এপ্রিল ফুল : মুসলিম নিধনের মিথ্যা গল্প

Smiling Face First April Fool Day Happy Holiday Greeting Card Flat Vector Illustration

বাঙালি মুসলমানের  ধর্মচর্চা  এতই অদ্ভুত   যে  পৃথিবীর সব কিছুর এমন কি নির্ভেযাল উৎসবের  মধ্যেও  তারা ধর্মের গন্ধ খুজবে। আর ইন্টারনেটের কল্যানে আছে হাজারো ধর্মীয়  বার্তা। কেউ বিবেচনা করেনা যা বলছে ইন্টারনেট তাই বিশ্বাস করে।  সব কিছুকেই  তারা মুসলিম সংষ্করন করবে।  তেমনই একটি এপ্রিল ফুলের ইতিহাস। মিথ্যা এবং বানোয়াট গল্প দিয়ে যার মুসলিম সংষ্করন করা হয়েছে।

এপ্রিল ফুলের প্রচলিত ইতিহাস হল  ওই দিন  রানী ইসাবেলা এবং রাজা ফার্ডিনান্ড এর সেনাবাহিনী মুসলিমদের মসজিদে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল। বিপর্যস্ত  মুসলিম বাহিনীকে ক্রিশ্চিয়ানরা আত্মসমর্পনের সুযোগ দিয়ে বলেছিল মসজিদে আশ্রয় নাও। এভাবে তারা কৌশলে মুসলিমদের মসজিদে ঢুকিয়ে দরজায় তালা মেরে দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। মুসলিমরা যখন পুড়ে মরছিল, ক্রিশ্চিয়ানরা তখন উল্লাস করছিল। মুসলিমদের বোকা বানানোর এই দিনটি ছিল এপ্রিলের এক তারিখ। সেই থেকে ক্রিশ্চিয়ানরা এই দিনটি উদ্‌যাপন করে আসে “এপ্রিল ফুল দিবস” হিসেবে।

কিন্তু কখনও কি কেউ এ ইতিহাসের সত্যতা যাচাই করেছেন? মুসলিমরা স্পেনে শাসন শুরু করে ৭১১ খৃষ্টাব্দ থেকে। আল ওয়ালিদ ইবন আবদ আল মালিক প্রথম উমাইয়া খেলাফতের পক্ষ থেকে স্পেনে শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং কিছু অংশ নিয়ে গঠিত এলাকাকে উমাইয়া খেলাফতের প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে তারা ৭৫০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকে। এরপর ক্ষমতায় আসে করডোবার আমিরাত (৭৫০ থেকে ৯২৯ খৃষ্টাব্দ), করডোবার খেলাফত (৯২৯ থেকে ১০৩১ খৃষ্টাব্দ) এবং আলমনজুর (৯৩৮ থেকে ১০০২ খৃষ্টাব্দ)। শেষের জন আসলে একজন শাসক যিনি মুসলিম শাসনকে স্পেনে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে ইতিহাসে এর পরে দুশো বছর একচ্ছত্র আধিপত্য দেখাতে পারে নি কোন সুনির্দিষ্ট মুসলিম শাসক। মুসলিমদের স্পেন শাসন আবার পাকাপোক্ত হয় মূলতঃ ১২৩৮ সনে যখন গ্রানাডার আমিরাত প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে মুসলিমরা স্পেনের গ্রানাডা ভিত্তিক একটা খুবই শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে পরিচিতি পায়।

স্পেনে যখন মুসলিমরা শাসন করছে তখন বিভিন্ন রাজারা যা করতে পারেন নি, একজন নারী হয়ে রানী ইসাবেলা তা করে দেখিয়েছিল। সে মুসলিমদের বিতাড়িত করেছিল স্পেন থেকে। প্রশ্ন জাগতে পারে, কে এই ইসাবেলা?

এই সেই ইসাবেলা যে কলম্বাসকে আমেরিকা আবিষ্কারে পাঠিয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সিদ্ধান্ত গুলো স্পেনের ইতিহাসকে নূতন রূপ দিয়েছিল। ইসাবেলা অনুভব করেছিল মুসলিমদের হারাতে হলে স্পেনের ছোট ছোট রাজ্যগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

ইসাবেলা রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে তার কজিন এ্যারাগনের রাজা ফার্ডিনান্ডকে বিয়ে করেছিল। এই বিয়েও খুব একটা সহজ ছিল না কেননা সে সময় কাজিনকে বিয়ে করতে খোদ পোপের অনুমতি প্রয়োজন ছিল। শেষ পর্যন্ত ইসাবেলা সেটাও জোগাড় করেছিল এবং ১৯ অক্টোবর ১৪৬৯ সনে তারা বিয়ে করে।

