গাজিপুরেও আলো ছড়াচ্ছেন এসপি শামসুন্নাহার

‘শামসুন্নাহার’ নামটি শুনলে চাঁদপুরের এমন কোন এলাকার মানুষ নেই যে তাকে চেনেন না।বিশেষ করে নারীদের কাছে যেন আশ্রয়ের শেষ স্থল হয়ে উঠেছিলেন তিনি।সাধারন মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় যেন নিজের নামটি স্বর্ণক্ষরে গেঁথে দিয়েছিলেন।দুই-দুইবার জাতীয় পুলিশ সপ্তাহে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে আলোচনায় এসেছিলেন। বর্তমানে তিনি গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার হিসাবে নিয়োজিত আছেন। সেখানে গিয়্ওে তাঁর কাজের ধারাবাহিকতা একই রেখেছেন। কিন্তু একজন নারী হয়েও কিভাবে তিনি মানুষের হৃদয় জয় করতে পেরেছেন এত সহজে সেটাই যেন ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনে। পুলিশের এ চৌকশ নারী কর্মকর্তাকে নিয়ে লিখেছেন রিফাত কান্তি সেন………….

চাঁদপুরে জনপ্রিয়তাঃ চাঁদপুরে পুলিশ সুপার থাকাকালীন তার ব্যতিক্রমী উদ্যেগের কারণেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।মাদক,বাল্যবিবাহ,যৌতুক,নারী নির্যাতনের মত স্পর্শকাতর বিষয় গুলোতে তার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহনের কারণেই তিনি সাধারনের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পেরেছিলেন। কর্মদিবসে তার কার্যালয়ের সামনে নারীদের বিশাল লাইন দেখা যেত।অনেকটা এমন যে পুলিশ সুপারের কাছে আসলেই সকল সমস্যার সমাধান।আসলেই তা ই। পুলিশ সুপারের কাছে এলেই সমাধান পেত ভূক্তভূগীরা। আর এ জন্য নারীদের ভিড় লেগে থাকতো চাঁদপুর পুলিশ সুপার কার্যালয়ে।২০১৫ সালের ১৫ ই অক্টোবর চাঁদপুর পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন অভিযোগ সেল খোলেন তিনি।সেখানে নারী ও শিশুদের অভিযোগ করলে সেবা প্রদানে তিনি ছিলেন বদ্ধ পরিকর।

কর্তব্যে ছিলেন অনড়ঃ একজন সৎ ও আদর্শবান পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার কারণে তিনি ছিলেন সাধারনের কাছে একজন অসাধারন ব্যাক্তি। একজন নারী হয়েও তিনি যেন পুরুষের সাথে সমান তালে লড়েছেন।কর্তব্যের কাছে তিনি ছিলেন অনড়।শুধু তাই নয় মাদক ও বাল্যবিবাহ বিরোধী ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করে বেশ প্রশংসা কামিয়েছেন। তার কর্মকান্ডে জনগন যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছেন। অনেক জটিল সমস্যা গুলোর তিনি সমাধান দিয়েছেন বিচক্ষনতার সহিত। গণমানুষের নয়নের মণি শামসুন্নাহার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহন করেছিলেন মাদকের বিরুদ্ধে। সন্ত্রাস এবং জঙ্গীবাদ দমনেও তার ভূয়সী প্রশংসা করছেন সাধারন জনতা। তার চাঁদপুর ত্যাগের কথা শুনে সাধারণ মানুষের মনে বিষাদ জন্ম নিতে শুরু করেছে।তিনি গাজীপুরের পুলিশ সুপার হিসাবে যোগদান করার কথা রয়েছে। অনেক দিনের বিরোধিতা নিরশনে ও শামসুন্নাহারের পদক্ষেপ ছিল প্রশংসনীয়।বিরোধিতা নিরশন করে পরিবার গুলোকে মিলিয়ে দিয়েছেন।বহু বছরের শত্রুতাকে বন্ধুত্বে পরিনত করতে পেরেছিলেন তিনি।চাঁদপুরের প্রতিটি থানায় যেন পুলিশিং সেবা ছিল শতভাগ।

চাঁদপুরে তার কার্যক্রম:

