নির্বাচনে বিজয় ও পরবর্তী ভাবনা

বিজয় সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি।

‘‘সারা বাংলায় একই নেতা
শেখ হাসিনা,
জোরসে বল শেখ হাসিনা,
সবাই বল শেখ হাসিনা।”

৩০ জানুয়ারি ২০১৮ দিনটি ভোট বিপ্লবের দিন। মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে একটি যুগান্তকারী বিজয়। একটি কালজয়ী সময়। এ বিজয় শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একার বিজয় নয়, এই বিজয় জনগণের বিজয়, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিজয় ও উন্নয়নের পক্ষে বিজয়।
চতুর্থবারের মত আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ৪র্থ বারের মত প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এই পর্যন্ত বাংলাদেশের আর কোন দল ৪ বার সরকার গঠন করতে পারেনি। আর কোন দলের সভাপতি বা সভানেত্রী ৪ বার প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। তাই হাসু বুবুকে আবারো অভিনন্দন।

নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর এখন অনেক বড় দায়িত্ব সরকারের সামনে। মনে রাখতে হবে বিজয় অর্জনের চাইতে বিজয়ের গৌরব রক্ষা করা কঠিন। তাই আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা কর্মীদের প্রতি অনুরোধ-আপনারা এখন অসতর্ক হবেন না, বরং দেশ ও দশের কাজে ঝাপিয়ে পড়ুন। জননেত্রী ও দেশরত্ন শেখ হাসিনার অসম্পন্ন কাজ শেষ করতে এবং এই দেশকে সমৃদ্ধশালী করতে তাঁকে সহযোগিতা করুন। এখন দেশ এবং দেশের মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়। বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সময়। যদি আমরা তা করতে পারি তবেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়ন হবে। আসুন আমরা সবাই এই অগ্রসর যাত্রার সাথী হই।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতিহারের দুর্নীতি দমনের প্রাধান্য দিয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। এই বাংলায় দুর্নীতিবাজদের স্থান হবে না। এমন কি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নেতাকর্মী সবাইকে তিনি সাবধান করে দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীর বিচারকার্য শুরু ও সম্পন্ন-এ সরকারের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে একটি মাইলস্টোন। আসুন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই ত্রিশ লক্ষ শহিদ আর দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখব। কোনও রাজাকার আলবদরকে মাথা তুলতে দেব না। জননেত্রী শেখ হাসিনার একার পক্ষে দেশের দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে আগে নিজেদেরকে ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎ হতে দূরে থাকতে হবে। এই ক্ষেত্রে মাননীয় সংসদ সদস্যগণ ও প্রসাশনের কর্মকর্তাদের নিজেদেরকে দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত রাখতে সবাইকেই জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। কারণ তারা জনগণের প্রতিনিধি, তারাই সরকারের কার্যক্রমের রূপরেখা দেবেন। জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি যেন জননেত্রী শেখ হাসিনা রাখতে পারেন সেইজন্যে মাননীয় সংসদ সদস্যদের জোরালো ভূমিকা খুব বেশি দরকার। তা নইলে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে। আবার সংসদ সদস্যরা তাদের নিজের নির্বাচনী ইশতেহারও সম্পন্ন করতে কাজ করবেন।

বিএনপি সরকারের আমলে বাংলাদেশে দুর্নীতি এতই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, বাংলাদেশ টানা তিনবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই দুর্নীতি বহুলাংশে হ্রাস হয়েছে। এর প্রমাণ আওয়ামী লীগ সরকার টানা তিন মেয়াদে সরকার পরিচালনা করে একবারও দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়নি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া তো দূরের কথা, প্রতিবছরেই দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার সূচক থেকে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে আছে। আমি মনে করি, সবাই সহযোগিতা করলে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতিকে বিদায় করা সম্ভব, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব।
জননেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনে জয়লাভ করার পর বলেছেন, ‘‘এখন কাজ করার সময়’’। এটাই সত্যি কথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূর্বের মত এখনও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো অব্যাহত রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে নির্বাচনের কারণে বা নতুন সরকার গঠনের কারণে বা মন্ত্রীদের পরিবর্তনের কারণেও দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কোনও প্রভাব পড়েনি। সরকার আন্তরিকভাবেই দেশের সব সেক্টরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে চাচ্ছে। সংসদ সদস্যরা যদি তাদের আসনের মানুষজনের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করেন, আগামী ৫ বছরেই বাংলাদেশকে আরো পরিবর্তন করা সম্ভব, গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব।

