ইসলাম ও বঙ্গবন্ধু

আজ একটি অন্যরকম বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই। ৭৫-এর পর আমাদের দেশে যে ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান হয় তাতে বঙ্গবন্ধুর ধর্মীয় চেতনাকেও বিকৃত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রণয়নকৃত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটি ছিল। ৭৫-এর পর শাসকচক্র একে নষ্ট করে দেয়। আর তখনই শুরু হয় ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি। ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলে প্রচার করা হয়।

সংবিধানে বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করে সস্তা জনপ্রিয়তা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আর বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী বলে প্রচার করা হয়। যা সম্পূর্ণ অসত্য ও বানোয়াট ছিল।

জন্মগত দিক থেকে যদি বলি বাঙ্গালি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম হয়েছিল গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর বংশের উপাধি ‘শেখ’। বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষরা ছিলেন বিখ্যাত দরবেশ শেখ আউয়ালের বংশধর।

আনুমানিক ১৪৬৩ সালে হযরত বায়েজিদ বোস্তামি (রহঃ) ইসলাম প্রচারের জন্য ইরাক থেকে চট্টগ্রামে আসেন। তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে শেখ আউয়ালও ছিলেন। তিনি হযরত বায়েজিদ বোস্তামি (রহঃ)-এর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেন। হযরত বায়েজিদ বোস্তামি (রহঃ) তাঁকে স্নেহ করতেন। তাঁর নির্দেশেই শেখ আউয়াল সোনারগাঁওয়ে আসেন। এখানে থেকে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচার করতেন। শেখ আউয়ালের বংশধররা পরে খুলনা এবং শেষে টুঙ্গিপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন।

বঙ্গবন্ধু ধার্মিক ছিলেন। কিন্তু ধর্মান্ধ ছিলেন না। তিনি সব ধর্মের মানুষকে শ্রদ্ধা করতেন। কখনও ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করেননি। পাকিস্তানী শাসক চক্র তার বিরুদ্ধে ইসলামবিরোধী অপপ্রচার করত। বঙ্গবন্ধু তাঁর শক্ত জবাব দিলেন ১৯৭০ সালে পাকিস্তান বেতার ও টেলিভিশনে প্রদত্ত ভাষণে।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। এ কথার জবাবে আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য, আমরা লেবাস সর্বস্ব ইসলামে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হযরত রাসূলে করীম (সাঃ)-এর ইসলাম, যে ইসলাম জগতবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বারবার যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ-বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধে। যে দেশের শতকরা ৯৫ জনই মুসলমান সে দেশে ইসলামবিরোধী আইন পাসের কথা ভাবতে পারেন তারাই, ইসলামকে যারা ব্যবহার করে দুনিয়াটা শায়েস্তা করে তোলার কাজে।’ (সূত্র : ইসলাম প্রচার ও প্রসারে বঙ্গবন্ধুর অবদান/আবদুল্লাহ আল মামুন)।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। যেখানে প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে তার ধর্ম পালন করবে এবং কারো ধর্ম পালনে কেউ বাধা দেবে না। প্রত্যেক ধর্মের মানুষের সাথে মানুষের সম্প্রীতি থাকবে। ১৯৭২ সালের ৪ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের কারও নেই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম-কর্ম পালন করবে, বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না।’

চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষ হলেও ইসলাম ধর্ম প্রসারের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে অনেক যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছিলেন। কারণ এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমান। ১৯৭৫ সালের ২৮ মার্চ বঙ্গবন্ধু এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এটি প্রতিষ্ঠার ফলে এদেশে ইসলাম নিয়ে গবেষণা ও ইসলামের প্রচার-প্রসার ত্বরান্বিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন উল্লেখযোগ্য অনেক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সাড়ে ৩ হাজারের বেশি ইসলাম সম্পর্কিত বই প্রকাশিত হয়েছে এই ফাউন্ডেশন থেকে। ৬৪ টি জেলাতেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জেলা কার্যালয় রয়েছে। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড পুনঃগঠন করেন। তাঁর সময়ে মাদ্রাসা বোর্ডকে স্বায়ত্তশাসনসহ মাদ্রাসায় উচ্চ শিক্ষা, চাকুরির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সরকারিভাবে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) উদ্যাপনের আয়োজন করেন। ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালে ঢাকায় বৃহৎ পরিসরে অনুষ্ঠিত হয় ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) মাহফিল। বায়তুল মোকাররমে আয়োজিত এই বৃহৎ মাহফিলের উদ্বোধন করেছিলেন তিনি নিজে। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) মাহফিলের ব্যবস্থাপনায় ছিল সীরাত মজলিস। এই সীরাত মসলিসও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) উদযাপন বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। বাংলাদেশ সিরাত মজলিসের ওই সময়কার সম্পাদক আবদুল্লাহ ইবনে সাঈদ জালালাবাদী সেদিনের অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সেদিন বায়তুল মোকাররম মসজিদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সিরাতুন্নবী (সাঃ) সভা উদ্বোধনে জাতির মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল।’ কেবল ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) পালন নয়, হজ পালনকারীদের জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা চালু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

