গান গেয়ে ভাইরাল সুবিধাবঞ্চিত শিশু রানা

ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি আড়াই মিনিটের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, ১০ বছরের এক সুবিধাবঞ্চিত শিশু তার জীবনের বাস্তব চিত্র র‌্যাপ গানের মাধ্যমে তুলে ধরছে। ৪০ লাইনের গানের লিরিক্সে ফুটে উঠেছে পথশিশুর অবহেলা আর সংগ্রামের কথা; ক্ষুধার জালার নিদারুন কষ্টের কথা; শৈশবে খেলনা নিয়ে খেলতে না পারার কথা। গানটি সবার নজর কাড়ার পাশাপাশি মানবিক আবেদন সৃষ্টি করেছে। আর তাই মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায় ‘ঢাকাইয়া গাল্লি বয়’ নামের গানটি। গানটিতে কন্ঠ দিয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশু রানা মৃধা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রানা রাজধানীর কা

মরাঙ্গীরচর পূর্ব রসূলপুর এলাকায় তার মায়ের সঙ্গে টিনসেড বাসায় বসবাস করে। তারা দুই ভাই। রানার ১৪ বছর বয়সী বড় ভাই কামরাঙ্গীরচর এলাকার একটি ওয়ার্কশপে কাজ করে। মা গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। বাবা থাকেন ফরিদপুরে। সেখানে তিনি মাছ ধরার পোলো তৈরি করেন। অভাবের সংসারে দু’বেলা পেট ভরে ভাত খাওয়াই কঠিন। সেখানে পড়ালেখা তো বিলাসিতার শামিল। তাই বাধ্য হয়ে রানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফুল বিক্রি করে সামান্য কিছু আয়ের চেষ্টা করতো। দিনে ১ থেকে দেড়শো টাকা আয় হতো রানার। তবে সেই দিনগুলো এখন রানার জীবনের অতীত।

বর্তমানে সকলের প্রিয় মুখ হয়ে উঠেছে রানা। এখন আর কারো কাছে হাত পাততে চায় না সে। পড়ালেখা করে বড় কিছু হতে চায়। কথা হয় রানার সঙ্গে। বলেন, ‘স্কুলে যাইতে চাই। ভালোমতো পড়াশুনা করতে চাই। কিন্তু ট্যাকা নাই। ইচ্ছা আছে, পড়াশুনা করুম। ডাক্তার হমু। গান গামু। পড়াশুনা আর গান এক লগে চালিয়ে যামু’

আলোচিত গানটির কথা, রেকর্ড ও কম্পোজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মাহমুদ হাসান তবীব। নাগরিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমি ছোট বেলা থেকেই র‌্যাপ গান নিয়ে কাজ করি। ভিন্ন ধারার র‌্যাপ গান লিখছি। কয়েকটি গান তৈরী করেছি। তবে প্রকাশ করিনি। র‌্যাপ গান নিয়ে আরও কাজ করতে চাই।

রানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় বলিউডের ‘গাল্লি বয়’ মুভি থেকে আমি অনুপ্রানিত হই। তখন থেকেই এমন একজনকে খুজঁছিলাম। টিএসসি বা ঢাবি ক্যাম্পাসের যেখানেই যেতাম বাচ্চারা টাকা চাইতে আসলে আমি তাদেরকে প্রশ্ন করতাম। তোমাকে ক্যানো টাকা দিবো? টাকা দেওয়ার আগে আমি সব সময় তার প্রতিভা যাছাই করতাম। গত ২৩ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলের সামনে প্রথমবার রানাকে দেখি। প্রথমে রানা এসে টাকা চায় এবং মোটরসাইকেলে ঘুরতে চায়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি গান জানো? তখন সে একটি র‌্যাপ গান শোনায়। গানটি অতো ভালোভাবে গাইতে না পারলেও রানার ভোকাল শুনে আমি বুঝতে পারি, সে ভালো করবে।

এর পরে রানাকে আমার এক বন্ধুর বাসায় নিয়ে যাই।’ রানার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সব শুনে সেই বিষয়ের উপর গান লেখা হয়। ৪০ লাইনের গানে রানার পাশাপাশি তবীব নিজেও কন্ঠ দেন। গান রেকর্ড করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, সদরঘাট এবং কামরাঙ্গীচর এলাকায় ঘুরে ঘুরে ভিডিও তৈরি করি। ভিডিও করতে তবীবের সঙ্গে কাজ করেন তার বন্ধু রাইহান উদ্দিন। একরাতের এডিটিংয়ের পরে ঢাবি মেট্রো–১৯২১ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয় গানটি। আর এর পরেই ভাইরাল হয়ে যায় ঢাকাইয়া গাল্লি বয় নামের গানটি।

তিনি এখনই রানার হাত ছেড়ে দিতে চান না। রানাকে ভালো একটি স্কুলে ভর্তি করার পাশাপাশি একজন ভালো শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস ব্যক্ত করেন তবীব। তিনি বলেন, ‘আমি রানার দায়িত্ব নিয়েছি। তার পড়াশোনার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তাকে ভালো শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করে যাবো। রানার জন্য আরও কয়েকটি গান লিখেছি। একটি গানের রেকর্ড প্রায় শেষের দিকে। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রকাশ করা হবে।’

রানার মতো তবীবেরও পড়াশোনার চাপ সামলে গান নিয়ে কাজ করে যাওয়ার ইচ্ছে। গান নিয়ে কাজ করা তার স্বপ্ন। র‌্যাপ গানের নতুন একটি ধারা সৃষ্টি করতে কাজ করছেন বলে জানান মানিকগঞ্জের এই তরুণ।

নাবা/১০জুন/রাজু/তারেক