কেমন আছে আওয়ামী লীগের প্রান্তিক নেতাকর্মীরা

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে শুরু হয়েছে এক নতুন অধ্যায় । শুরু হচ্ছে এক অবমূল্যায়নের রাজনীতি। দলে এখন সুবিধাবাদীদের জয়জয়কার । আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন এরা আশেপাশে থাকে, আবার আওয়ামী লীগের দু:সময়ে তাদেরকে অন্য দলে দেখা যায়। বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নাই। আর তাই এই সুবিধাভোগী চক্র এখন দলে এসে দারুন ত্যাগী নেতা হয়েছে।

অনেকে আবার দলে ঢুকেই বড় বড় পদবি পেয়ে গেছে। তাই অন্যদের মানুষ বলেই মনে করছেনা। গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা স্থানীয় প্রার্থীর জন্য ভোট চাইতে গিয়ে নি:স্বার্থভাবে দিনরাত খেটেছে, অর্থ ব্যয় করেছে , তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তিকে ক্ষমতায় দেখা। অথচ দু:খের বিষয় নির্বাচিত হওয়ার পর নবনির্বাচিত মন্ত্রী বা এমপিরা ওই কর্মীদের আর চিনতেই পারছেনা। আর সুবিধাবাদী হাইব্রিডদের কারণে মন্ত্রী আর এমপিদের কাছেও তারা পৌঁছাতে পারছে না। এছাড়াও তারা আছে নির্বাচন পরবর্তী রোষানোল।

নমিনেশন পেপার কেনার অপরাধে হয়রানির শিকার হচ্ছেন কোনো কোনো প্রান্তিক নেতা। এমপি বা মন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের নতুন নতুন অনেক সুবিধাভোগী শুভাকাঙ্খী তৈরি হয়েছে। তাদের ভিড় আর আর্থিক দাপটের কারণে দুঃসময়ের কর্মীরা অন্তরালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছেন। এই শুভাকাঙ্খী গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের ব্যানারে নিজেদের পরিচিত করছেন। আসলে তারা বিএনপি জামাতের লোক। যারা আমাদের নব্য মন্ত্রী- এমপিদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও মূল্যায়িত। যাদের আড়ালে চাপা পড়ে গেল তৃনমূল নেতাদের সুখ-দুঃখ । তারা একুল ওকুল দুকুল হারিয়ে বসে আছেন। না পেলেন নমিনেশন না স্বীকৃতি।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। এ দলের লাখ লাখ নেতা-কর্মী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। শত ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করেও দলটি টিকে থাকার কারণ এই সব প্রান্তিক নেতাকর্মৗরাই। দলের দুঃসময়ে নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়েও তারা দল ত্যাগ করেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার একটি স্মরণসভা অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর আত্মত্যাগের জন্যই দলটির কেউ ক্ষতি করতে পারেনি। আওয়ামী লীগে অনেক ত্যাগী নেতা ছিলেন বলেই বারবার আঘাত করেও কেউ এ দলকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতন্ত্র ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখার জন্য দলের সব ত্যাগী নেতার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’ ওই অনুষ্ঠানে তিনি আরো বলেন, এসব নেতাকর্মীরা দলীয় আদর্শ ও নীতিতে বিশ্বাসী এবং তাঁরা অর্থ-সম্পদ কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেননি।’ তাই দলের দুঃসময়ের নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করতে বারবার নির্দেশ দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এমন কি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও জননেত্রী শেখ হাসিনার এমন নির্দেশের কথা নেতা কর্মীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার এ নির্দেশ এখন ইতিহাস বলে মনে হচ্ছে। কারণ এর কোন বাস্তবায়ন নেই। দলের ত্যাগী নেতা কর্মীদেরও কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। এমন কি নির্বাচন পরবর্তী কোনো অনুষ্ঠানেও তাদের ডাকা হচ্ছেনা। যে কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠান বা পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে যান ওইসব সুবিধাবাদী চক্র। যারা কোনো দিন আওয়ামী লীগ করেনি, এখন নতুন আওয়ামী লীগ সেজেছে। তাদেরকে যদি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ৫ মিনিটের বক্তব্য দিতে বলা হয় তারা দিতে পারবেনা। অথচ তারা এখন নতুন করে বঙ্গবন্ধুপ্রেমী সেজেছে।

