নদীর প্রাণ ফেরাতে যত চেষ্টা…

যে শহরের চার পাশ ঘিরে নদী, বিশ্বের এমন কয়েকটি শহরের মধ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা অন্যতম। তবে নদী দখল ও দূষণের কারণে সেই সৌন্দর্য্য বহু আগেই হারিয়েছে ঢাকা শহর। ভূমিখেকোদের দৌরাত্বের কাছে বিলিন হয়েছে নদীর হাজার হাজার একর জলাভূমি। নদী দখল করে ঘর-বাড়ি, কল কারখানসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা শিতলক্ষ্যা, তুরাগ, বুড়িগঙ্গা এবং বালু নদীর খরস্রোত হারিয়েছে বহু আগে। এখন যে টুকু নদী টিকে আছে তারও ভয়াবহ অবস্থা।
নদী পাড়ের কল কারখানার বর্জ্যগুলো সরসারি নদীতে ফেলছে, এছাড়াও নগরীর বাসিন্দাদের পয়:নিষ্কাসনের সকল বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণে এই চারটি নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গন্ধে নদীর কাছে যাওয়াই এখন কষ্টকর।
নদী বাঁচাতে বিভিন্ন সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠানের আন্দোলন প্রায়ই চোখে পড়তো ঢাকাবাসীর। তবু নদী রক্ষায় কাজ করা সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিএ ছিলো নির্বিকার। কোন এক অদৃশ্য বাধার কাছে তারা ছিলো জিম্মি।
তবে আশার কথা হলো বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই ভেঙ্গেছে সকল অদৃশ্য শক্রির হাত। আটঘাট বেঁধে বিআইডব্লিউটিএ উচ্ছেদে নেমেছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু এবং শিতলক্ষ্যা নদীর তীরভূমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে। শুধুমাত্র উচ্ছেদ নয়, এই সকল নদীর সীমানা অনুযায়ী স্থায়ী ভাবে নদীর সীমানা স্থাপন করা এবং চার পাশে নগরবাসীর বিনোদনের জন্য এবং হাঁটার জন্য রাস্তা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বিআইডাব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক এবং উচ্ছেদ অভিযানে নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা এ কে এম আরিফ উদ্দিন নাগরিক বার্তাকে জানান, আমরা শুধু নদী উচ্ছেদ করেই আমাদের কাজ শেষ করতে চাই না। উচ্ছেদের পরে আমরা নদী খনন, অবৈধ ভাবে ভরাট করা অংশ থেকে মাটি অপসারণ এবং নদীর সীমানা স্থায়ী ভাবে নির্ধারন করব। যাতে কেউ চাইলেই যেন আর নদীর কোন অংশ দখল করতে না পারে। সীমানা স্থাপনের পাশাপাশি নদীর পাশকে কাজে লাগাতে এবং নগরবাসীর স্বার্থে একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। যেখানে থাকবে নদীর তীরে হাঁটার রাস্তা। রাজধানীর সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত ৪ টি পয়ন্টে মিনি পার্ক স্থাপন, গাছ রোপনের মাধ্যমে সবুজায়ন এবং লাইটিং এর পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৮’শ কোটি টাকা।

তিনি আরও বলেন নদীর সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন জিপিএস। যা দেখে এই উচ্ছেদ পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির গড়ে তোলা স্থাপনার জমি উদ্ধারে ব্যবহার করা হবে ড্রেজার। যার মাধ্যমে নদীর পূর্ব নাব্যতা ফিরে আনার চেষ্টা করা হবে।

দুই পর্যায়ে মোট ১৮ দিনের উচ্ছেদে এ পর্যন্ত ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এছাড়াও উচ্ছেদ করা হয়েছে তুরাগ নদীর একটি চ্যানেল দখল করে গড়ে তোলা আমিন মোমিন নামের একটি হাউজিং এবং ছোট বড় বহু ইট, পাথর এবং বালুর গদি।

এছাড়াও এই উচ্ছেদ অভিযানে ভাঙ্গা পড়েছে সংসদ সদস্য, দুদক আইনজীবী, পুলিশ, এবং ক্ষমতাশীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বহু নেতার স্থাপনা। সরকারের কঠোরতার কারণে এ পর্যন্ত তেমন বড় কোন বাধার সম্মুখীন না হলেও কয়েকটি বড় ভবন এবং স্থাপনা সরাতে গিয়ে বেগ পেতে হয়েছে উচ্ছেদকারী দলকে।

উচ্ছেদকারী দলের সঙ্গে থাকা বিআইডাব্লিউটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্টেট মোস্তাফিজুর রহমান নাগরিক বার্তাকে বলেন, নিঃন্দেহে এটি অনেক বড় একটি উচ্ছেদ অভিযান। সরকার এবং বিআইডাব্লিউটিএর কঠোর অবস্থানের ফলে বড় কোন বাধার সম্মুখীন না হলেও আমিন মোমিন নামের একটি হাউজিং উচ্ছেদের সময়ে কিছু বাধার সম্মুখিন হয়েছিলাম। কয়েকজন কে জরিমানা এবং সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

নাবা/রাজু/নয়ন