‘আব্বায় সুস্থ অইলেই টাকা জমাইয়া রিকশা কিনমু’

বাসায় বৃদ্ধা মা আর অসুস্থ বাবা। বাবা কখনও কখনও রোজগারের জন্য বাইরে বের হন। তবে একদিন কাজ করলে আবার অন্তত এক সপ্তাহ অসুস্থ থাকেন। যে কারণে সংসারের চাকা সচল রাখতে দায়িত্ব পালন করতে হয় ১৩ বছর বয়সী আরিফুলকে।
স্কুলে যাওয়ার বয়সে আরিফুল কর্মক্ষেত্রে। এর কারণ জানতে চাইলে আরিফুল জানায়, তারা তিন ভাই। বছর দেড়েক আগে বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে বড় দুইজন। বিয়ের পর বাবা-মা বা ছোট ভাইয়ের খোঁজ নেয় না তারা। এমন কি কোনো যোগাযোগও রাখেন না।
প্রাথমিক শিক্ষা সমপনি পরীক্ষায় (পঞ্চম শ্রেনী) পাশ করার পর পরই জীবনে ছন্দ পতন ঘটে আরিফুলের। ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে আর ভর্তি হতে পারেনি সে। নেমে পড়ে জীবন সংগ্রামে। সামান্য শিক্ষায় কোনো চাকরি পাওয়া যায় না। আর তাই বাধ্য হয়ে শক্ত হাতে আকড়ে ধরেছে রিকশার হ্যান্ডেল।
আরিফুল জানায়, প্রতিদিন রিকশার মালিকের পাওনা পরিশোধ করার পর ঘরে নিয়ে যেতে হয় ৫ থেকে ৬ শো টাকা। যার বেশির ভাগই চলে যায় বাবা-মায়ের ওষুধ কিনতে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেঁড়িবাধ সংলগ্ন নবীনগর হাউজিং এলাকার ১৬ নম্বর সড়কে তার পরিবারের বসবাস।
প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জীবন যুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিক হিসেবে লড়ে যাচ্ছে এই কিশোর। কারো সাহায্য নয়, বাবা মায়ের প্রতি নিজের দায়িত্বটাকে নিজের সামর্থ অনুযায়ী পালন করতে চায় আরিফুল।
আরিফুল জানায়, ‘ঘর তো আমারই দেহা লাগে, ভাইয়ের বিয়া কোইরা গ্যাছে গা। এ্যাহন তো বাপ-মায়রে আমারই দেহন লাগে। হেগোরে আমি না দেখলে দেখবে কেডা। আর অন্যকামে তো ডেলি এ্যাতো ট্যাকা আহে না। তাই অটো (অটো রিকশা) চালাই।’
রিকশাটি ভাড়ার না হয়ে তার নিজের হলে কষ্টের পরিমান অনেকটাই কমে আসত বলে মনে করে আরিফুল। নিজের রিকশা কেনার ইচ্ছেও আছে তার। তাই অল্প অল্প করে হলেও টাকা জমাচ্ছে সে।
আরিফুল জানায়, ‘নিজের রিকশা অইলে ডেলি ৩ শো ট্যাকা বাঁচত। আব্বায় একটু সুস্থ অইলে টাকা-পয়সা বাঁচাইয়া একটা রিকশা কিনমু। এ্যাহন অল্প-অল্প কইরা ট্যাকা জামাইতাছি। তবে খুব বেশি জমে না, কারণ ডাক্তারের পিছেই ম্যালা ট্যাকা যায়।’
‘মালিকের জোমা দিয়া ঘরে ট্যাকা নিতে ওইলে প্রতিদিন রাইত দেট্টা-দুইটা পর্যন্ত গাড়ি চালান লাগে।’
পড়ালেখা করার ইচ্ছা আছে এখনো। নিজের রিকশায় তার বয়সি অনেক শিক্ষার্থীকেই বহন করে হতভাগা আরিফুল। আর তখনি মনের মধ্যে জেগে ওঠে স্কুলের যাওয়ার স্বপ্ন।কিন্তু পিছুটান তাকে আর সামনে এগুতে দেয় না।

কেবল আরিফুল নয়। মোহাম্মদপুর বেঁড়িবাধ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বসবাস করেন নিম্ম আয় ও সুবিধা বঞ্চিত বিপুল সংখ্যক মানুষ। এখানকার অধিকাংশ পরিবারের সন্তানই শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে ঝড়ে পড়ছে প্রথমিক শিক্ষা অর্জনের আগেই।
স্কুল থেকে ঝড়ে পড়া আরিফুলদের জায়গা হয় খাবার হোটেল, মুদির দোকান, মোটর গ্যারেজ, গণপরিবহন কিংবা রিকশায়। আবার কোন কোন আরিফুল জীবন যুদ্ধে বেছে নেয় দিনমজুরি বা টোকাইয়ের পথ।

নাবা/রাজু/নয়ন/সেন্ট্রাল ডেস্ক