জাল ও জলের আখ্যান

আশিক বিন রহিম

এক.
তৈয়ব আলী গাজী। মেঘনা পাড়ের গাজী কান্দি গ্রামের সবচেয়ে সহজ-সরল মানুষ। গাঁয়ের লোকেরা তাকে তৈয়ব জাইলা নামে ডাকে। বয়সের গাড়ি কতোদূর গেছে সেটা মুখ দেখলেই অনুমান করা যায়। আজকাল খালি চোখে সবকিছু ঝাঁপসা লাগে, এজন্য নিয়ম করে হাই পাওয়ারের চশমা পরেন। দীর্ঘ সময় নদীতে আঁধো হেলেপড়া একটা গাছের সাথে গা লাগিয়ে বসে আছেন। দক্ষিণের আউলা বাতাস গাছে পাতা ছুঁয়ে শোঁ শোঁ ধ্বনি তুলছে। সেই ধ্বনিতে কিছু একটা খুঁজে চলেছেন তৈয়ব জাইলা। বিকেল তখনো সন্ধ্যার বাড়িতে পা রাখেনি। অথচ এমন শান্ত আলোতে গ্রামটাকে খুব অসহায় ঠেকছে তার। দৃশ্যমান ঝুঁড়ি অন্ধকার গ্রামটাকে ঘিরে ধরেছে যেনো। হয়তো বা অপ্রত্যাশিত সেই আঁধারকে পড়তেই এতোটা সময় তার নদী পাড়ে বসে থাকা। হঠাৎ কি ভেবে চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে আকাশে তুলে ধরলেন। এরপর মলিন গামছায় চশমাটা গোলাকার কাঁচ দু’টো পরিস্কার করতে লাগলেন। নদী তীরে তখন আঁচরে পরা ছোট ছোট ঢেউয়ের শব্দ। অদূরে ঘুঘুদের শোকের মাতম ভেসে আসছে থেমে থেমে। দুঃখের দিনে শান্তির বারিধারাও বিষজল মনে হয়; এটাই যেনো প্রকৃতির অদৃশ্য নিয়ম। পরন্ত বিকেলের এমন শান্ত ক্ষণেও তৈয়ব জাইলার চোখে নোনাজলের উছল ঢেউ। বাম হাতের উল্টে পিঠে চোখ মুছে ফের দৃষ্টি রাখেন গাঁয়ের দিকে। চিরচেনা গ্রামটাকে বড্ড অচেনা লাগছে। মনেহয় কোনো এক দুঃখি পাড়ার পথশিশু নিষ্পাপ-নিস্তেজ শরীর নিয়ে বড় রাস্তার একপাশে পড়ে আছে। অথচ নিকট অতিতেও এ গাঁয়ের চিত্র ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে বাতাসের হাত ধরে ধানপাতার আনন্দনৃত্য হতো। সকাল-বিকালে মাঠে মাঠে ডাহুক, শালিক, চড়–ই আর সাদা বকের মেলা বসতো। আকাশটা প্রেমিকার নীল আঁচল হয়ে ঢেকে রাখতো গ্রামের মুখখানি। মেঘনার ছোবলে চির সতেজ এই গ্রামের শরীরময় আজ কেবলি ধূসর রঙ।

