চাঁদপুরে একটি পরিবারের কাছে জিম্মি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

চাঁদপুর সদর উপজেলার ৯নং বালিয়া ইউনিয়নের ৬ নং ওয়া‌র্ডের ৭৭নং পশ্চিম সাপদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি জিম্মি হয়ে রয়েছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর কাছে। স্কুলের জায়গা দখল করে চলছে ইজারা বাণিজ্য।

বিদ্যালয়টির জায়গা মোট ৩৩ শতাংশ হলেও স্কুলের ভবন ব্যাতিত বাকি জায়গা দখল করেছেন বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মৃত তাজুল ইসলাম খানের দুই পুত্র আনোয়ার হোসেন খান (মানিক) ও মনির হোসেন খান।

স্থানীয়দের কাছে জানা গেছে প্রভাব খাটিয়ে জোরপূর্বক স্কুলের দাতা সদস্য হয়েছেন মৃত তাজুল ইসলাম খানের পুত্র মনির হোসেন খান।

জানা গেছে, ৭৭নং পশ্চিম সাপদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুবিধার্থে ২৩৫ খারিজ ৫৮২ দাগে ৩৩ শতাংশ পরিমান খতিয়ান খোলা হয়। তৎকালীন সময়ে যা স্কুলের স্বার্থে হিন্দু দত্তরা জ‌মি‌টি উন্মুক্ত করে দেয়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার চাঁদপুর সদর ৭৭নং পশ্চিম সাপদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দক্ষিণ নামে খতিয়ান পরিবর্তন হয়ে ৮নং খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়। স্কুলের এই ৩৩ শতাংশ জমি ৫৮২ দাগে ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারীর ১৬ তারিখে বিজ্ঞ সার্ভেয়ার দ্বারা মাপ জরিপ করা হয়েছিলো। তৎকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন মৃত. তাজুল ইসলাম খান। ঐ মাপ জরিপের সময় মুক্তিযোদ্ধা সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম রাজ্জাকুল হায়দার খানের কনিষ্ঠ আত্মিয় শরিফ উদ্দিন পাটওয়ারী, সভাপতি তাজুল ইসলাম খান, হেদায়েত উল্লাহ খান ও সাবেক ইউপি সদস্য তাজুল ইসলাম শেখ উপস্থিত ছিলেন। ঐ মাপ জরিপে ৩৩ শতাংশ পরিমান স্কুলের জায়গা ছিলো।

গত বছরের মার্চের ২০ তারিখে সার্ভেয়ার কবির আহমেদ শেখ স্কুলের ৩৩ শতাংশ জমি জরিপ করে তাহার স্বাক্ষরে একটি হাত নকশা করে দেয়। কিন্তু বিদ্যাল‌য়ে এখন ২০ শতাংশ জ‌মি আ‌ছে ম‌র্মে প্রধান শিক্ষক জানান।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের জায়গা দখল করে জমি ইজারা লাগিয়ে টাকা আয় করছেন উক্ত বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মৃত তাজুল ইসলাম খানের দুই পুত্র আনোয়ার হোসেন খান (মানিক) ও স্কুলের কথিত দাতা সদস্য মনির হোসেন খান।

কিভাবে দাতা সদস্য হয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি নাগরিক বার্তাকে জানান, আমার দাদা এই স্কুলে জমি দান করেছেন, তাই আমি এই স্কুলে দাতা সদস্য হয়েছি। স্কুলের ৩৩ শতাংশ পরিমান জমি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নাগরিক বার্তাকে জানান, এখানে স্কুলের কোন জায়গা নেই। যা আছে ওইটা আমাদের জায়গা। আমরা স্কুলকে জায়গা লিখে দেয়নি।

তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, স্কুলের জায়গা নেই। যেকোনো সময় মামলা করে স্কুল উঠিয়ে দিতে পারি আমরা এবং সাবেক দুদক কর্মকর্তা ওনার আত্মীয় ও ওনাদের অনেক পাওয়ার আছে বলেও হুমকি দেন। স্কুলের ৩৩ শতাংশ পরিমান জায়গার সীমানা দেখতে চাইলে দখলদার ও স্কুলের দাতা সদস্য মনির হোসেন খান কোন সীমনা দেখাতে পারেননি এবং স্কুলের দাতা সদস্য মনির হোসেন খান কোন ধরনের প্রয়োজনীয় দলিলপত্র দেখাতে পারেননি।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাসুদা বেগম নাগরিক বার্তাকে জানান, দাতা সদস্য মনির হোসেন খান ও তার বড় ভাই আনোয়ার হোসেন খান (মানিক) স্কুলের জায়গা দখল করে আছেন, কিছু দিন আগে স্কুলের জায়গা থেকে মাটি আনতে গেলে স্কুলের সাবেক সভাপতি মৃত তাজুল ইসলাম খানের পুত্র কথিত দাতা সদস্য মনির হোসেন খান বাঁধা দিয়ে বলে এখানে স্কুলের কোন জায়গা নেই, আর আমরা লিখেও দেয়নি।

তিনি বলেন, স্কুলের সাবেক সভাপতি মৃত তাজুল ইসলাম খানের পুত্র আনোয়ার হোসেন খান (মানিক) পুলিশ হওয়ায় সেই প্রভাব খাটিয়ে ও তাদের বাড়িতে সাবেক দুদক কর্মকর্তা আছে বলে স্কুলে ঢুকে আমার সঙ্গে ও স্কুলের অন্যন্য শিক্ষক/শিক্ষিকার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে।

তিনি আরও বলেন, তথাক‌থিত দাতা সদস্য মনির হোসেন খান স্কুলের স্বার্থে কখনো কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা করেননি। সে ও তার বড় ভাই আনোয়ার হোসেন খান (মানিক) স্কুলের জায়গা দখল করে ওই জমি ইজারা লাগিয়ে নিজেই টাকা নিচ্ছেন। স্কুলের জায়গায় একাধিকবার মাপ জরিপ করে সীমানা দেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু দাতা ও ইজারাদার মনির হোসেন খান ওই সীমানা উঠিয়ে নিয়ে যায়।

স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত উচ্চ বিদ্যাল‌য়ের শিক্ষক হাবিবউল্লাহ পাটওয়ারী নাগরিক বার্তাকে বলেন, ৭৭ নং পশ্চিম সাপদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মৃত তাজুল ইসলাম খানের উপস্থিতিতে স্কুলের ৩৩ শতাংশ পরিমান জায়গা মাপ জরিপ করে সীমানা করে দেওয়া হয়েছে। এখন এই স্কুলের ৩৩ শতাংশ পরিমান জায়গা তার ছেলে মনির হোসেন খান তার পৈত্রিক সম্পত্তি দাবী করছেন। যা স্কুলের স্বার্থে হিন্দু‌ দত্তদের জ‌মি উন্মুক্ত করা হয়েছিলো। স্কুলের স্বার্থে এই জায়গা সঠিকভাবে মাপ জরিপ করে স্থায়ী সীমানা করে দেওয়ার জোর দাবী জানান তিনি।

চাঁদপুর সদর উপজেলার ৯নং বালিয়া ইউনিয়নের ৬ নং ওয়‌ার্ডের ৭৭নং পশ্চিম সাপদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সম্পত্তি জবরদখলকারী ব্যাক্তি যেই হোক তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি জবরদখল মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকার সর্বস্ত‌রের লোকজন।

বালিয়া ইউনিয়নের এলাকাবাসী জানান, স্কুলের জায়গা জবরদখল মুক্ত করে নতুন ভবন ও ছাত্র/ছাত্রীদের খেলার মাঠ করে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। এ বিষয়ে এলাকার মানুষ বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু ম‌নির কাছে জোর আবেদন জা‌নি‌য়ে‌ছেন।

নাবা/ডেস্ক/ওমর