি কঠিন হবে যদি আমি বিশ্বকাপে সফল হতে চাই। আমাকে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। তাই কি করেছি ইংল্যান্ডের মাটিতে, সেটা নিয়ে আমি খুব বেশি ভাবি না। এটা ইতিহাস হয়ে থাকুক, সেটাই আমি চাই। ভালো করি বা না করি, আমি কখনো পেছনের জিনিস নিয়ে চিন্তা করতে চাই না। যেটা বর্তমানে আছে, সেটা নিয়েই আমাকে ভাবতে হবে। আর একটা জিনিস আমি জানি,  আমি যদি বিশ্বকাপে সফল হতে চাই, তাহলে  আমাকে প্রচন্ড কষ্ট করে এবং মাঠে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েই সেটা করতে হবে।

ইংল্যান্ডে ওয়েদারে ভালো করা কতটুকু চ্যালেঞ্জ?

তামিম: একদম আলাদা ওয়েদার হবে সম্ভবত। ওইরকম ওয়েদারে রানিং করা, ব্যাটিং করা, ফিল্ডিং করা, জিম করা – এটা খুব চ্যালেঞ্জিং। এই যে কষ্টটা আমরা এখানে করে নিচ্ছি, যখন আমরা ওই ধরণের ওয়েদারে যাবো, আমার কাছে মনে হয় যে এটলিস্ট ফিজিক্যাল ফিটনেসের দিক থেকে হেল্প করবে। সবাই চেষ্টা করতেছে তাদের মতো করে। এটাই আর কি, আরও দুই-তিন দিন প্র্যাকটিস আছে।

আয়ারল্যান্ড সফরটাকে কিভাবে নিচ্ছেন?

তামিম: আমার কাছে মনে হয় কন্ডিশনটা একটা চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ আয়ারল্যান্ড এমন একটা দেশ যেখানে আমরা খুব বেশি খেলি নাই। শেষ যেবার খেলেছিলাম, তখনও উইকেট খুব একটা সহজ ছিল না। ইট ওয়াজ ডিফিকাল্ট। তাই আমার কাছে মনে হয় আগের সাতটা দিন এবং প্রস্তুতি ম্যাচটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ম্যাচটা আমরা কিভাবে শুরু করি সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ, সেখানে আরও একটা প্রতিপক্ষ থাকবে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যারা এখন খুব ভালো ফর্মে আছে।

ঢাকা লিগ খেলেননি প্রস্তুতি নেবার জন্য, সেটা কতটুকু হলো?

তামিম: আমি খুব সন্তুষ্ট। আমার মূলত যে জিনিসটা ছিল, ব্যাটিংয়ের চেয়েও বেশি হলো ফিজিক্যাল ফিটনেস।আমি যে লক্ষ্য নিয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ মিস করেছিলাম,  আমার মনে হয় সেই লক্ষ্যটা পূরণ হয়েছে।

বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে এমন একটা টুর্নামেন্ট, যেটার দুটো দিকই থাকতে পারে, ভালো করলে একরকম আবার খারাপ করলে একরকম। আপনি পার্সোনালি এই সিরিজটাকে কিভাবে দেখছেন?

তামিম: নেতিবাচক যদি ধরতে হয় তাহলে একটাই পার্ট আছে। সেটা হলো, আমরা হয়তো দেড় মাসের মধ্যে ১৩-১৪টা ম্যাচ খেলবো। এটা নেতিবাচক পয়েন্ট। তাছাড়া আর কোন নেতিবাচক কিছু আমি দেখি না। কারণ, ওইসব কন্ডিশনে আমরা খুব বেশি খেলার সুযোগ পাই না।

আপনার যে ওপেনিং পার্টনার(সৌম্য) গতকাল ২০৮ করেছে। ইনিংসটা সম্পর্কে কিছু তাকে কতটা সাহায্য করবে বলে মনে করেন?

তামিম: এটা অনেক বড় অর্জন যে, বাংলাদেশি কেউ এই প্রথম ২০০ রান করেছে। যদিও আমরা খেলবো একেবারেই ভিন্ন একটা কন্ডিশনে, ভিন্ন বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে, তবুও এই  সময়ে রান করাটা সবসময়ই ইতিবাচক। এটা আত্মবিশ্বাস যোগায়। সে কোথায় রান করেছে এটা মুখ্য বিষয় নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে সে রান করেছে। ও যদি শেষ দুই ম্যাচে দুইটা সেঞ্চুরি না করে ১০ আর ৫ করে  যেতো, ওর মাথার মধ্যে এক পার্সেন্ট হলেও একটা চাপ থাকতো। কিন্তু এখন সে চাপমুক্ত। তাই এটা তার জন্য খুব পজিটিভ যে সে আয়ারল্যান্ডে যাবার আগে দুটো বড় ইনিংস খেলেছে।

আপনি তো দীর্ঘদিন ধরে ওপেন করছেন, কিন্তু অন্যপ্রান্তে নিয়মিত ওপেনার চেঞ্জ হয়। এটা মানসিকভাবে কোন সমস্যা সৃষ্টি করে কিনা?