মেঘনার পূর্বদিকে জেগে উঠা গ্রামটি কাগজে-কলমে লগ্মির চর হলেও লোকমুলে এটি গাজীকান্দি নামেই পরিচিত। এই গ্রামের সবাই কৃষিকাজ আর নদীতে মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল। তিন দিকে সবুজ প্রাচীর আর পশ্চিমে বিস্তৃর্ণ মেঘনার স্বচ্ছ জলরাশি এ গ্রামের সৌন্দর্যে ভিন্ন রঙ ঢেলে দিয়েছে। একটা সময় পশ্চিমের বিঘা বিঘা জমিতে নানা রকম ফসলের চাষ হতো। ধানের মৌসুমে সবুজ চাদর বিছানো মাঠগুলো মনে হতো ছবির মতো। গেল বছরের ভাঙনে গাজীকান্দি গ্রামের সিংহভাগ মেঘনার পেটে বিলীন হয়ে গেছে। এরপর গৃহহীন মানুষগুলোর আশ্রয় মিলে বেড়িবাধেঁর পশ্চিম পাশে। হাতেগোনা যে ক’জন এখোনো বাপ-দাদার ভিটায় মাটি কামড়ে পরে আছেন- তৈয়ব জাইলা তাদেরই একজন। সেই দুপুর থেকে অভুক্ত শরীরে নদীর পাড়ে বসে আছেন তিনি। সারাদিন একফোঁটা দানা-পানিও পেটে পরেনি। বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান সবাই অনাহারি। জাটকা ইলিশ রক্ষায় সরকার তিন মাস নদীতে মাছ ধরা নিষেধ ঘোষণা করছে। এখন তাই হতাশার সুতোয় ভাগ্যের খাতা সেলাই করা ছাড়া আর কোনো কাজ তার জানা নেই। বেকার সময়টা মেঘনার ঢেউ গুনেই পার করেন তৈয়ব জাইলা। হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠে ডাক শুনে চমকে উঠেন!।
মাছের আড়তদার কাদির খাঁ ঝাঁঝালো স্বরে বলতে লাগলো-
কিও জমিদারের বেটা, অমন মন খারাপ কইরা বইসা আছো ক্যান? আইজো কী চুলায় আগুন জ্বলেনাই।
অপ্রস্তুত তৈয়ব জাইলার মুখ থেকে কোনো কথা বের হয় না।
কাদির খাঁ আবার প্রশ্ন করে- তা গাজির পুত, কামকাইজ কিছু যোগাইছ? নাকি বৌয়ের তাবিজ মালা বিক্রির টেকা অহনও শেষ হয় নাই।
-না রে বাজান, আমার উপর তো পরছেই এইবার কামের উপরও ঠাটা পরছে। তৈয়ব গাজীর এমন উত্তরে বড় একটা ধাক্কা খায় কাদির খাঁ। তৈয়ব গাজী থামেনা, মলিন স্বরে বলতে থাকে, আগে তো গাঙে অভিযান দিলে ক্ষেতে কাম করছি, মাডি কাটছি। এই ডাহাইত্তা গাঙে হেইডাও কাইরা নিছে। আইজ দুই দিন চুলায় আগুন জ্বলে নাই। পোলাপাইনগুলা না খাইয়া মাডিতে পেট লাগাইয়া পইরা আছে। তোমার চাচি বেরাইমম্বা মানুষ, প্রত্যেকদিন ত্রিশ টেকার অষুধ লাগে। তাবিজ মালা বিক্রির টেকা আর জমাইন্না যা আছিলো সব শেষ করছি। অহন আর একটা বিড়ি কিন্না খাওনের মতোন টেকাও আমার কাছে নাই। অভিযান শেষ অওনের আরো দেড় মাস বাকি আছে। অমি কী করুম কিছুই বুঝতাছি না বাজান…। কাদির খাঁ চুপ থাকায় কথাগুলো এক নাগাড়ে বলে ফেললো তৈয়ব জাইলা।
-কাদির খাঁ বলতে লাগলো, আরে মিয়া ওই যে যাইয়া দ্যাখো ছৈয়ালের পুতেরা ধইঞ্চা ক্ষেতের মইধ্যে পলাইয়া কারেন্ট জাল থেইক্কা জাইত্তা মাছ খোলতাছে। জালভর্তি খালি মাছ আর মাছ। মাছের লাইগা জাল দেহা যায় না। এইবার অভিযানে ছৈয়ালরা অনেক টেকা কামাইছে, আর তুমি…। তৈয়ব জাইলা চুপ; ঘাড় থেকে মাথাটা ইষৎ নিচু করে রাখেন।

