নিজেকে আড়ালেই রাখতে চান সুপার হিরো জসিম

প্রতিদিনের মতো রাজধানীর অফিস পাড়া খ্যাত বনানীর অফিস গুলোতে চলছে কর্ম ব্যস্ততা। সেদিনও সবার মতো হাওয়া ভবন মাঠে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলেন জসিম। 

হঠাৎ এক রিকশা চালকের কাছ থেকে খবর পেয়ে ছুটে যান এফআর টাওয়ারের সামনে। সেখানে গিয়ে দেখেন ভবনের পশ্চিম পাশে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুন থেকে প্রাণে বাঁচতে ভবনের নয়তলা থেকে ক্যাবল বেয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন এক তরুণী।

এই দৃশ্য দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি জসিম। নীচ থেকে ইশারায় তরুণীকে থামতে বলেন তিনি।  জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভবনের গ্রিল বেয়ে উপরে উঠে গেলেন তিনি। নিচে থাকা শত শত মানুষ অবাক চোখে দেখছে জসিম কে। যেন কোনও সিনেমার নায়ক। অবলিলায় আগুনে জলন্ত ভবনের উপরে উঠছে।

এরপর তিনি সেই তরুণীকে নিজের রানের উপর ভর দিয়ে একতলা নিচে নামিয়ে নিরাপদে পাশের ভবনে নিয়ে যান। সেই দৃশ্য নীচে দাড়িয়ে থাকা অনেকেই ভিডিও করে ছেড়ে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে। যা অল্প সময়ের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকেই ভিডিওটি দেখেছেন। সবাই উদ্ধারকারী যুবকের প্রশংসা করেছেন। জানতে চেয়েছেন তাঁর পরিচয়।

সেই যুবকের নাম মো. জসিম। বয়স ত্রিশ পেরিয়েছে মাত্র। গ্রামের বাড়ি শেরপুর জেলায়। থাকেন গুলশানের কড়াইল বস্তিতে। বিয়ে করেছেন। দুই ছেলে ও  স্ত্রী নিয়ে তার সংসার ছোট ছেলের বয়স মাত্র ২ মাস। এখনো নাম রাখা হয়নি। জসিম বনানীর হাওয়া ভবন মাঠের পাশে পুরোনো আসবাবপত্র কেনাবেচার ব্যবসা করেন। পাশাপাশি সেই মাঠের সোয়াট ক্লাবে ফুটবলও খেলেন তিনি। দলের ম্যানেজারেরও দায়িত্ব পালন করেন।

নাগরিক বার্তার সঙ্গে একান্ত আলাপে রুদ্ধশ্বাস সেই মূহুর্তের কথা গুলোরে কথা জানিয়েছেন জসিম।

তিনি বলেন, ‘এফ আর টাওয়ারের সামনে গিয়ে দেখি আট তলার বামপাশে আগুন লাগছে। তাপে আটতলার জানালার থাই গ্লাস ভেঙে নীচে পড়ছে। নীচ থেকে দেখা যাচ্ছে, আগুনের আকার বাড়ছে। সে সময় পর্যন্ত আটতলা উঁচুতে পানি দেওয়ার মতো ফায়ার সার্ভিসের কোনো ক্রেন আসেনি। আমি ভাবছি, দেখি কিছু করা যায় কি না, মানুষগুলোকে কিভাবে বাঁচানো যায় এই আগুন থেকে। কিন্তু আটতলায় ওঠার মতো কোনও ব্যবস্থা নেই। সমস্ত জায়গায় আগুন ছড়িয়ে গেছে। টাওয়ারে থাকা মানুষের আর্তনাদ দেখে মন মানছিল না। তাই নিজের কথা চিন্তা না করে ছুটে যাই টাওয়ারের কাছে। দেখি, আমার এক বন্ধু, নাম লোকমান। বাঁশ লাগিয়ে তারের ওপর বসে আছে। তখন আমি চিন্তা করলাম, আগুন যতটুকু জায়গায় ছড়িয়েছে, এ অবস্থায় আমি যদি আটতলায় গিয়ে পানি দিতে পারি তাহলে আগুন নেভানো যাবে। তাই লোকমানকে বলি, আমি উপরে যাচ্ছি, আমাকে পাইপ তুলে দিস। পরে ফায়ার সার্ভিসের পানি ভর্তি পাইপটি নিয়ে কষ্ট করে দুজনে টেনে দোতলা পর্যন্ত উঠাতে গিয়ে দেখি পানিসহ আমি নিচে নেমে যাচ্ছি। তখন পাইপটা ছেড়ে দেই।

ঠিক সেই সময়, উপরে তাকিয়ে দেখি, এক আপু নয়তলা থেকে ফোন ও ডিশের তার বেয়ে নিচে নামছিলেন। তখন আমি চিন্তা করলাম, আপু তো পড়ে যাবে। আমি তাঁকে ইশারায় বললাম, আপনি আর নামবেন না। আমি আসছি। বলতে বলতে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার বেয়ে আট তলায় নেমে কাঁপতে থাকেন সেই আপু। আমি তড়িঘড়ি করে পাশে থাকা ভবনের গ্রিল বেয়ে আটতলায় পৌঁছাই। তাঁকে এসি রাখার একটি লোহার স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে ডান দিকের দেয়ালে পা রেখে আমার পায়ের ওপর ভর দিয়ে ও তার ধরে পাশের ভবনের গ্রিল ধরতে বলি। তিনি আমার কথা অনুযায়ী সে কাজগুলো করেন। পরে আমি সেই ভবনের জানালা ধরে আপুকে টেনে ভেতরে প্রবেশ করাই । এরই মধ্যে বন্ধু লোকমানও উপরে উঠে নীচ থেকে ওই আপুকে ধরতে সাহায্য করে। তখন বন্ধু লোকমানকে বলি, তুই একটু দাঁড়া। আর কেউ আছে কি না। এর পরে এক বিদেশিসহ ৬ জনকে নিরাপদে সরিয়ে আনতে সক্ষম হন।’

