চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি, চাপ নয় : সাব্বির

অনেকটা নাটকীয়ভাবে জাতীয় দলে ফিরেছিলেন সাব্বির রহমান। আলোচনা-সমালোচনাও হয়েছে অনেক। তবুও তাঁর উপর আস্থা রেখেছিলেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। ফেরার মঞ্চে সেঞ্চুরি দিয়ে মূল্য দিয়েছেন সেই আস্থার। তাতে দরজা খুলেছে বিশ্বকাপের। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ খেলতে বুধবার দেশ ছেড়েছেন তিনি। যাওয়ার আগে নাগরিক বার্তার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন, নিজের বিশ্বকাপ পরিকল্পনা নিয়ে। চাপহীন খেলে ভালো করার প্রত্যয় ফুটে ওঠে তাঁর মুখে।

নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন, অনুভূতি কেমন?

সাব্বির : অবশ্যই বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে খেলা দারুণ এক অনুভূতি। আর বেশিভালো লাগছে যে দেশের হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেয়েছি। ২০১৫ বিশ্বকাপ ছাড়াও চ্যাম্পিয়নস ট্রফি এবং অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছি। তাই বলা যেতে পারে এটি আমার তৃতীয় বিশ্বকাপ। তাই আমার খুব ভালো লাগছে যে, বাংলাদেশের হয়ে আমি এতবার বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাচ্ছি।

প্রথম বিশ্বকাপ যখন খেলেছিলেন তখন তরুণ ছিলেন। এবার বেশ পরিণত। আগের তুলনায় অভিজ্ঞও। এতে দায়িত্বের চাপ কি বেশি মনে হচ্ছে?

সাব্বির : ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ যেটি গেছে সেটি ছিল খুবই আবেগের। তখন একদমই নতুন ছিলাম। অনেক রোমাঞ্চ কাজ করেছে। দায়িত্ব সম্পর্কে তেমন কিছু বুঝতে পারিনি। কিন্তু এবার বিষয়টা অন্য। আগের বিশ্বকাপের সঙ্গে এই বিশ্বকাপের দায়িত্বটা ভিন্ন। এ ছাড়া আগের সাব্বিরের সঙ্গে এখনকার সাব্বিরের পার্থক্য রয়েছে। তখন আরো তরুণ ছিলাম। এখনো  তরুণ, তবে অনুভূতি ভিন্ন। এখন কিছুটা পরিণত হয়েছি। অনেককিছু শিখেছি। তাই এই বিশ্বকাপে আআরো ভালোভাবে খেলার চেষ্টা করব অবশ্যই। দায়িত্বকে ভালোভাবে নিচ্ছি, চাপ হিসেবে নয়।

নিজেকে প্রমাণ করার জন্য এই আসরকে কতটা উপযুক্ত মনে হয়?

সাব্বির : অবশ্যই এটি বিশ্বকাপের মঞ্চ। এমন বড় টুর্নামেন্টে সবাই চায় ভালো কিছু করতে। আমিও চাই ভালো কিছু করতে। গত বিশ্বকাপে আমি মোটামুটি ভালো খেলেছিলাম। যদিও প্রথম দুটি ম্যাচ বেশ খারাপ গেছে। তারপরও মেলবোর্নে আমার প্রথম ফিফটি যা অভিষেক ফিফটি ছিল। বিশ্বকাপে এটা আমার খুব ভালো একটা স্মৃতি হয়ে আছে। এবার বিশ্বকাপ হবে ইংল্যান্ডে। আবহাওয়া এবং কন্ডিশন সম্পর্কে আমার জানা আছে। এর আগে ইংল্যান্ডে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলেছি। এই বিশ্বকাপ আমার জন্য অবশ্যই নিজেকে চেনানোর সেরা আসর হবে। আর আমিও চেষ্টা করব সেরাটা দিয়ে নিজেকে মেলে ধরতে। দলের জয়ে ভূমিকা রাখতে যতটা সম্ভব আমি চেষ্টা করে যাব।

এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল বেশ অভিজ্ঞ, আপনার কি মনে হয়?