আওয়ামী লীগ ঐতিহ্যবাহী দল, আওয়ামী লীগ সংগ্রামী নেতা কর্মীদের দল। আমি নিজে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে উপলব্ধি করছি, নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে বিজয়ের কারণে এখন অনেকেই আওয়ামী লীগার হতে চাইবে। নিজেদেরকে তারা বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ভক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে। সেই সাথে জামায়াত ইসলামী দলের নিবন্ধন বাতিল হওয়ার কারণে অনেক জামায়াতী নেতা আওয়ামী লীগের ছদ্মবেশে প্রশাসনে ঢোকার চেষ্টা করছে। অথচ কয়েকদিন আগেও আওয়ামী লীগের কোনও কর্মকাণ্ডে তাদের অস্তিত্ব ছিল না। এই শ্রেণির মানুষ থেকে আমাদের সবাইকে সাবধান থাকতে হবে। কারণ যাবতীয় রাজনৈতিক অনাচার এদের মাধ্যমেই হবে। বরং আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের নেতা কর্মীদেরই এখন মূল্যায়ন করার উপযুক্ত সময়। তাই আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকদের কাছে অনুরোধ রইলো, দয়াকরে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করুন। তাদের ত্যাগের কারণেই কিন্তু আজকে আওয়ামী লীগ এত শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে।

নতুন প্রজন্মকেও গড়ে তোলার দায়িত্বও সরকারের উপর। আমরা ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, জঙ্গিবাদ, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি প্রজন্ম চাই। যারা এই সব অপসংষ্কৃতি প্রতিহত করবে, সচেতন হবে, কেউ তাদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না। এই প্রজন্ম তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশে অগ্রগতির ও প্রগতিশীল ধারা অক্ষুন্ন থাকবে। কারণ এরাই একসময় দেশের নেতৃত্ব দেবে। আওয়ামী লীগ সরকার নতুন প্রজন্মকে উপযুক্ত শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তিসহ প্রয়োজনীয় উপাদানের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করছে। কারণ যোগ্য নেতার কাজই হলো যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করে দেওয়া। তাহলে বাংলাদেশে রাজনীতির সংস্কৃতি বিকশিত হবে, কোনও যুদ্ধাপরাধীর দল, ঘাতকদের দল এদেশে রাজনীতি করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আদর্শ প্রজন্ম গড়তে পারলে জ্বালাও পোড়াও সন্ত্রাস দুর্নীতির রাজনীতি বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিবে।

ঐতিহ্যবাহী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গত ১৯ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিয়েছিলেন দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। তিনি নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে স্পষ্টকরে বলেছেন, ‘‘আমার ব্যক্তিগত কোনও চাওয়া পাওয়া নেই। স্বজন হারানো বেদনা নিয়েও এ দেশকে গড়ে তুলবো যে বাংলাদেশে একটি মানুষও ক্ষুধার্ত থাকবে না, গৃহহীন থাকবে না। বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ।’’ বঙ্গবন্ধু কন্যা তাঁর এই ইচ্ছার কথা আমাদেরকে বিভিন্ন ভাষণে সহস্ত্র বার জানিয়েছেন। তাঁর ইচ্ছা উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া। তাঁর ইচ্ছা বঙ্গবন্ধুর ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়ে তোলা। এই স্বপ্ন আমাদেরও।

এবার হাসু বুবুর কাছে দলের কর্মী হিসেবে আামার একটি আবেদন। জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ এক-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছে। পরিসংখ্যানের ভাষায় ব্রুটাল মেজরিটি। তাঁর নের্তৃত্বে আমরা ৭২ এর সংবিধানে ফিরে যেতে চাই। যা স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধু সরকার আমলে প্রণীত। তাহলেই বঙ্গবন্ধুকে উপযুক্ত সম্মান জানানো হবে। সবার কাছে অনুরোধ, বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করার কথা আমরা আর মুখে শুনতে চাই না। আমরা যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী তা আমাদের কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ দেখতে চাই। উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়তে সবাই এক ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে তবেই প্রমাণিত হবে আমরা বঙ্গবন্ধুকে প্রকৃত অর্থেই ভালোবাসি, দেশকে ভালবাসি। মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত দেশ গড়ে তুলতে কাজ করলেই প্রমাণিত হবে আমরা বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ভালোবাসি, এই দেশের মানুষকে ভালোবাসি। সব শেষে হাসুবুবুর উদ্দেশ্যে বলতে চাই-

‘‘এমন কন্যা বারে বারে যেন জন্মান
বাংলার প্রতিঘরে, গ্রামে গঞ্জে
জানাই তাঁকে হৃদয়ের সম্মান
আর ভাবি, বুবু আমারও তো কিছু হন যে।”
জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। জয় হোক বাংলার মেহনতী মানুষের। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান

লেখক: ড. মোহাম্মদ হাসান খান; সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।