কথাগুলো একটানা বলছিলেন জসিম। কথা বলার সময় মনে হচ্ছিলো সেই স্মৃতি এখনো জমিসের চোখে জলজল করছে।

ওই ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্রেন নিয়ে এসে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করে। আগুন নেভানো ও উদ্ধার কাজে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট। সহযোগিতা করে পুলিশ, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা।

এদিকে দুঃসাহসী ও জীবন বাঁচানো কাজ করলেও নিজেকে আড়াল করে রাখেন জমিস। কোনও ভাবেই তিনি কথা বলতে রাজি ছিলেন না গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে।

আড়ালে থাকার কারণ জানতে চাইলে জসিম বলেন, আমি কোন উপহার বা টাকা পয়সা চাইনা। আমি চাই না জনপ্রিয় হতে। আমি শুধু আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি মানুষের পাশে দাড়াতে। এতে আমি বিরত্বের কিছু দেখি না।

জসিম জানতেন তাঁর ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। দেশ বিদেশে থাকা বিভিন্ন জনের মাধ্যমে তিনি শুনেছেন। পরিচিত অনেকেই ফোনে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। কিন্তু তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। তিনি চাননি আগুনের সময় ফায়ার সার্ভিসের পাইপ ধরে খ্যাতি পাওয়া শিশু নাঈমের মতো হতে। নাঈমকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের কাঁদা ছোড়াছুড়ি ও বিষাক্ত মন্তব্য তাঁকে আতঙ্কিত করে তোলে।

অনেক কষ্টে জসিমের সন্ধান পাওয়া যায়। বানানীর হাওয়া ভবন মাঠে গিয়ে নাগরিক বার্তার সঙ্গ কথা বলতে রাজি করায়।

সেদিনকার ঘটনা প্রসঙ্গে জসিম বলেন, সবাইকে বাঁচাতে পারলে তাঁর আনন্দ হতো। কিন্তু অনেক মানুষ মারা যাওয়ায় সেই দিনটি তাঁর কাছে একটি শোকের দিন।

তাঁর কোনো ধরনের সহযোগিতা লাগবে না জানিয়ে জসিম বলেন, ‘টাকাপয়সা লাগব না ভাই, পঁচাইয়েন না। মা, ভাই বোন আর নিজের স্ত্রী সন্তার নিয়ে ভালো আছি।

সদ্য বাবা হওয়া এই হিরো শৈশবেই বাবাকে হারিয়েছেন জসিম ১৯৯৩ সালে শেরপুর থেকে রাজধানী ঢাকায় কাজের খোঁজে আসেন জসিমের বাবা কুমুর আলী। তখন জসিমের বয়স ছিল মাত্র ৬ বছর। ১৯৯৬ সালে টানা ২১ দিন হরতালে দূরপাল্লার কোনো যানবাহন না চলায় কুমুর আলী ট্রাকে করে ঢাকায় ফিরছিলেন। ট্রাকটি ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলায় আসামাত্র খাদে পড়ে যায়। ট্রাকে থাকা মালামালের চাপে সেখানেই কুমুর আলীর মৃত্যু হয়। তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তেন জসিম।

পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তিকে হারিয়ে অভাবে পরে যায় জসিমের পরিবার। বাবাকে হারিয়ে জীবন বাচাঁতে গ্রাম ছাড়েন। ঢাকায় এসে বিভিন্ন কাজ করেন জসিম। কাজ না পেলে না খেয়ে থাকতে হতো। শৈশবে ইট ভাঙার কাজ করার পরে কৈশোরে এসে জসিম ইলেকট্রিক্যালের দোকান, গার্মেন্টস ও সোয়েটার তৈরির কারখানা, ওষুধের কারখানাসহ বিভিন্ন স্থানে চাকরি করেন।

বর্তমানে তার বড় ভাই মো. আব্দুল কাদের সোয়াট মাঠের পাশে একটি চায়ের দোকান পরিচালনা করেন। ছোট ভাই আজিম বনানীতে একটি বিকাশ, মোবাইল রিচার্জের দোকান চালান।

এই কাজের জন্য সমাজ বা রাষ্ট্রর কাছে কোনও পুরস্কার বা উপহার চান না। জীবনের পোড় খাওয়া এই হিরো নিজেকে আড়াল করে রাখতেই পছন্দ করেন। ভাসতে চান না তথা কথিত উপমায়। হতে চান না কারো করুণার পাত্র। দু’বেলা, দু মুঠো খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারছেন এতেই খুশি নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে অন্যের জীবন রক্ষায় ঝুকি নেওয়া এই সুপারম্যান।

ভিডিওতে দেখুন সেই দিনের ঘটনা: ক্লিক করুন..

নাবা/ডেস্ক/ওমর ফারুক