দেশরত্ন শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল আমাদের প্রাণের স্বাধীনতা। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও তখন বিজয়ের আনন্দ পুরোপুরি উদযাপন করতে পারেনি আপামর মানুষ। কেননা যাঁর ডাকে বাঙ্গালি মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যিনি এ দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন সেই আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির ঐতিহাসিক ক্ষণে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে এদেশের বিজয়ের পূর্ণতা পেল। সেদিন বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন। সার্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিকে জাতীয়ভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসাবে পালন করা হয়। কিন্তু তখনও কি কেউ জানতো বঙ্গবন্ধু কন্যাকেও প্রায় দশবছর পরে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে হবে ? তাঁকে স্বাগত জানাতেও লক্ষ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হবে ?

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি সত্য, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরের ঘাপটি মেরে থাকা পাকিস্তানের প্রেতাত্মাদের সর্বাংশে দূর করা যায়নি। ফলে জাতিকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মত নির্মম কালরাতের সাক্ষী হতে হয়। এদিন ঘাতকদের নির্দয় বুলেটের আঘাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। সৌভাগ্যক্রমে দেশের বাইরে ছিলেন জাতির পিতার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ’৭৫-এর পর বঙ্গবন্ধু কন্যারা যাতে দেশে না আসতে পারেন রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই ব্যবস্থা করা হয়। জিয়াউর রহমান শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। অর্থাৎ শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারবেন না। জিয়াউর রহমানসহ ওই সময়ের শাসকদের ভয় ছিল, শেখ হাসিনা দেশে এলে সাধারণ মানুষ মুজিব হত্যার বিচারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠবে। দেশবাসী বঙ্গবন্ধু কন্যাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে চাইবে। তাই ঘাতকদল ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে বঙ্গবন্ধু কন্যাদ্বয় যাতে দেশে না আসতে পারেন সেই ব্যবস্থা করল। সেই কারণে ৭৫-এর পর ১৯৮১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশে আসতে পারেননি।

এদিকে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের ওপর দমন-নিপীড়ন, হত্যাযজ্ঞ চালায় শাসকগোষ্ঠী। কারাগারে বন্দী থাকা জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রচলন করা হয়। কয়েক বছরে বঙ্গবন্ধু দেশকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর দেশের উন্নয়ন থমকে দাঁড়ায়। কারণ শাসকদের দেশের উন্নয়নের চেয়ে তাদের নিজেদের উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি বেশি ছিল। দেশে থাকা নির্যাতিত নিপীড়িত আওয়ামী লীগ নেতবৃন্দ তাঁদের সর্বশক্তি দিয়ে দলটিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪, ১৫, ১৬ তারিখে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এ কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। তখনো সরকার শেখ হাসিনার দেশে আসার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়নি। শেখ হাসিনা জানতেন দেশে ফিরলে তাঁকে হত্যা করা হতে পারে, তবু তিনি পিছপা হননি। দেশের জন্য মাতৃভূমির জন্য এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে ১৯৮১ সালের ১৭ মে রোববার বঙ্গবন্ধু কন্যা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে করে শেখ হাসিনা যখন ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে পৌঁছেন তখন বিকেল ৪টা। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মতই সেদিন প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে লক্ষ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। উদ্দেশ্য শেখ হাসিনাকে এক নজর দেখা এবং তাঁকে দেশে স্বাগত জানানো। সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে পেয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েন। ‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা’ রচনায় রোকেয়া প্রাচী লিখেছেন, ‘সেদিনের গগনবিদারী মেঘ গর্জন, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ প্রকৃতি যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বদলা নেওয়ার লক্ষ্যে গর্জে উঠেছিল, আর অবিরাম মুষলধারে ভারী বর্ষণে যেন ধুয়ে-মুছে যাচ্ছিল বাংলার মাটিতে পিতৃ হত্যার জমাট বাঁধা পাপ আর কলঙ্কের চিহ্ন। শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান ছুঁয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন লাখো মানুষ। বাবা-মা-ভাইসহ পরিবারের সব সদস্যের রক্তে ভেজা বাংলার মাটি স্পর্শ করে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।’ শেখ হাসিনা দেশের মাটিতে পা রেখে উপস্থিত লক্ষ জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।’