আওয়াজ করে মাটিতে পানের পিক ফেলে আবারো বলতে থাকে কাদির খাঁ-
আরে মিয়া, তুমিও-তো গাঙে নামতে পারো। কতোবার কইলাম লাগলে টেকা নেও, জাল করো, কথা হুনলা না। হুনো মিয়া, নিজে জাল করবা না ঠিক আছে, তাগো লগে তো গাঙে নামতে পারো?। কাদির থামে না- চাচি পোয়াতি মানুষ, হের পেডেও একখান জাইত্তা ইলিশ বড় হইতাছে, সেই খেয়াল কী তোমার আছে?। হুনো মিয়া নিজের ঘরে যে আরো দুইখান টেম্পু ইলিশ (কিশোর ইলিশকে এখানকার আঝলিক ভাষায় টেম্পু বলা হয়) ক্ষিদার জ্বালায় মরতাছে, তাগো কথা চিন্তা না কইরা তুমি আছো গাঙের জাইত্তা ইলিশ লইয়া।
Ñগাঙের জাইত্তা কি আমাগো সন্তানের মতোন না? তাগোরে বড় করনের দায়িত্ব তো আমাগোই খাঁ’র পুত। আচমকা উত্তর দেয় তৈয়ব জাইলা। এমন উত্তরে হতভম্ব কাদির খাঁ কপালের ভ্রুঁ কুচকায়। তৈয়ব জাইলা বলতে থাকে-সরকার নিয়ম করছে, তিন মাস গাঙে জাল ফেলা যাইবো না। আমি টিবিতেও দেখছি, জাইত্তা মাছ বড় হইলে ইলিশ হয়। আর তিন মাস পরে হেই ইলিশ তো আমরাই ধরুম। আমি অনেক ভাইবা দেখছি কাদির, সরকার আমাগো ভালোর লাইগাই এমন আইন করছে। তাছাড়া, হুনছি এইবার না কি অভিযান অনেক কড়া করছে। পুলিশের না কি গুলির অর্ডারও দিছে। আমার খুব ডর করে খাঁ’র পুত। আমি না খাইয়া মইরা গেলেও জাইত্তা ইলিশ ধরতে যামু না।
-আরে মিয়া এতো কইরা বুঝাইলাম বুঝলানা, খালি নীতি কতা কয়া গেলা। আইচ্ছা থাকো তুমি তোমার সরকার আর ইলিশ মাছ লইয়া, আর না খাইয়া মরো গিয়া। কাদির খাঁ বিরক্তির স্বরে কথাগুলো বলেই জোর কদমে সামনে পা বাড়ায়। তৈয়ব জাইলা কাদির খাঁ’র অদৃশ্য হওয়া দেখে আর মনে মনে ভাবে- কাদির খাঁ কথাগুলো মিথ্যা বলেনি, ‘হাজেরার পেটেও একটা জাইত্তা ইলিশ বড় হচ্ছে। তাছাড়া ঘরে আরো দু’টো টেম্পু ইলিশ আছে। আজ দুইদিন তারা ক্ষুদার জ্বালায় কাঁদছে। তৈয়ব জাইলা নদীর ইলিশের সাথে নিজের জীবনের মিল খুঁজে বেড়ায়…।