বিয়ের পর ইসাবেলা-ফার্ডিনান্ড এর প্রধান মিশন হয়ে দাঁড়ায় মুসলিমদের পরাজিত করা। ১৪৮২ সনের ১ ফেব্রুয়ারি রাজা-রানী ভ্যালাডোলিড প্রদেশের মেডিনা ডেল ক্যাম্পোতে এসে পৌঁছান গ্রানাডা আক্রমনের লক্ষ্য নিয়ে।  বিভিন্ন  ইতিহাস গ্রন্থ থেকেই জানা যায় যে এ সময় ইসাবেলা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে তার সেনাবাহিনীতে সৈন্য নিতে শুরু করে এবং তাদের কামান বিভাগকে আরো সুগঠিত করে সাজাতে তৎপর হয়। গ্রানাডা আক্রমনের মূল সমস্যা ছিল প্রকৃতি। অঞ্চলটা এমন ভাবে দুর্গম প্রকৃতি দ্বারা বেষ্টিত ছিল যে সেখানে নূতন করে গিয়ে আক্রমন করতে হলে অসাধারণ সেনাবাহিনী প্রয়োজন। ইসাবেলা দারুণ ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে দশ বছর ধরে যুদ্ধ করে তবেই মুসলিমদের স্পেন ছাড়া করতে পেরেছিল।

 ইসাবেলা একবারে গ্রানাডা দখল করার মত উচ্চাভিলাস দেখায় নি। বরং সে মুসলিস সাম্রাজ্যটাকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে একটু একটু করে দখল করে। ১৪৮৫ সনে রন্ডো এবং ১৪৮৬ সনে গ্রানাডার লজা দখল করে ইসাবেলার সেনাবাহিনী। লজা দখলের সময় গ্রানাডার শাসক দ্বাদশ মোহাম্মদকেও তারা বন্দি করে কিন্তু পরে ছেড়ে দেয়। ১৪৮৯ সনে দখল করে বাজা। এভাবে আস্তে আস্তে গ্রানাডার একেকটা অঞ্চল দখল করতে করতে শেষ পর্যন্ত ১৪৯১ সনে মূল গ্রানাডা আক্রমণ করে ঘেরাও করে ইসাবেলার সেনাবাহিনী। ফলে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দ্বাদশ মোহাম্মদ আত্মসমর্পণ করে।

১৪৯২ সনের ২ জানুয়ারি ইসাবেলা এবং ফার্ডিনান্ড গ্রানাডায় প্রবেশ করে এবং দ্বাদশ মোহাম্মদের কাছ থেকে শান্তি পূর্ণ ভাবে নগরের চাবি গ্রহণ করে।

কাজেই ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি  কোন রকম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঐ দিন ঘটে নি। এবং  দিনটি ১ এপ্রিল ছিল না বরং দিনটি ছিল ২ জানুয়ারি। অর্থাৎ যে দিনকে ইসলামপন্থিরা  মুসলিমদের পুড়িয়ে মারার দিন হিসেবে চিহ্নিত করে, তার তিন মাস আগেই গ্রানাডা বিজয় করে ক্রিশ্চিয়ানরা। এটা ঠিক, অত্যাচার তারা করেছিল। মুসলিমদের সবচেয়ে বড় মসজিদটাকে তারা চার্চ বানিয়েছিল এবং অন্য ধর্মের মানুষদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এ কাজ যুগে যুগে সব ধর্ম ভিত্তিক শাসকরাই করেছে। তুরষ্কের সবচেয়ে বড় যে মসজিদটা রয়েছে সেটা এক কালে চার্চ ছিল।

 এপ্রিল ফুলের আসল ইতিহাস হল  এ্যানসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা থেকে জানা যাচ্ছে যে এপ্রিল ফুলের উৎপত্তি মূলতঃ রোমান উৎসব হিলারিয়া থেকে যা হতো ২৫ মার্চ। তবে দিনটি পরবর্তিতে বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিভিন্ন ভাবে উৎসবের দিন হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ হিসেবে ধরা হয় ১৩৯২ সনে প্রকাশিত চসারের কেন্টারবেরি টেলস। সেখানে মার্চের ৩২ তারিখ হিসেবে এপ্রিল ফুলের উল্লেখ রয়েছে। “মিউজিয়াম অব হোক্স” এর ওয়েব সাইটে বিভিন্ন এপ্রিল ফুলের ঘটনা তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায় ইতিহাসে এপ্রিল ফুলের বড় দৃষ্টান্ত ১৬৯৮ সনে লন্ডনে ঘটে, যখন বহু মানুষকে বোকা বানিয়ে টাওয়ার অব লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। মূল কথা, এ দিনটি ইউরোপের বিভিন্ন জাতি বসন্তের শুরুর দিকের একটা উৎসব হিসেবে উদ্‌যাপন করে।

কাজেই  স্পেনের ক্রিশ্চিয়ান সম্প্রদায়ের গ্রানাডা বিজয় এবং এপ্রিল ফুলের মধ্যে সামান্যতম সম্পর্কও নেই। অথচ মুসলিমদের পুড়িয়ে মারার এই মিথ্যেটা যুগ যুগ ধরে প্রচার করছে ইসলামপন্থি মৌলবাদীরা । বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করাই যার একমাত্র লক্ষ্য।

 এরা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে। এদের কাছে ধর্ম একটা  ক্ষমতা বিস্তারের পণ্য।  এদের ভ্রান্ত বক্তব্যে বিভ্রান্ত হয়ে নিজের ধর্ম কে পণ্য বানাবেন না।

সূত্রঃ  A History of Medieval Spain, Writer: Joshep o Kalahan