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেও জিয়াউর রহমানের সরকার তাঁকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। শেখ হাসিনা বাড়িতে ঢুকতে না পেরে ৩২ নম্বর রোডে বসে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন। শেখ হাসিনা বিভিন্ন বক্তব্য তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটির স্মৃতিচারণ করেছেন। ২০১৭ সালে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে এতো বড় দায়িত্ব আমাকে তারা দিয়েছিলেন। সেদিন মানুষের যে ঢল নেমেছিল, সেই কারণেই তখন জিয়াউর রহমান আমাকে বাধা দিয়ে রাখতে পারেনি। নইলে আমি ফেরত আসতে পারতাম না। এমনকি ফিরে আসার পর আমাকে ধানমন্ডি ৩২ এ যেতে দেয়নি এবং মিলাদও পড়তে দেয়া হয়নি। আমাকে বলা হয় অন্য একটা বাড়ি আমাদের দেবে। আমি বলেছিলাম কোনও বাড়ির লোভে আমি আসিনি।’

প্রতিকূলতা শত ছিল, জীবনহানির শঙ্কা ছিল পদে পদে, তাই বলে শেখ হাসিনা নিজের লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে সরে যাননি। আবার আওয়ামী লীগের মত বৃহৎ একটি সংগঠনের দায়িত্বভার নেয়া তাঁর জন্য সহজ বিষয় ছিল না। কারণ শেখ হাসিনা এর আগে বৃহৎ পরিসরে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেননি। অন্যদিকে তিনি যখন দলের দায়িত্ব নিলেন, বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা তখন ক্ষমতায়। তারা শেখ হাসিনার প্রতি পদে পদে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা জানতেন সত্যের জয় একদিন হবেই, আর সেদিনই শোষক ও খুনিদের পতন হবে। ১৯৮১ সালে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাজপথেই ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে বহুবার তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও হত্যাচেষ্টা করা হয়। স্বদেশে ফিরলেও দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে পারেননি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ প্রথম সরকার গঠন করে। আমাদের আনন্দের বিষয়, বর্তমানে জননেত্রী শেখ হাসিনাই রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। তিনি বর্তমানে টানা তিন মেয়াদসহ মোট চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাচ্ছেন।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অনেক কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি দেশে এসে আওয়ামী লীগের হাল না ধরলে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ টিকে থাকতে পারত কি না তা বলা মুশকিল। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারও হত না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিসর্জিত হতো। এ দেশ হতো আফগানিস্তানের মত। তখন ঘাতকদল, পাকিস্তানপন্থীরা দেশ পরিচালনা করতো। ঘাতকদের হাতে কখনো কোন দেশ ভাল থাকতে পারে না। বাংলাদেশও পারেনি। শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের আগে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশ নানা দিকে পিছিয়ে পড়েছিল। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সামাজিকসহ সবক্ষেত্রেই অধঃপতন শুরু হয়েছিল। কেবল তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধুলিস্মাৎ করার অপচেষ্টা চলছিল। যার অংশ হিসেবে রাজাকারদের গাড়িতেও উঠেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদের মহান সংসদে স্থান দিয়ে তাদের এমপি মন্ত্রী করে সংসদ ও দেশকে কলঙ্কিত করা হয়েছিল। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ হ্যাট্টিক করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। গণতন্ত্রকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেয়া হয়েছিল। এসব অরাজগতা থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনা ছিল শেখ হাসিনার বড় সাফল্য। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত করা, ঘাতক-দালাল-রাজাকারদের বিচার, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার, দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বহির্বিশ্বের বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা অনন্য অবদান রেখেছেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নত, সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করে এখন আরো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৮১ সালে যদি শেখ হাসিনা দেশে প্রত্যাবর্তন না করতেন তাহলে বাংলাদেশ হয়তো সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ, তৃতীয় শ্রেণির দেশ হিসেবে বহির্বিশ্বে পরিচিতি পেতনা। আমরা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারতাম না। তাই শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটি খুব গুরুত্বের দাবি রাখে। এ দিনটি এ বছর সারাদেশে গুরুত্বসহ পালন করবে আওয়ামী লীগ। আমি সরকারিভাবে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসটি সারাদেশে অনাড়ম্বরভাবে পালনের দাবি জানাই।

আজ ২০১৯ সালের ১৭ মে। আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের ৩৮ বছর পূর্তি হবে। এ দিনে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদের হাসু বুবু, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে দীর্ঘায়ু দান করেন, তাঁকে সকল ষড়যন্ত্র ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন ও আমৃত্যু প্রধানমন্ত্রী থাকেন।


লেখক : ড. মোহাম্মদ হাসান খান
সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।