দুই.
রাতের বয়স বেড়েছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুষ্ট শেয়ালের ডাক। নিরস গ্রামটাকে জাগিয়ে রাখতে লক্ষ্মী পেঁচারাও থেমে নেই। পেঁচার ডাক বিপদের বারতা, গ্রামবাসীর এমন ধারণা বহুদিনের। গভীর ঘুমপুকুরে স্নানরত মনুষগুলো এতক্ষণে স্বপ্নভেলায় ভেসে বেড়াচ্ছে। পৃথিবী পাহারায় বুড়ো চাঁদটা জেগে আছে। চোখে ঘুম নেই তৈয়ব জাইলার। গাজী কান্দির এক সময়ের সহসি তৈয়ব এখন কেবল-ই ভীতু আর অসহায়। অভুক্ত শরীর নিয়ে ঘুণেধরা নৌকার পাটাতনে চিত হয়ে শুয়ে আছে। অদূরে নদীর ঢেউ আর দক্ষিণ বাতাশের গান, বুকের মধ্যে অজানা ভয় খেলে যাচ্ছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল দিনগুলোতেও তৈয়বের ভয়-ডর ছিলো না। নদীর জলে ভেসে চলা অসংখ্য মানুষের লাশ সে নিজের হাতে মাটিচাপা দিয়েছে। লুকিয়ে লুকিয়ে মুক্তিযুদ্ধাদের খাবর আর অস্ত্র সরবরাহ করেছে। তৈয়ব গাজীর বৈঠার আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে রাজাকার কালু মাতাব্বরের। স্বাধীনতার বয়স এখন সাতচল্লিশ। অথচ তৈয়ব জাইলা সেই বীরত্বের কথা আজো বুক ফুলিয়ে বলতে পারে নি। একবার স্ত্রী হাজেরাকে কথটা বলতেই ছোঁ-মেরে কথা কেড়ে নেয়। দুই হাতে স্বামীর মুখ চেপে শপথ করিয়েছে-‘এই কথা যদি আর কোন দিন মুহে আনেন, তয় আমার মরা মুখ দেখবেন’। হাজেরা জানে স্বাধীন দেশে কালুদের পেতাত্তরা এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে। আট ডিসেম্বর রাতের সেই গল্পটি প্রায়-ই তৈয়বের স্মৃতির পুকুরে ঘাঁই মারে। আজ ইচ্ছে করেই আরও একবার সে রাতের ঘটনার ডুব দিলো তেয়ব আলী…..।

রাত তখনও বড়ো হয়নি, ইলিশের বাড়ি জেলা সেদিন পুরোপুরি শত্রুমুক্ত। রাজাকার কালু মাতাব্বর মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে পালিয়ে যেতে খেয়া ঘাটে হাজির। ঘাটের মাঝি চোদ্দ বছরের কিশোর তৈয়ব আলী। গ্রামের মানুষ তাকে সহজ-সরল বলেই জানে। জানাটা কালু মাতাব্বরের মাঝেও বিদ্দম্যান। গ্রামের অন্যসব জোয়ানদের থেকে সেও তৈয়বকে আলাদা নজরে দেখে। আগপিছ না ভেবে নৌকায় চড়ে বসেন কালু রাজাকার। তৈয়ব এমন একটি রাতের অপেক্ষাই করছিলো। যে লোকটা হাসতে হাসতে নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে, গ্রামের যুবতি মেয়েদের তুলে দিয়েছে পাকিস্তানি জোয়ানদের হাতে, অসংখ্য ঘর-বাড়ি যে পুড়িয়ে দিয়েছে মুহূর্তেই। সেই রাজাকার কালু এখন তার নৌকায়। একেবারে নিরস্ত্র-অসহায়। তৈয়ব আলী জলের বুকে বৈঠার দাগ কাটতে শুরু করে আর মনে মনে প্রস্তুতি নেয়। মাঝ নদী পার হতেই আচমকা ধাপ্ করে বৈঠা দিয়ে কালুর মাথায় আঘাত করে। সাথে সাথে পানিতে লুটিয়ে পড়লো রাজাকার কালু মাতাব্বর। কিছুক্ষণ গলাকাটা মুরগীর মতো পনিতে তার বাঁচার ব্যর্থ আকুতি। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তৈয়ব আলী পাহাড়ায় থাকে…। এরপর অনেক ঘটনা। কালু মাতাব্বরের ছেলেরা এখন গ্রামের বড় নেতা। পাড়ার পাতি মাস্তান থেকে থানার দারোগাও তাদের কথায় চলে। এদিকে তৈয়ব আলী মাঝি থেকে হয়ে যায় তৈয়ব জাইলা।

