কারাগারে বঙ্গবন্ধুর ঈদ

ফাইল ছবি

‘বাড়ি থেকে খাবার পাঠাইয়াছিল। আমি শাহ মোয়াজ্জেম, নূরুল ইসলাম, নূরে আলম সিদ্দিকীকে সঙ্গে নিয়ে খেলাম। হ্যাঁ খেতে হবে। রেণু বোধ হয় ভোররাত থেকেই পাক করেছে, না হলে কি করে ১২টার মধ্যে পাঠাল!’

ঈদুল ফিতরের দিন নিয়ে লিখেছেন, ‘দেখি ১১টার সময় বেগম সাহেবা খাবার পাঠাইয়াছে। কিছু কিছু অন্যান্য জায়গায় পাঠাইলাম। যার যা ছিল পুরানা ২০ সেলের রাজবন্দীদের নিয়ে আজ এক জায়গায় বসে খাব, বলে দিলাম। আইন আজ আর মানি না। তাই সকলকে নিয়ে আমরা জেলাখানার ঘরে বিছানা পেতে একসাথে খেলাম।’

এটি ১৯৬৭ সালের একটি ঈদের দিনের বঙ্গবন্ধুর দুঃখময় স্মৃতিচারণ।

অধিকাংশ ঈদ কারাবন্দী অবস্থায় কেটেছে তাঁর। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলে তাঁর পরিবারের ঈদ উদযাপন করত না। বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা লিখেছেন, ‘আব্বা জেলে থাকলে তো আমাদের ঈদ বিশেষ কিছু ছিল না। কাপড়চোপড়ও তো নতুন তেমন কিছু আসত না।’ বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সন্তানদের নিয়ে কোনোরকম করে ঈদের দিন কাটাতেন।

বঙ্গবন্ধু জানতেন জীবনের বহু ঈদের মত আরো অনেক ঈদ তাকে জেলে কাটাতে হবে।
বঙ্গবন্ধু ‘কারাগারের রোজনামচা’য় লিখেছেন, ‘আগামী ১৩ই জানুয়ারি ঈদের নামাজ। ছেলেমেয়েরা জামা-কাপড় নেবে না। ঈদ করবে না, কারণ আমি জেলে।’

তাঁর সাথে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি তাঁকে বলেছিলেন, ‘বাচ্চাদের সবকিছু কিনে দিও। ভাল করে ঈদ করিও, না হলে ওদের মন ছোট হয়ে যাবে।’

বাংলাদেশে ১৯৬৭ সালের ১২ জানুয়ারি পাকিস্তানে চাঁদ দেখা গিয়েছে। জোর করে ওই দিন ঈদ পালন করতে বাধ্য করে কারা কতৃপক্ষ। অথচ পূর্ব পাকিস্তানে ঈদ ছিল ১৩ জানুয়ারি।

বঙ্গবন্ধু সেদিনের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, ‘নামাজ আমাদের আজই পড়তে হয়েছে। বাড়ি থেকে খাওয়া-দাওয়া কিছুই আসে নাই। কারণ বাইরের লোক তো আমাদের মত বন্দী না, তারা ১৩ তারিখেই ঈদ করবে। ১৩ তারিখেই শতকরা ৯০ জন লোক ঈদ করেছে। কিন্তু কারাগারে খাওয়ার বন্দোবস্ত ১২ তারিখেই হয়েছে।’

‘কারাগারের রোজনামচা’য় ঈদুল আযহার কথাও উল্লেখ করেছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি লিখেছেন, ‘আজ কোরবানির ঈদ। গত ঈদেও জেলে ছিলাম। এবারও জেলে। বন্দি জীবনে ঈদ উদ্যাপন করা একটি মর্মান্তিক ঘটনা বলা চলে।’

ঈদের দিন বারবার তাঁর আপনজন বন্ধু-বান্ধব, ছেলেমেয়ে, পিতামাতার কথা মনে পড়তো।

বঙ্গবন্ধুর সাথে কোনো রাজনৈতিক বন্দিকে থাকতে দেওয়া হত না। সেই কারণে বঙ্গবন্ধুকে ঈদের দিনও একা থাকতে হত।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘একাকী কি ঈদ উদ্যাপন করা যায়?’ তবে যতটা সম্ভব ঈদের দিন বঙ্গবন্ধু অন্য জেলবন্দীদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন। ঈদের দিন অনেক কয়েদি তাঁর সাথে দেখা করতে আসতো।

