কেমন আছে আমাদের স্বাধীনতা…

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠলেই আমরা বলি ‘ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি’- কথাটা ঐতিহাসিক সত্যি । কিন্তু আমরা কি এই কথাটার মানে ভালোভাবে বুঝি? বোঝার চেষ্টা করি? ত্রিশ লক্ষ মানুষ ঠিক কতো, এর জন্য কী পরিমাণ জায়গা লাগে সে ব্যাপারে কি আমাদের স্পষ্ট কোনও ধারণা আছে? ‘দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম যে অনেক অনেক মানুষের কষ্ট আর ত্যাগের সমষ্টি- তা কি আমরা ধারণা করতে পারি? না, তা পারিনা। আর পারিনা বলেই আমরা স্বাধীনতার মূল চেতনা থেকে সরে গেছি।

স্বাধীনতার পর প্রায় চার যুগ পেরিয়ে এসে একটি প্রশ্নই আসে, কেমন আছে আমাদের স্বাধীনতা? সত্যিই কি পেলাম এই স্বাধীন বাংলাদেশে?

স্বাধীনতার সংগ্রাম এর উৎপত্তি, পরাধীন দেশে তখন আমরা কেমন ছিলাম, কীভাবে স্বাধীনতার যুদ্ধের শুরু হলো, কারা যুদ্ধ করলো, কীভাবে যুদ্ধ করলো, অস্ত্র পেলো কোথায়, ট্রেনিং পেলো কোথায়, তাদের খাবার জোগাড় হতো কীভাবে, পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা ঠিক কি ধরনের ছিল, কারা পাকিস্তানিদের সহায়তা করেছে, রাজাকার কারা, তাদের ভূমিকা কি ছিল, এ দেশের নারীরা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কি ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছে, কতটা অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছে, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য কি ছিল, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে কোন দেশ কতটা সাহায্য করেছে, কারা আমাদের বিরোধিতা করেছে- এসব প্রশ্নের উত্তর অনেকেরই জানেনা, জানতেও চায়না।

স্বাধীনতা নিয়ে বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের কোনো উপলদ্ধি নেই। আমরা অনেকটাই হেলাফেলা করে স্বাধীনতাকে দেখি। অনেকে এমনটাও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এসব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে আর না, ত্রিশ লক্ষ লোক শহীদ হয়েছেন, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, তাতে আমাদের কি লাভ? আমরা চাকরি চাই। কোটা বিলোপ চাই। আবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে বলে, এতো বছর আগের একটি ঘটনা, সব বয়ষ্ক মানুষ। এদের বিচার করে কি হবে? এসব প্রশ্নের কারণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাদের মাঝে নেই। ইতিহাস সঠিকভাবে জানে না।

পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মভিত্তিক কোন রাজনীতি হবেনা, সামাজিক বৈষম্য থাকবেনা, অর্থনৈতিক মুক্তি, সেই সঙ্গে নারী পুরুষের সমান অধিকার। সব মিলিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল বাংলাদেশ গঠন করা। যা আমরা ভুলে গেছি। আমরা আরো ভুলে গেছি ৭২ এর সংবিধান। যার মধ্যে ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্রবাদের আধুনিক ধারণা ।

আমরা স্বাধীনতার চার যুগ পেরিয়ে দেখছি, আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য থেকেও সরে গেছি। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈষম্য আরও তীব্র হয়েছে। ধর্মের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইসলামের দোহাই দিয়ে আমাদের মূল সংষ্কৃতিকে নষ্ট করা হচ্ছে। বিভিন্ন মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি বা দলের জন্ম হচ্ছে। রাজনীতিবিদরা আবার প্রতিনিয়ত তাদের দরজাতেই ধরনা দিয়ে থাকেন।

দলীয় কোন্দলের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত। সেই সঙ্গে আছে গুম খুনের রাজনীতি। সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেয়া। রাস্তাঘাটের বিশৃংখল অবস্থা। কর্ম সংস্থানের অভাবে বিপর্যস্ত তরুণ সম্প্রদায়। চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন। সামাজিক পরিচিতি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভাজনের আঘাতে বিপন্ন। হিন্দু-বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আদিবাসী, নির্যাতিত এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ আজ রুটি-রুজি-জমি-নিরাপত্তা হারাতে বসেছে। সংখ্যালঘু ও বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর জুলুম-অত্যাচার বাড়ছে। প্রতিকারহীন এই অত্যাচার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে শঙ্কিত করে তুলছে। আর আছে করপোরেটদের প্রতি কুণ্ঠাহীন আনুগত্য যার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা, সংষ্কৃতি এবং অর্থনীতি।

পাশাপাশি গণতন্ত্র বিনষ্ট হচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোন ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ করলেই চলছে হয়রানি। এমনকি আন্দোলনরত স্কুলের বাচ্ছাদের গায়েও পুলিশ হাত দিয়েছে। সংসদীয় ব্যবস্থা প্রায় অকেঁজো। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই কোন স্বাতন্ত্রতা ও নিরপেক্ষতা। প্রশাসনিক, আইনশৃঙ্খলা, তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা সবকিছুই ব্যবহার করা হচ্ছে গণতন্ত্রকে পদদলিত করতে। সেইসঙ্গে চলছে দ্বিমুখী রাজনৈতিক সংষ্কৃতি। যার কারণে সংবিধান এবং স্বাধীনতার মূল কাঠামোটাই চূড়ান্ত সংকটের সম্মুখীন।

জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ বা পাকিস্তানপন্থীরা ঠিক যেমনভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলধারাকে বিনষ্ট করেছিল ঠিক তেমনি গনতন্ত্রের ব্যনারে আজও তা নষ্ট হওয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে। রাজনীতিবিদরা ভুলে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ কোনো বানিজ্যিকি করনের বিষয় না। বঙ্গবন্ধু কারো একার সম্পদ নয়। আসলে এর জন্য আমাদের পূর্ব-পুরুষরা দায়ী। নিজেদের প্রয়োজনে তারা মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করেছে আবার ইতিহাসবিকৃতকারী ও মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিকেও প্রশ্রয় দিয়েছে। তাই এই ভারসাম্যহীনতা। কিভাবে এর উত্তরন হবে তা আমাদের জানা নেই।

‘কথা ছিল একটি পতাকা পেলে
পাতা কুড়োনির মেয়ে শীতের সকালে ওম নেবে
জাতীয় সংগীত শুনে পাতার মর্মরে।
কথা ছিল একটি পতাকা পেলে
ভূমিহীন মনু মিয়া গাইবে তৃপ্তির গান জ্যৈষ্ঠে-বোশেখে,
বাঁচবে যুদ্ধের শিশু সসম্মানে সাদা দুধে-ভাতে…