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে গামছার আঁচলে ভেজা চোখ মুছে নেয় তৈয়ব আলী গাজী। দূর থেকে চৌকিদার হারুনের গলার আওয়াজ ভেসে আসে -হুঁশিয়ার সাবধান… হুঁশিয়ার সাবধান…। হুঁ মাছের মদো মাথা উঁচিয়ে সামনে দেখে তৈয়ব জাইলা- হারুন উন্নত টর্চলাইটের আলোয় সিঁধেল চোর তাড়া করছে। হারুনরা গ্রামের ছিঁছকে চোরদের তাড়া করতে পারে, তাদের আটক করে মাথা নেড়া করতে জানে, আবার গলায় জুতার মালা পরিয়ে পুরো গ্রাম ঘুরাতে পারে; কিন্তু বড় বড় চোরদের কিছুই করতে পারে না। সেই ক্ষমতা হারুনদের নেই। অথচ স্বাধীনের আগে এ গ্রামে চৌকিদার ছিলো না, পুলিশ ছিলো না। দেশ উন্নত হয়েছে। মানুষের আয়-রোজগার, শিক্ষা-দিক্ষা বাড়ছে। আথচ এরপরেও স্বাধীন দেশে চৌকিদার লাগে, পুলিশ লাগে। তাতেও কাজ হয় না, সেনাবাহিনী, বিজিপি, কোসগার্ড, ডিবি, র‌্যাব, চিতা, কোবারা, গোয়েন্দা, ডিএসবি, এনএসআই লাগে। এতোসব বাহিনী কেনো লাগে, সে অংক তৈয়ব জাইলার মাথায় ঢোকে না।
নিজের অজান্তে একটা হাত পেটের ওপর পড়তেই চোখে জল উছলে উঠলো। ফুঁফিয়ে কেঁদে ওঠে তৈয়ব জাইলা। সারাদিন পানি ছাড়া কিছুই পেটে পড়েনি। এটা তার খেয়াল-ই ছিলো না। সেই সকাল বেলা বাড়ি থেকে বেড়িয়েছে। এখনো ফেরা হয়নি। তৈয়ব জাইলার বিয়ের ছয় মাসের মাথায় অজানা অসুখে প্রথম বৌ মারা যায়। কৃষ্ণকালো বউটাকে সে প্রচন্ড ভালোবাসতো। এজন্য দ্বিতীয় বিয়েতে তার মত ছিলো না। গ্রামের মুরব্বিরা অনেকটা ধরে-বেঁধে নদী ভাঙা এতিম হাজেরার সাথে তার বিয়ে দেয়। বুড়া বয়সে বাপ হওয়ার কোনো ইচ্ছেও ছিলো না তার। হাজেরাই হুজুর-কবিরাজের ঝাড়-ফুঁক নিয়ে সন্তানের মুখ দেখেছে। ঘরে দুই মেয়ে থাকার পরেও হাজেরা বেগম আবারও পোয়াতি। অভাবের দিনে বউ পোয়াতি হওয়ায় তৈয়ব বেজায় রাগ। ভাবনায় আবারো প্রাণ আসে তার, কাল সকালে বাড়ির লোকদের কি করে মুখ দেখাবে? তাছাড়া পোয়াতি বউয়ের ঔষধের ত্রিশ টাকা কোত্থেকে জোগান দিবে? এমন সব চিন্তা তৈয়ব গাজীকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।

