লোকসংগীতের কিংবদন্তী শিল্পী আবদুল আলীম

  • জহির আলীম
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৩৫
লোকসংগীতের কিংবদন্তী শিল্পী আবদুল আলীম

প্রত্যেক জাতির নিজস্ব সংগীত হচ্ছে তার লোকসংগীত। নিজস্ব সংস্কৃতির ধারক-বাহক হলো লোকসংগীত যা গণমানুষের নিজস্ব সৃষ্টি ও ঐতিহ্য। সমৃদ্ধ লোকসংগীত উজ্জ্বল জাতীয় সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশের পল্লী গানের ইতিহাসে আবদুল আলীম এক অবিস্বরণীয় নাম। কণ্ঠস্বরের অসাধারণ সহজাত ঐশ্বর্য নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন এবং সেক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দরাজ কণ্ঠের অধিকারী আবদুল আলীম যখন গান গাইতেন তখন মনে হতো পদ্মা, মেঘনার ঢেউ উছলে পড়ছে শ্রোতার বুকের পাঁজরে। প্রাণের সঙ্গে প্রাণ মিলিয়ে আবদুল আলীম যে গান গাইতেন, সে শুধু বাংলা ভাষাভাষীদের মনেই নয়, বিশ্বের সকল সুররসিক- যারা ভাষা জানেন না- তাদেরও আপ্লুত করতো।

শিল্পী আবদুল আলীম ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার তালিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিল্পীর বয়স যখন ১০-১১ বছর তখন তাঁর এক সম্পর্কিত চাচা গ্রামের বাড়ীতে কলের গান (গ্রামোফোন) নিয়ে আসেন। তিনি তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদ বরকত তার সহপাঠী। প্রায় প্রতিদিনিই তিনি চাচার বাড়ীতে গিয়ে গান শুনতেন। পড়াশোনার জন্য গ্রামের স্কুল তাকে বেশী দিন ধরে রাখতে পারেনি। তাই কিশোর বয়সেই শুরু করলেন সংগীত চর্চা। আবদুল আলীমের নিজ গ্রামেরই সংগীত শিক্ষক সৈয়দ গোলাম আলীর কাছে তালিম নিতে শুরু করেন। ওস্তাদ তার ধারণ ক্ষমতা নিরীক্ষণ করে খুবই আশান্বিত হলেন। গ্রামের লোক আবদুল আলীমের গান শুনে মুগ্ধ হতো। পালা-পার্বণে তার ডাক পড়তো। আবদুল আলীম গান গেয়ে আসর মাতিয়ে তুলতেন। সৈয়দ গোলাম আরী, আবদুল আলীমকে কোলকাতা নিয়ে গেলেন। কিছুদিন কোলকাতা থাকার পর তার মন ছুটলো ছায়াঘন পল্লীগ্রাম তালিমপুরে। কিন্তু ওখানে গান শেখার সুযোগ কোথায়? তাই বড় ভাই শেখ হাবিব আলী একরকম ধরে বেঁধেই আবার কোলকাতা নিয়ে গেলেন।

তখন উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়েছে। ১৯৪২ সাল। মরহুম শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক এলেন কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায়। বড় ভাই শেখ হাবিব আলী তাকে নিয়ে গেলেন সেখানে। শিল্পীর অজ্ঞাতে বড় ভাই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের কাছে নাম দিয়ে দিলেন গান গাইবার জন্য। এক সময় মঞ্চ থেকে আবদুর আলীমের নাম ঘোষণা করা হলো। শিল্পী ধীর পায়ে মঞ্চে এসে গান ধরলেন, ‘সদামন চাহে মদিনা যাবো।’ হক সাহেব মঞ্চে বসে। আবদুল আলীমের গান শুনে শের-ই-বাংলা শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। কিশোর আবদুল আলীমকে জড়িয়ে নিলেন বুকে। উৎসাহ দিলেন, দোয়া করলেন এবং তখনই বাজারে গিয়ে পাজাম পাঞ্জাবি, জুতা, টুপি, মোজা সব কিনে দিলেন। সেখানে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। কবি নজরুল শিল্পীর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে রেকর্ড কোম্পানীর ট্রেনার ধীরেন দাসকে আবদুল আলীমের গান রেকর্ড করার নির্দেশ দলেন। ১৯৪৩ সালে মোঃ সুলতান রচিত দুটি ইসলামিক গান আবদুল আলীম রেকর্ড করলেন।

