কংগ্রেস হেরে যাওয়ার নেপথ্যে

কংগ্রেস   ১৩৪ বছরের পুরনো দল।  তার এমন  শোচনীয় পরাজয়ের আসল কারণ কী? পুরোটাই কি মোদি ম্যাজিক? নাকি অন্য কোনো কারণ। গত পাঁচ বছরে দলটির কিছু ভুল পদক্ষেপ, সাংগঠনিক অদক্ষতা, ভুল নীতি, কৌশলগত বিপর্যয় এবং নিজেদের বার্তা দেওয়ার ব্যর্থতার মত কারণ গুলো যথেষ্ট দায়ি।।   পরাজয়ের এইসব কারণের  দায় কংগ্রেস প্রধান রাহুল গান্ধী কে নিতে হবে। যে কারনে গত ২৫ মে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভার ওপরে  সবার দৃষ্টি ছিল।

রাহুল গান্ধী কি পদত্যাগ করবেন? নাকি তিনি দলের পরিবর্তন আনবেন যা তিনি ২০১৩ সালে দিল্লির নির্বাচনে আম আদমি পার্টির কাছে দলের পরাজয়ের পর করেছিলেন? ওই নির্বাচনে হারার পর রাহুল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দলে এমন পরিবর্তন আনা হবে যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। কিন্তু দলটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী বৈঠকে বিস্মিত হওয়ার মতো কিছুই ঘটেনি।

রাহুল পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও ওয়ার্কিং কমিটিতে সর্ব সম্মতভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান হয়েছে। আর তাকেই দল ঢেলে সাজানো ও সব পর্যায় পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালেও একই চিত্র।  ওই নির্বাচনে পরাজয়ের পর সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী দুজনেই পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। ওয়ার্কিং কমিটি যথারীতি তা প্রত্যাখান করেছিল। সেবারও পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

কিন্তু অল্প কয়েকটি পরিবর্তন ছাড়া কংগ্রেস একইরকম থেকে গেছে। মাত্র ৫২ আসন পেয়েছে কংগ্রেস।  স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে  বিজয়ী বিজেপির শক্তির সঙ্গে দলটি খাপ খাওয়াতে পারেনি।  কংগ্রেস সাংগঠনিক ভাবে এবং জনগনের কাছে বার্তা পৌছানেরা বিষয়ে বিজেপির থেকে পিছিয়ে আছে। এরপরও আবারো দল গঠনের দায়িত্ব রাহুল কে দেয়া হল।

দুর্বল প্রচারণা

কংগ্রেসের প্রচারণা ছিল খুবই দুর্বল। তিন তালাক আইন বা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ও বালাকোটের হামলার মতো আবেগি বিষয়গুলোতে তারা প্রচারণার সময়  উপস্থাপন করতে পারেনি। সেই সাথে জনগণের আবেগ ও মনোভাব বুঝতে ব্যার্থ হয়েছে।  কেবলমাত্র ৯০ দিনের প্রচারণায় খুব কম নির্বাচনই জেতা যায়।ভোটারদের সামান্য অংশকে প্রভাবিত করা যায়।

তাই লড়াই শুরুর আগেই হেরে গেছে কংগ্রেস’।পরাজয়ের পর কংগ্রেস নেতারা বলছেন তরুনদের উদ্দেশ্যে তাদের ম্যাসেজ সঠিক ছিলনা । কংগ্রেস শুধু বেকারত্ব আর রুটি রুজির প্রসঙ্গ তুলেছে। জনমনে এর প্রভাব পরেনি কারন এর বীপরিতে ছিল মোদির আগ্রাসী ও জাতীয়তাবাদী প্রচারণা। তাছাড়া ভারতের তরুনরা পারিবারিক রাজনীতির পরিবর্তন চাইছিল।