তিন
বাড়ির উঠোনে শিরদাঁড় করে দাঁড়িয়ে আছে একটা কিশোরী নারকেল গাছ। পুবের রোদ তার মাথায় পা-ফেলার আগেই তৈয়ব জাইলা বাড়িতে হাজির। মুখভর্তি হতাশা নিয়ে গাছের নিচে দাঁড়ালেন। পাতাদের ফাঁক গলে সূর্যের আলো তৈয়ব জাইলার পিঠ স্পর্শ করে। দো’চালা মুলির ঘরটা লক্ষ্য করে দু’পা সামনে বাড়াতেই ছোট মেয়ের কান্নার আওয়াজÑ মা ও মা খাওন দিবানা? আমার ভুখ লাগছে-তো… কিছু খাইতে দেওনা মা… ও-মা কথা কও না কেন? আমার ভুখ লাগছে, ও মা, খাওন দেওনা? হাজেরা বেগম মেয়েকে সন্তনা দেয়- তোর বাজান রাইতের বেলা জাইত্তা মাছ ধরতে গ্যাছে, অহন-ই আইয়া পরবো, তহন তোগরে তেলে ভাজা জাইত্তা মাছ দিমু। মেয়ের কান্নার আওয়াজ কমে আসলে হাজেরা আবারও বলতে থাকে- অহন তোর বইনের লগে ক্ষেতে যা, কয়ডা বুইত্তার হাগ তুইলল্লা আন। মায়ের কথা শেষ না হতেই বড় মেয়ে বলে উঠে- বাজান তো কাইল সহালে গাঙে গ্যাছে, আমাগো কথা কী হের মনে আছে?। মেয়ের মাথার হাত রেখে হাজেরা বেগম বলেন- আছে রে মা আছে। এই তো তোর বাজান আইলো বইলা। তৈয়ব গাজী এবার আর স্থীর থাকতে পারলেন না। দুই হাতে মুখ চেপে হাটু গেড়ে মাটিতে বসে পরেন। তরতর করে ক’ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো চোখ থেকে। কিছুক্ষণ গুমড়ে কাঁদলেন। তারপর আবার সোঁজা হয়ে দাঁড়ানেল। গামছার আঁচলে মুখটা মুছে এবার জোর কদমে পা বাড়ায় নদীর দিকে।

পাশের বাড়ির হালিম গাজী কাঁধে করে কারেন্ট জাল নিয়ে নদী দিকে যাচ্ছেন। তৈয়ব গাজীকে দেখে হঠাৎ ডেকে উঠলো ও কাহা… কই যাও, আরে ও কাহা। তৈয়ব জাইলা মাটিতে দৃষ্টি রেখে জবান খোলেন- হালিম আমি অহন কি করমু কিছুই বুঝতাছি না, আইজ দুইদিন চুলায় আগুন নাই, বউ পোলাপান সব না খাইয়া আছে। জমাইন্না চাইল ডাইল সবই শেষ, অহন আর কোন উপায় দেখতাছি না বাজান। চোহে খালি জুঁনি দেহি।

তেয়ব গাজীর কথা শেষ হলে হালিম শুরু করে- ক্যান? আপনেরে না কইছিলাম আমাগো লগে লন জাইত্তা মাছ ধরতে যাই। আপনে তো আমাগো কথা হুনলেন না। আপনের খালি একই কতা -জাইত্তা মাছ বড় আইলে ইলিশ হইবো। আরে কাহা, জাইত্তা মাছ ইলিশ হইবো, এইডা তো ভবিষৎ। হুনেন মিয়া, এই যে ভবিষ্যৎ ভবিষৎ করতাছেন, এইডা লইয়া অত চিন্ত করনের আমাগো সময় আছে?। এইডা লইয়া চিন্তা করবো বড় লোকেরা, আর এই দেশের নেতারা। দেখেন না আমাগো সাহায্যের টেহা দিয়া হেরা কেমন কইরা তাগো ভবিষৎ করতাছে…। তৈয়ব গাজী চুপ থাকায় ক্ষণিক দম ছেড়ে নেয় হালিম গাজী। দম নিয়ে আবারও বলে- আর তুমি যে সরকারি সাহায্যের খোয়াব দেখতাছ তা আমাগো মতোন গরীবের পেটে ঢুকবো না। এইসব টেকা নেতা আর তাগো চামচাদের পেটে যাইবো। কারণ তারা কোটি টেকা খরচা কইরা নেতা হইছে। আরে কাহা, এইদেশে সরকার বদলাইবো, নেতা বদলাইবো আমাগো ভাইগ্য কোনোদিন বদলাইবো না। সরকার আমাগো গেরামগুলারে সৎ ভাইয়ের নজরেই দেখবো। মন চাইলে আমাগো লগে লও, জাইত্তা মাছ ধরি। হালিম গাজী কথাগুলো এক তরফাই শেষ করলো।