তৃণমূলের বা প্রান্তিক নেতা-কর্মীদের অবমূল্যায়ন যেন একটি নিত্যনৈমত্তিক রাজনৈতিক সংষ্কৃতি। আর আসলের চাইতে এখন হাইব্রিডের কদর বেশী। মূল্যায়িত না হওয়ার অভিমানে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখছেন অনেক নেতাকর্মী। একদিকে অবমূল্যায়ন আর অন্যদিকে গোদের ওপর ক্যানসারের মত নিজ দলের নেতা কর্মীর দ্বারা আক্রমণ, মামলা, হামলা আর হয়রানি । বিচারের বানী নিভৃতে কাঁদে। এই বঞ্চিত-লাঞ্চিতদের গোপন কান্না দলের উচ্চ পর্যায়ে পৌছায় না। এই সব সুবিধাবাদী চক্র এখন মন্ত্রী এমপিদের ডান হাত। এমনটা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে প্রকৃত কর্মীর সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকবে।

দলের নব নির্বাচিত মন্ত্রী-এমপিরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বললেও এসব এমপিরা মনে তা ধারন করেন না। কারণ বঙ্গবন্ধু সারাদেশের তৃণমূলের নেতা কর্মীদের নাম মনে রাখতেন। কেউ তাঁর কাছে দীর্ঘদিন পর এলেও তিনি তাকে চিনতে পারতেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে গেলে তিনি আশেপাশের মানুষজনের খোঁজ নিতেন। স্থানীয় নেতা কর্মীরা কে কোথায়, কেমন আছেন তার খবর জানতে চাইতেন। গণভবনে গেলে তৃণমূলের নেতা কর্মী ও সাধারণ মানুষ বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ পাবে না, সেজন্য তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েও গণভবনে গিয়ে থাকেন নাই।

তৃণমূলে থাকার কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষকে বলতে শুনি, ‘আওয়ামী লীগে এখন কর্মীর চেয়ে নেতা বেশি’। কথাটি আমাকে দুঃখ দেয়। এটাও সত্য অনেকেই এখন আওয়ামী লীগে আসে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করতে, নেতা হতে; কর্মী হতে নয়। স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের খণ্ড খণ্ড গ্রুপ তৈরি হয়েছে। একটি গ্রুপ সুযোগ পেলে অপর গ্রুপকে হয়রানি করছে, কর্মীদের বঞ্চিত করছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এমন চিত্র দেখেছি। আওয়ামী লীগের এমন চিত্র কোনো ভাবে আমাদের কাম্য নয়। কারণ দলটি জন্মলগ্ন থেকেই গণমুখী। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য আন্দোলন করে এসেছে। এখন সেই দলের নেতা কর্মীদের মধ্যে বিরোধ প্রতিহিংসা , কর্মীর চেয়ে নেতা হওয়ার আগ্রহ বেশি। যা দু:খজনক।

অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতা কর্মীদের বারবার বলেছেন, দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বিভেদ থাকা চলবে না। যদি কোনো নেতার সঙ্গে কর্মীর বিরোধ থাকে, তাহলে সেই বিরোধ দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে হবে। দলের সঙ্গে জাতীয় ও স্থানীয় ত্যাগী নেতা কর্মীর দূরত্ব থাকা চলবে না। আর তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা, আমার হাসু বুবুর কাছে একটি অনুরোধ করছি। আওয়ামী লীগের তৃণমূল অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মী আছেন যারা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে কাছ থেকে কখনো দেখেননি। সারাজীবনে দশ সেকেন্ড কথা বলার সুযোগও হয়নি জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। তবু তারা নিরলসভাবে দেশ ও দলের জন্য কাজ করে গেছেন। কাজ করে যাচ্ছেন। দলের প্রতি তাদের ভালোবাসা অকৃত্রিম। বঙ্গবন্ধু কন্যা কি তাদের জন্য গণভবনে কিছু সময় ব্যয় করবেন? যাতে করে তারা নিজেদের কথাগুলো বলতে পারে?

সবশেষে হাইব্রীডপ্রেমীদের উদ্দেশ্যে বলছি, আপনারা দুঃসময়ের নেতা-কর্মীদের , মূল্যায়িত করছেন না। আসল রেখে হাইব্রিডের কদর করছেন। মনে রাখবেন, ব্যনার বদলালে বা হাসু বুবুর পা ছুঁয়ে সালাম করলেই সে আমাদের দলভুক্ত হয়ে যায়না। এখনও সময় থাকতে দলকে বাঁচাতে নিজেদের মধ্যে থেকে এই অপসংষ্কৃতির চর্চা দূর করুন। নইলে জামাত খাবে আওয়ামীলীগ কে।