মাঠ পর্যায়ে কাজ না করা

প্রচারণার জন্য ২০১৪ সালের মত কংগ্রেস এবারো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কে প্রচারণার কাজে ব্যবহার করেছে। তার ভুলে গেছে মাঠ পর্যায়ের প্রচারণার বিকল্প নেই। অথচ মহারাষ্ট্রের কমিউনিস্ট পার্টি  কৃষান মার্চের আযোজন করেছে। অন্ধ্র প্রদেশে জগন রেড্ডি পদযাত্রা করেছেন । সে তুলনায় কংগেসের প্রচারণা নিষ্প্রভ ছিল। ডিএমকে’র স্টালিনও মাঠে সক্রিয় ছিলেন।

সাংগঠনিক দূর্বলতা

নির্বাচনের মাত্র তিনমাস আগে রাহুল তার বোন সোনিয়া গান্ধী ভদ্রকে পূর্বাঞ্চলীয় উত্তর প্রদেশের জন্য সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নিয়োগ করেন। ‘কংগ্রেস কর্মী হিসেবে কংগ্রেস নেতারা  অভিবাদন জানালেন  আর প্রিয়াংকার রাজনীতিতে প্রবেশ নিয়ে সবরকম নেতিবাচক  প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করলেন। এটি ছিল সবচেয়ে বড় ভুল।  কারণ  উত্তর প্রদেশের মতো একটি রাজ্যের  নির্বাচনের আগে  নতুন সাধারণ সম্পাদক নিয়োগ করা হয়েছে।

আর তারপরে গুলাম নবি আজাদকে পাঠানো হলো হরিয়ানায়। যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় কোনও সাধারণ সম্পাদক নেই’। এরই মধ্যে আবার রাজিব সত্যব কে গুজরাটের দায়িত্ব দেয়া হল। যিনি ৪৫ বছরে প্রথমবার এমপি হয়েছেন। সে কি করে মোদি অমিতের বিরুদ্ধে লড়বে?

যে কারণে হরিয়ানা ও গুজরাটে কোনও আসনই পায়নি কংগ্রেস। আর উত্তর প্রদেশে কমেছে ভোট।‘কর্নাটকে জনতা দলের (জেডি) সঙ্গে জোট গড়ায় কংগ্রেসের বিপর্যয় ঘটিয়েছে। মহারাষ্ট্রে বিজেপির দূর্নীতি নিয়ে ও কোন আক্রমন করতে পারেনি কংগ্রেস। এছাড়া  প্রকাশ আম্বেদকরকে দলে নিতে না পারার ব্যর্থতারও মূল্য দিতে হয়েছে কংগ্রেসকে।

পার্শ্ববর্তী পাঞ্জাবেও বিভক্তি দেখা গেছে।  ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং ‘বালাকোট ও অন্যান্য বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে  মনগড়া ও বিতর্কিত কথা বলেছেন । যে কারণে তাকে  দল থেকে আলাদা মনে হয়েছে।

ভুলপথে পরিচালিত হয়েছেন রাহুল

‘২০১৪ সালের নির্বাচন পরিচালনায় যে দলটি ছিল এবারও সেই একই দল ছিল।  তারা রাহুলকে বলেছেন যে, তারা তিন সপ্তাহের মধ্যে ১০ লাখ বুথ কমিটি গঠন করে ফেলেছে’,। ‘তারা আরও বলেছে দশ দিনের মধ্যে সব বুথ কমিটিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ফেলেছে। আসলে শক্তি অ্যাপে ১২ লাখ মানুষ যুক্ত ছিল আর প্রতি বুথে দশজন করে। তার মানে প্রায় এক কোটি  ।আসলে এভাবে বিভ্রান্ত ছড়ানো হয়।’ বিশাল এই পরাজয়ের পরও হয়তো রাহুল বা দলের পতন হয়ে যাবে না। তবে অনেকেই বিশ্বাস করেন এ থেকে উত্তরণ পাওয়া খুবই কঠিন। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

নাবা/ ডেস্ক/ তানিয়া রাত্রি