কর্মদিবস গুলোতে ভোর থেকেই শত শত নারী,শিশুদের চাঁদপুর পুলিশ সুপার কার্যালয়ে জমায়েত হতে দেখা যেত। বাল্যবিবাহ, যৌতক,নারী নির্যাতন বন্ধে তিনি ছিলেন নারীদের নিকট প্রাণ স্বরূপ। নারীদের অধিকার অক্ষুন্ন রাখতে তিনি ছিলেন বলিষ্ট কন্ঠস্মর। স্কুল, কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা যেন মাদকে আকৃষ্ট না হতে পারে সেদিকে ছিল তার তীক্ষè নজর।মাদক,বাল্যবিবাহ ও জঙ্গিবাদ বন্ধে সতর্কতা মূলক নানা কার্যক্রমের মধ্যে ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা ছিল তার অন্যতম অসাধারন উদ্যেগ।বিরোধ নিরোশনে অনেকেরই সম্পর্কে ঘটেছে উন্নতি। ঝামেলায় না জড়িয়ে লোকদের মিলিয়ে দিতে পারাকেই তিনি আনন্দের বলে মনে করতেন।খেতে-খামারে যে ট্রাক্টর চালানোর কথা সে ট্রাক্টর রাস্তায় চলে মরণঘাতি এক দানব পরিনত হওয়ায় সেগুলো রাস্তায় বন্ধ করার ব্যাপারে তিনি ছিলেন বদ্ধ পরিকর। কোন বাঁধাই তাকে দমিয়ে রাখতে পারে নি।

গাজীপুরে এখন যেসব কার্যক্রম চালাচ্ছেন তিনি:

গাজীপুরে গিয়ে ও তিনি তার কাজের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখে চলেছেন। মাদক,বাল্যবিয়ে,সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ নিরসনে জিরোটলারেন্স নীতি গ্রহন করে এগিয়ে যাচ্ছেন। গাজীপুরে নিযুক্ত হয়েই তিনি হোটেলে অসামাজিক কাজ বন্ধ করতে অভিযান পরিচালনা করছেন। চাঁদপুরের মত সেখানেও তিনি সফলতার মুখ দেখছেন। তার কার্যক্রমকে স্বাগত জানিয়েছেন গাজীপুরের আপামর জনসাধারণ।

কে এই শামসুন্নাহার?
ফরিদপুর সদর উপজেলার চর মাধবিয়া ইউনিয়নের অগ্নি কন্যা শামসুন্নাহার।২০০১ সালে বিসিএস পাস করে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে সহকারী পুলিশ সুপার হিসাবে যোগদান করেন। মানিকগঞ্জ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ,পুলিশ সদর দপ্তর, ট্যুরিষ্ট পুলিশ সহ বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করে পুলিশ বিভাগে প্রশংসিত হন। ২০০৯-১০ সালে পূর্ব তিমুরে জাতিসংঘ মিশনের মাধ্যমে পূর্ব তিমুর জাতীয় পুলিশের মানব সম্পদ উন্নয়ন কর্মকান্ডে সততার সহিত দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১-১৪ সাল পর্যন্ত জাতি সংঘের শাখা অফিস ইতালিতে উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।সর্বশেষ তিনি চাঁদপুরের পুলিশ সুপার হিসাবেও দায়িত্বরত ছিলেন।বর্তমানে তিনি গাজিপুর পুলিশ সুপার হিসাবে সেবা প্রদান করবেন।

জাতিসংঘে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করার কারণে তিনি ৭ বার জাতিসংঘ পদক লাভ করেন। ২ বার আইজি ব্যাজ সহ পুলিশের সেবা প্রদানকারী হিসাবে বিভিন্ন পদকে ভূষিত হন। এছাড়া পিপিএম পদক ও লাভ করেন। উইম্যান এওয়ার্ড ও তিনি লাভ করে। নানা গুণে গুণান্নিত এসপি শামসুন্নাহারের কন্ঠও চমৎকার। গান গেয়ে মাঝে মাঝে তিনি জানান দেন ব্যস্ততার মাঝেও বিনোদনের ক্ষেত্রে যে তার গান মানুষের মনে প্রশান্তি যোগায় তা তিনি প্রমাণ করেছেন। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে টানা দু’বার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ২০১৬ সালে দেশের প্রথম নারী হিসাবে তিনি জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে পুলিশ সপ্তাহের প্যারেডে নেতৃত্ব দিয়ে নারী মর্যাদাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলেন।

এমএমআ/