আচমকা চেঁচিয়ে উঠে তৈয়ব জাইলা’হ, আমি যামু। আমি যামু হালিম। তোমাগো লগে আমিও জাইত্তা মাছ ধরমু। তোমগো লগে আমারে নিয়া যাও। আমার বউয়ের পেটেও যে একখান জাইত্তা মাছ বড় হইতাছে। গাঙের জাইত্তা বাঁচাইতে গিয়া ঘরের জাইত্তা আমি মারতে পারুম না। তুমি আমারে নিয়া চলো বাজান। আইজ থেইকা আমিও মাছ ধরুম।

চার
তিন দিন যাবত তৈয়ব জাইলার কোনো খোঁজ নেই। হালিমরা ইঞ্জিন চালিত নৌকায় পুরো মেঘনা নদী তন্ন তন্ন করে খুঁজেছেন। কোথাও তার সন্ধান মিলেনি। এদিকে গেলো রাতে হাজেরা মরা বাচ্ছা জন্ম দিয়েছে। দিনের আলো জেগে উঠার আগেই নবজাতক শিশুর লাশ দাফন করা হয়েছে। হাজেরার অবস্থাও বেশ অসংখ্যাজনক। সরকারি হাসপাতালে শুয়ে মৃত্যু আর স্বামীর অপেক্ষা করছেন। তার শেষ ইচ্ছে ‘মরার আগে স্বামীর মুখটা একনজর দেখাবে’। বাবা-মায়ের জন্যে কেঁদে কেঁদে দুই মেয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ। হালিম ছোট ছোট পায়ে একাটা সাদা কালো পত্রিকা হাতে হাজেরা বের্ডের কাছে দাঁড়ায়। হাজেরা মলিন চোখে হালিমের মুখে দৃষ্টি রাখে। হাজেরার দিকে পত্রিকাটি এগিয়ে ধরে হালিম কাঁদো কাঁদে স্বরে বলে ওঠে- এই দ্যাখো চাচি, পেপারে কাকার ছবি ছাপাইছে। কাকার মুখটা কেমন পূন্নির চান্দের লাহান লাগতাছে। বড় বড় চোখ দিয়ে কেমন চাইয়া আছে কাকায়। মনে হয় অহনই আমারে ধমক দিয়া কইবো ‘কইছিলাম না, আমি জাইত্তা মাছ ধরতে যামু না, তোরা আমাদের জোর কইরা গাঙে নাইমাইছস’। হালিমের গলার স্বর থেমে আসে। তার কন্ঠ বেয়ে আর একটি কথাও নামে না। পেপারটা হাজেরার বুকের উপর রেখে হাঁটুগেড়ে ফ্লোরে বসে পড়ে হালিম। মাথার উপর ঘূর্ণমান বেকুব সিলিং ফ্যান। অনবরত ঘুরে ঘুরে কৃতিম বাতাস ছড়াচ্ছে চারপাশে। হাজেরা দাঁত দিয়ে কাপড়ের আঁচল কাঁমড়ে ধরে কান্নার আওয়াজ লুকানোর চেষ্ট করে। পাশের বের্ডের একজন পেপারটা হাতে নিয়ে পড়তে লাগলো ‘মেঘনায় জাটকা ধরাতে গিয়ে নিখোঁজ তৈয়ব জাইলার লাশ তিন দিন পর উদ্ধার’।

আশিক বিন রহিম

সম্পাদক: কবিতার কাগজ ‘তরী’
বার্তা সম্পাদক: চাঁদনগর
চীপ রিপোর্টার ও সাহিত্য সম্পাদক: দৈনিক চাঁদপুর প্রতিদিন
মোবা: ০১৮১৩৩০৭৭৮৩