গান দুটি হলো- ১) আফতাব ঐ বসলো পাটে ২) তোর মোস্তাফাকে দে না মাগো।

তারপর ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হলো। দেশ বিভাগের একমাস আগে আবদুল আলীম কোলকাতা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেলেন। ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা এলেন। পরের বছর ঢাকা বেতারে অডিশন দিলেন। অডিশনে পাশ করলেন। ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসের ৯ তারিখ তিনি বেতারে প্রথম গাইলেন, ‘ও মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও’। গানটির গীতিকার ও সুরকার মমতাজ আলী খান। আবদুল আলীম পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের সঙ্গে পরিচিত হলেন। কবি জসীম উদ্দীন তাকে পাঠালেন জিন্দাবাহার ২য় লেনের ৪১ নম্বর বাড়িতে। সে সময় নামকরা সব শিল্পীরা থাকতেন ওই বাড়িতে। সেখানে তিনি প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ মমতাজ আলী খানের কাছে তালিম গ্রহণ করেন। মমতাজ আলী খান আবদুল আলীমকে পল্লী গানের জগতে নিয়ে এলেন।

এ দেশের পল্লী গান হলো মাটির গান। পল্লীর কাদা মাটির মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা শিল্পী আবদুল আলীম মাটির গানকেই শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছিলেন। এর আগে তিনি ইসলামি গানসহ প্রায় সব ধরনের গান গাইতেন। গান শেখার ক্ষেত্রে আর যারা তাকে সবসময় সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছেন তাদের মধ্যে- বেদার উদ্দীন আহমেদ, আবদুল লতিফ, কানাইলাল শীল, শমশের আলী, হাসান আলী খান, ওসমান খান, আবদুল হালিম চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। ধীরে ধীরে আবদুল আলীমের নাম সারাবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। তিনি ওস্তাদ মোঃ হোসেন খসরুর কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতেরও তালিম গ্রহণ করেন।

১৯৫২-৫৩ সালে আবদুল আলীম কোলকাতায় বঙ্গীয় সংস্কৃতি সম্মেলনে গান গেয়ে এদেশের বাইরে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন। এসময় পল্লী জগতে শিল্পীর সুখ্যাতি শীর্ষচূড়ায়। তিনি ১৯৬২ সালে বার্মায় অনুষ্ঠিত বার্মীয় সংগীত সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। বার্মায় তখন অনেকদিন যাবত ভীষণ খরা চলছে। গরমে মানুষের প্রাণ বড়ই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আকাশও খণ্ড খণ্ড মেঘের আনাগোনা। শিল্পী অন্যান্যদের সঙ্গে মঞ্চে উঠলেন গান গাইতে। গান ধরলেন আল্লাহ মেঘ দে পানি দে। কী আশ্চর্য! গান শেষ হলেই মুষল ধারে বৃষ্টি নামলো। অনুষ্ঠানে বার্মার জনৈক রাজনৈতিক নেতা বললেন, ‘আবদুল আলীম আমাদের জন্য বৃষ্টি সঙ্গে করে এনেছেন’। তখন থেকে শিল্পী বার্মার জনগণের নয়নমণি হয়ে আছেন। সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হয়ে তিনি ১৯৬৩ সালে রাশিয়া এবং ১৯৬৬ সালে চীন সফর করেন। এই দুটি দেশে তিনি পল্লী গান পরিবেশন করে দেশের জন্য প্রচুর সুখ্যাতি অর্জন করেন। বিদেশে বাংলাদেশের মান বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে আবদুল আলীমের অবদান অনস্বীকার্য। বেতার ও টেলিভিশন ছাড়াও অসংখ্য ছায়াছবিতে গাওয়া তার সব গান অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে- হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ, দুয়ারে আইসাছে পাল্কী নাইওরি গাও তোল, নাইয়ারে নায়ে বাদাম তুইলা, এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া, পরের জায়গা পরের জমিন, কলকল ছলছল নদী করে টলমল, প্রেমের মরা জলে ডোবে না অন্যতম। তিনি অসংখ্য ছায়াছবিতে গান করেছেন। সুজন সখী, লালন ফকির, কাগজের নৌকা, দয়াল মুর্শিদ, দস্যু রাণী, রূপবান, উল্লেখ্যযোগ্য।