সাব্বির : অবশ্যই, আমাদের দলের সিনিয়র খেলোয়াড়রা অনেক অভিজ্ঞ। এ ছাড়া আমরা যারা তরুণ আছি তাঁরাও অনেক বড় বড় টুর্নামেন্ট খেলেছি। অনেকে হয়তো প্রথম বিশ্বকাপ খেলছে। আমার কাছে এই বিশ্বকাপটা একটা টুর্নামেন্টই মনে হয়। আর এখানে প্রতিটি দলই খেলবে। আমরা তরুণরা ছয়জন অবশ্যই সিনিয়র পাঁচজনকে সাহায্য করতে পারব। সবাই মিলে নিজেদের সেরাটা দিতে পারলে ভালো কিছু হবে বলে আশা করছি।

নতুনদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী থাকবে?

সাব্বির : আমি যখন ২০১৫ সালে বিশ্বকাপে নতুন ছিলাম তখন আমার ভূমিকা ছিল স্বাধীন-চাপমুক্তভাবে খেলা। এবার যারা নতুন বিশ্বকাপে যাচ্ছে তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, তারাও যেন চাপমুক্ত ক্রিকেট খেলে। আর বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা যখনই চাপমুক্ত ক্রিকেট খেলে তখনই বাংলাদেশ দল খুব ভালো খেলে।

নিজের প্রথম বিশ্বকাপের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

সাব্বির : প্রথম বিশ্বকাপের দুটি স্মৃতি আমার খুব মনে পড়ে। একটি আমার প্রথম বিশ্বকাপে মেলবোর্নে ফিফটি করেছি সেটা। যদিও ম্যাচটি হেরে গিয়েছিলাম। আর পরেরটি হচ্ছে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আমরা কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছি। এই দুটি স্মৃতি বিশেষভাবে মনে থাকবে।

ইংল্যান্ডের মাঠে খেলা। বেশ হাইস্কোরিং ম্যাচ হবে। আপনার ওপর বড় দায়িত্ব থাকবে। এর জন্য আপনি নিজে কতটা প্রস্তুত?

সাব্বির : আসলে চ্যালেঞ্জটা অনেক বড়। আমি চ্যালেঞ্জ নিতে অনেক পছন্দ করি। তবে চাপ নিতে নয়। যেহেতু আমি  সাত নম্বরে ব্যাটিং করব। ম্যাচ শেষ করে আসতে হবে। সেহেতু দ্রুত রান তোলার দায়িত্ব নিতে হবে।  দুই আড়াই মাস প্রিমিয়ার লিগ খেলেছি। আলদা অনুশীলন করেছি। এটা নিয়ে আলাদা কাজ করেছি। মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছি। ইনশা আল্লাহ বাংলাদেশ টিমে আমাকে যে রোল দিবে, আমি সেটা সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করব।

বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য আয়ারল্যান্ড সফর কতটা কার্যকরী মনে হয়?

সাব্বির : ইংল্যান্ড-আয়ারল্যান্ডের আবহাওয়া এবং কন্ডিশন প্রায় একই রকম। যদিও উইকেট কিছুটা ভিন্ন। তবে এই সফরটা আমাদের জন্য খুবই ভালো হবে। বলতে পারেন খুব ভালো প্রস্তুতি হবে। আয়ারল্যান্ডে হয়তো সবুজ মাঠ দিবে। যেটা বিশ্বকাপে নাও থাকতে পারে। কিন্তু ওদের আরো মাঠ আছে যেগুলো ব্যাটিং সহায়ক উইকেট হবে। আর আমরা যে উইকেটে অনুশীলন করব সেখানে মানিয়ে নিতে পারলে আশা করি আমাদের বিশ্বকাপ খেলাটা অনেক ভালো হবে।

আপনার প্রতি অধিনায়কেরআলাদা কোনো উপদেশ আছে?

সাব্বির : ভাইয়া আমাকে শুধু একটাই কথা বলেন। তোকে যেখানে নামাব, তোকে যে রোলটা দেওয়া হবে সেটা ঠিকমতো করতে পারলেই আমরা খুশি। যেটা নিয়ে শেষ দুই মাস কাজ করেছি। স্টাইক রোটেট করে খেলা এবং বড় স্কোর করা এবং কীভাবে ভালো ফিনিশিং করা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করেছি। এটা ভালো মতো করতে পারলে আমার মনে হয় তাঁরাও খুশি হবেন।

টানা নয় ম্যাচ খেলতে হবে। ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কতটা কঠিন?