তামিম: ম্যাচে তো এমন কোন সমস্যা করে না। কিন্তু যখনই আপনার একজন নিয়মিত ওপেনিং সঙ্গী থাকবে, তখন যেটা হয়, আমরা দুজনই আমাদের খেলাটাকে ভালো বুঝতে পারি। অনেক সময় হয়তো এমন থাকে যে, আমার টাইমিং ভালো হচ্ছে না। হয়তো আমি মারছি, কিন্তু ফিল্ডারের কাছে চলে যাচ্ছে। দেন, তাঁর সুযোগ থাকবে। একইভাবে ওর সাথে যদি এই জিনসটা হয়, তবে আমার চান্স নিতে হয়।

ব্যাটিংয়ের সময় পার্টনারকে রিড করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

তামিম: অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যখন একটা মানুষের সাথে যে কোন কিছুতে, যে কোন পেশায় – আপনার পেশাতেই চিন্তা করেন না কেন, আপনি যদি একজন কলিগের সাথে ২০ বছর ধরে কাজ করেন, তাহলে সে আপনার পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারগুলো জানবে এটাও এমনই। যারা বিশ্বের গ্রেটেস্ট ওপেনিং পার্টনারস, হেইডেন-গিলক্রিস্ট, গাঙ্গুলী-শচীন, শেওয়াগ-শচীন, এদের মধ্যে দেখবেন একটা বোঝাপড়া থাকতো। এরকম সুযোগ দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এখনও হয় নাই। তবে আমি শিওর, যে দুজন বিশ্বকাপে যাচ্ছে, তারা বাংলাদেশের হয়ে আগামী ১০-১৫ বছর খেলার সামর্থ্য রাখে। ভালো একটা পারফরম্যান্স দেখানোর এটাই সেরা সময় বলে আমি মনে করি।

এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের নির্দিষ্ট কোনো টার্গেট?

তামিম: কোন টার্গেট না, কোন কিছু না। কারণ আমার কাছে মনে হয় যে আমি যখনই কোন কিছু নিয়ে বেশি ভাবি, তখনই খারাপ করি। তাই আমি এটা নিয়ে খুব বেশি ভাবছি না। বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি নাই, এই নাই, সেই নাই – আমি সবই জানি। এখন এটা তো আমি চেঞ্জ করতে পারবো না। এই বিশ্বকাপে যদি আমি এটাই টার্গেট করে যাই যে একটা সেঞ্চুরি করতে হবে বা খুব রান করতে হবে, তাহলে আমি আসলে অপ্রয়োজনীয় চাপ নিবো আমার উপরে। আমি এটা চাই না। আমাকে যে রোলটা দিবে, সেই রোলটা যদি আমি পালন করতে পারি, ওই রোলটা যদি আমি ভালোভাবে পালন করি, তাহলেই সুযোগ আসবে বড় ইনিংস খেলার।

বিশ্বকাপে বিগস্কোরিং ম্যাচ হবে, বাংলাদেশকে কোন কোন ম্যাচে বড় টার্গেট চেজ করতে পারছেন না। এটা কিভাবে দেখছেন?

তামিম: দেখেন এই একটা জিনিস যেটায় আমরা খুব একটা অভ্যস্ত নই, চেজিং ৩৪০-৩৫০। সাথে এটাও আমরা জানি যে, বিশ্বকাপে হয়তো বেশিরভাগ ম্যাচেই আমাদের ২৮০-৩০০-৩২০ চেজ করতে হবে। এই কারণেই এই ট্রেনিং সেশনগুলো বা যে পাঁচটা ম্যাচ আমরা খেলবো আয়ারল্যান্ডে , সেগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে যে, আমাদেরকে বড় রান তাড়া করতে হবে। আমার মনে হয়, ৩০০ রানে কোন প্রতিপক্ষকে আটকাতে চাইলেও বোলারদেরকে খুব ভালো বল করতে হবে। দুয়েকটা দিন ব্যতিক্রম যেতে পারে যেদিন আপনি ২৪০-২৫০ রানে অলআউট করে দিতে পারেন। আমার কাছে মনে হয়, ইংল্যান্ড ৩০০ রান চেজেবল। এটার জন্য আমাদের প্রস্তুত হইতে হবে। আমাদের হিস্ট্রি ঘেটে দেখলে হয়তো দেখা যাবে, আমরা খুব বেশি বার এরকম রান তাড়া করি নাই। তার অনেক বড় কারণ হলো, আমরা যেখানে খেলি, সেখানে ৩০০ রান খুব বেশি হয় না। আশা করবো যে প্ল্যানটা আমাদেরকে দেয়া হবে, সেই প্ল্যানটা ভালোভাবে করতে পারবো আমরা।

(নাবা/২৪ এপ্রিল/হিমু)