এ পর্যন্ত তার প্রায় ৪০০-৫০০ গান রেকর্ড হয়েছে। এছাড়া বেতার স্টুডিও রেকর্ডে প্রচুর গান আছে। বাংলাদেশ গ্রামোফোন কোম্পানি (ঢাকা রেকর্ড) শিল্পীর একটি লং প্লে- রেকর্ড বের করেছে। তিনি জীবদ্দশায় ও মরণোত্তর বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন। এরমধ্যে একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পূর্বাণী চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার ও স্বাধীনতা পদক উল্লেখযোগ্য। তিনি সংগীত কলেজের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই লোকসংগীত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। আবদুল আলীম শুধু পল্লী গানের শিল্পী ছিলেন না, বাংলাদেশের লোক সংস্কৃতির মুখপাত্রও ছিলেন। পল্লীগানের যে ধারা তিনি প্রবর্তন করে গেছেন সেই ধারাই এখন পর্যন্ত বিদ্যমান। তার উদাত্ত কণ্ঠের গান বাংলার গ্রাম-গঞ্জের সুরের আবেশে মাতোয়ারা করে তুলেছিলো। তার কণ্ঠে ভাটিয়ালীর সুর যেন মাঝির মনের বেদনার কথা বলতো। বাউল গান শুনে বৈরাগীরা থমকে দাঁড়াতেন, মারফতী আর মুর্শিদীর সুরে তার বিনয়নম্র ভক্তি নিবেদন ঝেরে পড়তো। তার মতো শিল্পী বহুযুগ পর আবির্ভূত হয়। আবদুল আলীমের আগে মনে করা হতো পল্লী গান শুধু পল্লী জনগোষ্ঠীই শুনে থাকে। কিন্তু আবদুল আলীমের স্বর্ণকণ্ঠের অপূর্ব সুর মাধুর্যে সে পল্লী গান নগর সংস্কৃতির মাঝখানে স্থান করে নিয়েছে। পল্লী গানের তিনি এক আদর্শবান গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

আজ আকাশ সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতিকে গ্রাস করতে চলছে। নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের নিজস্ব সংগীত তথা পল্লীসংগীত যথাযথভাবে পৌঁছাতে না পারলে আমাদের সংস্কৃতিতে যে শূন্যতা আসবে তা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। তাই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করতে না পারলে আমরা পৃথিবীর সংস্কৃতির মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। তাই আবদুল আলীমের বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও গ্রামোফোন রেকর্ডে গাওয়া গানগুলো সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন। তার গানগুলো সংরক্ষণ করতে না পারলে আমাদের পল্লী গানের ভাণ্ডার শূন্য হয়ে যাবে এবং নতুন প্রজন্ম তার এই ধারা অনুসরণ করা থেকে বঞ্চিত হবে।

পল্লী গানের মরমী শিল্পী আবদুল আলীম আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি তার গানের মধ্য দিয়ে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন, বেঁচে থাকবেন সংগীত পিপাসু জনগণ তথা পল্লী গ্রামের মানুষের মাঝে।



লেখক: অধ্যাপক জহির আলীম

শিল্পী আবদুল আলীমের ছেলে




নাবা/ডেস্ক/তারেক

রিলেটেড নিউজঃ

    মতামত দিন