সাব্বির : টানা নয়টি ম্যাচ খেলা অনেক কঠিন। তবে যদি ম্যাচ বাই ম্যাচ চিন্তা করি তাহলে এটা খুব সহজ হবে। লম্বা চিন্তা না করে যদি ধীরে ধীরে চিন্তা করে আগাতে পারি তাহলে আমরা খুব ভালো করব। প্রতিদিন আমরা অনুশীলন করতে পারলে আমরা আরো উন্নতি করতে পারব। আশা করা যায় ইনশা আল্লাহ আমরা ভালো করব।

ফাইনাল মঞ্চে আমাদের বেশ মানসিক দুর্বলতা থাকে, সব কিছু মিলিয়ে আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশ দলের বিশ্বকাপ জেতার সামর্থ্য রয়েছে?

সাব্বির : শেষ বিশ্বকাপে আমরা কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছি। এরপর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেমিফাইনাল খেলেছি। কয়েকবার এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলেছি। তাই আমি মনে করি, আমাদের থেকে বিশ্বকাপ বেশি দূরে নয়। হাতের নাগালেই রয়েছে। তবে আমাদের আরো অনেক কষ্ট করতে হবে। ছোটখাট ভুলগুলো শুধরে খেলতে হবে। মানসিকভাবে শক্ত হয়ে খেলতে পারলে বিশ্বকাপ জেতাটা অসম্ভব কিছু হবে বলে আমি মনে করছি না।

মানসিকতার কথা বললেন, আপনি নিজে কতটা মানসিকভাবে প্রস্তুত?

সাব্বির : আগের চেয়ে মানসিক দিক দিয়ে অবশ্যই এখন বেশি শক্ত। যেকোনো কিছুতে মোমেন্টাম ধরে রাখার শক্তিও এখন আছে। তা ছাড়া আমরা অনেক ফাইনাল ম্যাচ খেলেছি। যেহেতু বড় টুর্নামেন্ট, এখানে ছোট বা বড় টিম বলতে কিছু নেই। এখানে যদি আমরা ১১ জন মিলে সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলি, তাহলে আমরাই জিতব।

আপনার ব্যক্তিগত কোনো টার্গেট?

সাব্বির : আসলে আমি টার্গেট ফিক্সড করলে সেটা কখনোই হয় না। আগে থেকে ভেবে-চিন্তে কাজ করে আমি কখনো সফল হইনি। তাই সকালে ঘুম থেকে ওঠে যেটা প্লান করি, সেটা বিকেলে পূরণ করার চেষ্টা করি। আর টুর্নামেন্টে যদি ম্যাচ বাই ম্যাচ খেলি তাহলে ভালো কিছু হবে। নিজেকে ধরে রাখতে পারব। এক ম্যাচে খারাপ করলে অন্য ম্যাচ দিয়ে কাভার করতে পারব।

ড্রেসিং রুমে আলাদা কোনো পরিকল্পনা হয়েছে?

সাব্বির : তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা সবসময় বিশ্বাস করি যে, আমরা ভালো কিছু করব। আমরা যদি সবাই মিলে টিম হয়ে খেলতে পারি, তাহলে তাহলে ভালো করা অসম্ভব নয়। সবার আগে আমাদের টিম হিসেবে খেলাটা বেশি দরকার।

কোচের আলাদা কোনো পরামর্শ?

সাব্বির : আমাদের সবার সামনে একটিই পরিকল্পনা, সেটি হলো ভালো ক্রিকেট খেলা। আমাদের বড় থিম হলো আমরা বিশ্বকাপ জিততে চাই। আমরা ঠিক সময় অনুশীলন করছি। এত রোদের মধ্যে আমরা খুব পরিশ্রম করেছি। বিশ্বকাপ জেতার লক্ষ্য নিয়েই এগোতে চাই। কোচের পরামর্শ তেমনটাই। তিনি চান, বিশ্বকাপ জেতার মতো মানসিকতা আমাদের মধ্যে তৈরি হোক।

ভক্তদের উদ্দেশে আপনার কিছু বলার আছে?

সাব্বির : আপনারা আমাদের সবসময় যেভাবে সমর্থন করেছেন, সেভাবেই আমাদের সমর্থন দিয়ে যাবেন। আশা করি ইনশা আল্লাহ একদিন আমরা বিশ্বকাপ জিতব। আপনাদের আস্থার মূল্য দিতে আমরা নিজেদের সেরাটা দেব। আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন। দোয়া করবেন, এই দলটা যেন আপনাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। আপনাদের সমর্থন আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

(নাবা/২ মে/ হিমু)