জেলাখানায় কাটানো এক ঈদ সম্পর্কে শেখ মুজিবুর রহমানের জবানীতে পাই, ‘নামাজ পড়ার পর শত শত কয়েদি আমাকে ঘিরে ফেললো। সকলের সাথে হাত মিলাতে আমার প্রায় আধাঘণ্টা সময় লেগেছিল।

বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার কখনও স্বাভাবিক ঈদেও আনন্দ ভোগ করেননি । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক জায়গায় বলেছিলেন যখন ঈদে নতুন কাপড় পেতে ভালো লাগত আব্বা থাকতেন জেলে, আর ৭৫ এর পর আমাদের জীবনে কখনও ঈদ আসেনি।

ফাইল ছবি

বঙ্গবন্ধুর জন্য ঈদের দিন বেগম ফজিলাতুন্নেছা ভাল ভাল খাবার রান্না করে জেলে পাঠাতেন। বঙ্গবন্ধু সেসব খাবার একা খেতেন না। অন্য কয়েদীদের নিয়ে একসাথে খেতেন।

শেখ রেহানা ঈদস্মৃতিতে লিখেছেন, ‘আব্বা জেলে থাকলে ঈদের পরের দিন মা বেশি করে ভালো খাবারদাবার রাঁধতেন। জেলে তো আব্বা একা খাবেন না, অন্য যে নেতারা আছেন, তাজউদ্দীন চাচারা আছেন, আশপাশে যাঁরা আছেন, সবাইকে নিয়ে খাবেন। আব্বার সঙ্গে দেখা করতে আমরা যেতাম জেলখানায়।’

বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলে ঈদের আগে ও পরে সন্তানদের নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু তখন তাঁদের ঈদের খোঁজখবর নিতেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের খোঁজখবর জানতে চাইতেন।

১৯৬৮ সালের ঈদুল ফিতরও বঙ্গবন্ধুর জেলখানায় কেটেছে। ঈদের পরপরই তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় সেনা আইনে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৭১ সালে ২০ নভেম্বর এক ঈদের দিন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগারে বন্দী ছিলেন। এদেশের কোনো মানুষ ঈদ উদযাপন করেনি। কারণ মুক্তিযুদ্ধ চলছে আর তাদের প্রানপ্রিয় নেতা জেলে। ওইদিকে জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকেও বঙ্গবন্ধু ভাবছেন কীভাবে বাংলার মানুষ ঈদ করছে।

ঈদের দিন পাকিস্তানের জেলে থাকার স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আমার প্রিয় জনগণ কীভাবে তাদের ঈদ উৎসব পালন করছে ? এই প্রশ্ন আমি করলাম, জানি না কাকে ! সেই দিন, আবার কখনো তাদের দেখা পাবো কি না সেটা না জেনেই, আমি মোনাজাত করে আমার জনগণের মঙ্গল ও নিরাপত্তা দয়াময় আল্লাহতালার হাতে সমর্পণ করলাম। এটাই ছিল আমার ঈদ।’

বঙ্গবন্ধু প্রথম ঈদে উদ্যাপন করলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে, তার প্রিয় জনগনের সাথে। নামাজ পড়লেন ধানমন্ডি মাঠের ঈদগাহ ময়দানে। কোনো রাষ্ট্রীয় প্রটোকল না, না কোন নিরাপত্তাবলয়। কত সাধারণ একজন মানুষ। ঠিক যেন পিতার সাথে সন্তানের ঈদ পুর্নমিলনি।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি এই মহান নেতার কাছে পরিবার ও সন্তানের চাইতে দেশের মানুষ বেশী প্রিয় ছিল। এই ঈদে আমরা তার আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানাই। আর প্রার্থনা করি ঈদের আনন্দ ভরে উঠুক বাংলার প্রতিটি মানুষের জীবন।

আমি বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়বেন, আমার হাসুবুবু যেন শোষণ-বঞ্চনামুক্ত বাংলাদেশ গঠন করতে শতভাগ সক্ষম হন। তার নেতৃত্বে এদেশের মানুষের জীবনের প্রতিটি দিন হোক ঈদের দিন। এই প্রার্থনা করি।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবি হোক।

লেখক : ড. মোঃ হাসান খান
সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।