বিশ্ব ইজতেমা বর্তমানে যে তুরাগ নদী সংলগ্নে আয়োজিত হয়, ইজতেমার জন্য এ স্থানেরও বরাদ্দও দিয়েছিলেন জাতির জনক। বঙ্গবন্ধু জীবিতাবস্থায় রমজান মাস উপলক্ষে পত্র-পত্রিকায় বাণী দিতেন। রোজাদারদের যেন কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতেন।

পাকিস্তান আমলে হজ পালন করতে গেলে ভ্রমণ কর দিতে হতো। বাংলাদেশ গঠনের পর বঙ্গবন্ধু হজযাত্রীদের জন্য অনুদানের ব্যবস্থা চালু করেন। হজযাত্রীদের আর্থিক সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সেই ভ্রমণ কর রহিত করেন। তিনি নিজেও হজ করতে আগ্রহী ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৮ জুলাই বঙ্গবন্ধু অধ্যক্ষ ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীকে গণভবনে বলেছিলেন, ‘সরওয়ার, আমার সময় ফুরিয়ে আসছে, এবার আমি হজে যাব।’

আজকে বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ), শবে বরাত ও শবে কদর উপলক্ষে অফিস আদালতসহ সকল প্রতিষ্ঠানে সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। ধর্মীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিনে এই ছুটির প্রচলন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। পাশাপাশি তাঁর নির্দেশে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে পবিত্র কোরআন তেলওয়াত এবং তাফসির অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মত ওআইসির অধিবেশনে যোগ দেন। তাঁর চেষ্টায় বাংলাদেশ ওআইসির সদস্য পদ লাভ করে। রাশিয়াতে প্রথম তাবলীগ জামাত প্রেরণের সফল উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি।

বিস্ময়ের বিষয় হল মদ ও জুয়া নিষিদ্ধ ছিল না পাকিস্তান আমলে। বাংলাদেশ গঠিত হলে শেখ মুজিবুর রহমান মদ ও জুয়া খেলা নিষিদ্ধ করেন। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আমাদের দেশে পাকিস্তান আমলে ইসলামবিরোধী বহু কাজ হয়েছে। রেসের নামে জুয়া খেলা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ছিল। আমি ক্ষমতায় এসে প্রথমেই ঘোড়দৌঁড় বন্ধ করে দিয়েছি। পুলিশকে তৎপর হতে বলেছি, শহরের আনাচে কানাচে জুয়াড়িদের আড্ডা ভেঙ্গে দিয়েছি।  আপনারা আমাকে সাহায্য করুন, দেখবেন এদেশে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড কখনই হবে না।’ ওই ভাষণে ইসলামকে যে তিনি মনে-প্রাণে লালন ও ধারণ করেন সে-কথাও জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু।

উদাত্ত কণ্ঠে তিনি বলেছেন, ‘আমি ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলি, ধর্ম নিরেপেক্ষতা মানে ধর্মবিরোধিতা নয়। আমি মুসলমান। আমি ইসলামকে ভালবাসি।’ তিনি ইসলামের আলোয় দীপ্তমান ছিলেন বলেই স্বাধীন বাংলাদেশে পা রেখে ১৯৭২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দৃঢ়কণ্ঠে বলতে পেরেছেন, ‘আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছিল, জীবন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলাম, আমি বলেছিলাম তোমরা আমাকে মারতে চাও মেরে ফেল। আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। মুসলমান একবার মরে, বারবার মরে না।’

একজন অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থি মুসলমান ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বলতেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম-কর্ম করার স্ব-স্ব অধিকার অব্যাহত থাকবে।’ তার সময়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার সুরক্ষিত ছিল। বর্তমানে তাঁর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাও জাতির জনকের ধারবাহিকতায় বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের প্রসারে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

এদেশে পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা এখনও বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে ইসলাম বিদ্বেষী আখ্যা দিতে চায়। আরো দুঃখের বিষয়, ৭৫-এর পর রাজনীতি এবং সংস্কৃৃতি যেভাবে ধর্মীয়করণ হয়েছে তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্যেও কঠিন। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃৃতি ধর্মের নামে নষ্ট হতে দেননি। সাম্প্রদায়িকতায় গ্রাস করতে দেননি বাঙ্গালির নিজস্ব সংস্কৃৃতিকে।

আজ বঙ্গবন্ধু নেই, আমরা তাঁর আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে সকল সাম্প্রদায়িকতাকে দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিহত করব। এই হোক পবিত্র রমজান মাসে আমাদের অঙ্গীকার। জাতির জনকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করি।


লেখক : ড. মোহাম্মদ হাসান খান
সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।